মনের অন্দরমহল

ছেলে, কেন তোমাকে আত্মহত্যাই করতে হলো?

আমিনুল ইসলাম: ছেলেটা আত্মহত্যা করেছে। গতকাল পত্রিকায় পড়েছিলাম পরীক্ষা না দিয়ে সে হল থেকে বের হয়েছিলো। এরপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিলো না। আজ পত্রিকায় পড়লাম তার ঝুলন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

ছেলেটা পড়তো ফরিদপুর মেডিকেল কলেজে। পঞ্চম বর্ষে'র শিক্ষার্থী ছিল। সে সার্জন হতে চেয়েছিল। কিন্তু হাতের আঙ্গুলে সমস্যা থাকায় শিক্ষক'রা তাকে জানিয়েছিল সে সার্জন হতে পারবে না।

এই নিয়ে সে কয়েক দিন ধরে খুব মন খারাপ করে ছিল। এরপর এই ঘটনা। ছেলে, তুমি কেন আত্মহত্যা করলে? সার্জন হয়ত হতে পারতে না। কিন্তু ডাক্তারি'র তো আরও হাজারো ধরণ আছে। তুমি তো কোন একটা বিষয়ে ঠিক'ই স্পেশালিষ্ট হতে পারতে। এই অতি সামান্য বিষয়ের জন্য তোমাকে আত্মহত্যা করতে হলো?

দেশে তো হাজার হাজার ছেলেপেলে ডাক্তার হতে চায়। ওরা সবাই কি ডাক্তার হতে পারে? এই জন্য কি ওরা আত্মহত্যা করছে? এইতো গতকাল'ই টেলিভিশনে'র খবরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক ছাত্রী'কে দেখলাম। মেয়েটার দুটো হাত'ই নেই। ছোট বেলায় ইলেকট্রিক শ'কে দুই হাত'ই হারাতে হয়েছে। এরপরও কিভাবে লিখতে হয় সেটা সে রপ্ত করেছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পেয়েছে। পড়াশুনাও শেষ করেছে। ব্র্যাকে চাকরীও পেয়েছে এখন।


এই মেয়েটার জীবন যুদ্ধের ইতিহাস কি তোমার জানা ছিল ছেলে? এইতো গতকাল'ই দেখলাম সুইপার শ্রেণী'র একটা রিপোর্ট। আমাদের সমাজ যাদের অচ্ছুত, দলিত শ্রেণী হিসেবে জানে।
জ ই মামুন ভাই'র করা এই রিপোর্ট দেখে চোখে পানি আঁটকে রাখতে পারিনি। এই শতাব্দী'তে এসেও এই মানুষ গুলোকে আমাদের সমাজ অস্পৃশ্য হিসেবে আলাদা করে রেখেছে।

যেই মানুষ গুলো আমাদের রাস্তা ঘাট পরিচ্ছন্ন রাখছে সব সময়, রংপুরের সেই সুইপার'রা কোন হোটেল, রেস্টুরেন্টে ঢুকতে পারে না। এমন কি দোকান থেকে চা কিনে খেতে হলে নিজদের'কে কাপ কিংবা গ্লাস নিয়ে যেতে হয়। নইলে ওদের কাছে চা পর্যন্ত বিক্রি করে না।

এরপরও ওরা বেঁচে থাকে। আশা নিয়ে, স্বপ্ন নিয়ে একদিন দিন বদলাবে এই প্রত্যাশায়।
আমি নিজে জানি মানুষের অবহেলা আর উপেক্ষা নিয়ে বেঁচে থাকার গ্লানি। ছেলে, তুমি কি এই মানুষদের কষ্টের কথা একবারও ভেবেছিলে?

যে কোন কিছু থেকে ভালো'টা নিতে কি তুমি শেখনি? খুব খারাপ কিছুর মাঝেও যে অনেক ভালো কিছু লুকিয়ে থাকে। তোমাকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে- তুমি কি ভালোটা নেবে নাকি খারাপটা।
এইতো গতাকাল'ই পত্রিকায় খবরের শিরোনামে পড়ছিলাম ৩০ বছর আগের এক হত্যা রহস্য উম্মচন হয়েছে।

এক ভদ্রমহিলাকে ৩০ বছর আগে হত্যা করা হয়েছিলো ভিকারুন্নেসা স্কুলের সামনে। তিনি রিকশা করে যাচ্ছিলেন তার সন্তানকে আনতে। তখন সবাই ভেবেছিল এটা একটা ছিনতাইয়ের ঘটনা।

৩০ বছর পর জানা গেল ওই মহিলার স্বামী'র বড় এবং ছোট ভাই মিলে মহিলাকে হত্যা করেছে! তারা ওই মহিলাকে একটা শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। কারন বাসায় ময়লা ফেলা ইত্যাদি পারিবারিক ব্যাপার নিয়ে সব সময় বড় ভাই আর ছোট ভাইর বউরা ঝগড়া করতো।

৩০ বছর পর এসে এই মহিলার স্বামী জানতে পেরেছে তার আপন দুই ভাই মিলে তার বউ'কে হত্যা করেছে। যারা কিনা তার সঙ্গে এক বাড়িতে'ই থেকেছে।

এটি একটি অতি জঘন্য ঘটনা। খুব'ই হৃদয়বিদারক ঘটনাও বটে। অথচ এই ঘটনার মাঝেও আমি ভালো একটা বিষয় খুঁজে পেয়েছি।
ভদ্রমহিলা যখন মারা যান, তার স্বামী'র বয়েস তখন খুব'ই কম ছিল। চাইলে'ই তিনি আরেকটা বিয়ে করে সংসার করতে পারতেন। তিনি সেটা না করে এই মহিলাকে'ই আজ অবদি ভালোবেসে যাচ্ছেন। সেই সঙ্গে তার স্ত্রীর রেখে যাওয়া তিন মেয়েকে তিনি মানুষ করেছেন।

এদের মাঝে এক মেয়ে এখন অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ইউনিভার্সিটি'র শিক্ষক। আরেক মেয়ে ঢাকার নর্থ- সাউথ ইউনিভার্সিটির শিক্ষক। বর্তমানে পিএইচডি করছেন আমেরিকায়।
ভদ্রলোক'কে সাংবাদিকরা যখন জিজ্ঞেস করেছে
-আপনি আরেকবার বিয়ে করেন'নি কেন?
তিনি তার মৃত স্ত্রীর কথা এমন ভাবে বলছিলেন; তার স্ত্রীর নানান গুণের কথা এমন ভাবে বলছিলেন; স্ত্রীর প্রতি ভালোবাসা'টা চোখে মুখে পরিষ্কার ফুটে উঠছিল।

এই পুরো ঘটনায় আমি এই পবিত্র ভালোবাসা টুকু'কে নিয়েছি। যে যুগে মানুষ নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ভালো লাগা, ভালোভবাসার অভিনয় করে বেড়াচ্ছে; স্বার্থ উদ্ধার হয়ে গেলে'ই আর খোঁজ পর্যন্ত নেবার প্রয়োজন মনে করছে না; সেই যুগে এই ভদ্রলোক গত ৩০ বছর ধরে তার মৃত স্ত্রীকে ভালোবেসে বেঁচে আছেন।
ছেলে, তুমি কি এই ভালোবাসার গল্পটা জানতে?
তবে কেন আত্মহত্যা করলে?

স্রেফ সার্জন হতে পারবে না এই অভিমানে? আরও কতো রকম ডাক্তার হওয়া যায়। তুমি তো অন্তত ডাক্তার হতে পারতে। কতো অসুস্থ মানুষের অসুখ সারিয়ে তুলতে পারতে। সেই তুমি কিনা আত্মহত্যা করে বসলে?

কতো হাজারো মানুষ স্রেফ বেঁচে থাকার জন্য প্রতি মুহূর্তে সংগ্রাম করে যাচ্ছে। আর তুমি কিনা আত্মহত্যা করে বসলে! তুমি একজন পরাজিত মানুষ। জেনে রেখো, পৃথিবী নামক এই গ্রহে পরাজিত মানুষদের কেউ মনে রাখে না।