রিডিং রুম

'ভালো আছি রে ভাইয়া! অনেক ভালো...'

বানসুরি মোহাম্মদ ইউসুফ: আমি বাইতি পাড়ার জোসনা। বাপ-মা নাম রেখেছিলো জোছনা-আরা-বেগম। মা'র মুখে শুনেছি, রাতের বেলায় চাঁদের আলো হয়ে আমি জন্মেছিলাম বলেই এই নামকরণ।

আমার বয়স যখন আট কি দশ, বাবা আরেক বিয়ে করে আমাদের ত্যাগ করেন। মা ছিলেন জিদ্দি কিসিমের। তিনিও অন্য একজনকে বিয়ে করে নেন।

এতিম খানায় কখনও বড় অফিসার ভিজিটে এসে জানতে চাইলে, আমি বলতাম, আমি এতিম নয়, বাবা আছে, মা আছে। অফিসার চলে গেলে শিক্ষকরা আমাকে বকতেন, আমি বুঝতাম না, আমার কি দোষ!

একবার এক অফিসারের মায়া হলো। তিনি আমাকে এতিম খানা থেকে বাসায় নিয়ে গেলেন। বাসায় কাজ করবো, খাবো আর চাইলে বড় ভাইয়ার কাছে পড়াশোনা করবো।

বড় ভাইয়া আফিসার চাচার বড় ছেলে, ক্লাস নাইনে পড়তেন। আমার এক থেকে কুড়ির নামতার মুখস্তবিদ্যা দেখে পুলকিত হলেন। আমাকে প্রায় পড়াতে বসাতেন। টিফিনের পয়সা বাঁচিয়ে আমার বইখাতা কিনে আনতেন। আমি ভাইয়ার জামা-কাপড়-জুতার স্পেশাল কেয়ার নিতাম।

চাচা-চাচী কেউ কখনও ভাইয়ার সামনে আমাকে বকা দিতেন না। ভাইয়া উল্টা তাদের বকা দিয়ে দিতেন, আমাকে আদর করতেন।

ভাইয়া একসময় বিশ্ববিদ্যালয় পাশ দিয়ে চাকরি নিলেন। প্রথম বেতনের পুরোটা দিয়ে আমার জন্য জামা-কাপড় কিনে নিয়ে এলেন। চাচী এরপর থেকে আমারে ভাইয়ার সাথে কথা বলতে দিতেননা, সামনে যেতে দিতেননা। অফিসার চাচাও অনেকদিন আমার সাথে কথাবার্তা বলেননি।

একদিন চাচা ডেকে বললেন, 'আমরা বিদেশ যাচ্ছি বেড়াতে, তুইও যাবি।' চাচা-চাচীসহ আমরা এয়ারপোর্টে গেলাম। ভাইয়া যাচ্ছেনা, শুনে অনেক মন খারাপ হয়েছিলো। এয়ারপোর্টে চাচা-চাচীর কাগজপত্রে কি যেন ঝামেলা হয়েছে! আমাকে ইমিগ্রেশনে পাঠিয়ে দিয়ে বললো, তুই যা, আমরা পরের ফ্লাইটে আসছি! চাচার ইশারায় এক অচেনা লোক আমারে বিমানে তুলে দিলো। বিদেশের এয়ারপোর্টে আরেক অচেনাজন আমারে নিয়ে গেল।

আজ দুই বছর আমি বিদেশে, চাচা-চাচী আসে নাই। বিদেশের চাচাগুলোর হুজুরি লেবাস হলেও একেকটা আস্ত কীট, আমাকে ক্ষতবিক্ষত করে খায়। 

কোন কোন রাতে মনে হয়, মরেই যাবো। মরতে চাইও। তবু বেঁচে যাই, বেঁচে থাকবো এই আশায়, যদি কখনও ভাইয়া এসে বলে, 'কেমন আছিস জোসনা?' আমি সেদিন সত্যই মরে যেতে যেতে বলবো, ভালো আছি রে ভাইয়া! অনেক ভালো...

বিঃ দ্রঃ- লেখায় ব্যবহৃত ছবিটি প্রতীকি।