সিনেমা হলের গলি

সুবর্ণা মুস্তফা: আপন আলোয় উজ্জ্বল!

১৯৮৩ সাল,'নতুন বউ' সিনেমায় অভিনয়ের জন্য পার্শ্ব চরিত্রে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের জন্য মনোনীত হয়েছিলেন তৎকালীন টিভি নাটকের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী। চলচ্চিত্রের তখনকার সবচেয়ে জনপ্রিয় নায়িকা ববিতার সঙ্গে একপর্দায় থেকেও নিজেকে প্রধান চরিত্র দাবি করে সাহসিকতার সঙ্গে প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রত্যাখান করেছিলেন। 

এর ঠিক কয়েক বছর পর শোনা গেল, 'স্ত্রী' সিনেমার জন্য তিনি জাতীয় পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন এটা সুনিশ্চিত কিন্তু হঠাৎ করেই সেই জায়গায় চলে আসে অন্য অভিনেত্রীর নাম। প্রয়াত নির্মাতা শহিদুল ইসলাম খোকন বলেছিলেন শাবানার বিদায়ের পর যদি তিনি চলচ্চিত্রে নিয়মিত হতেন তবে অশ্লীলতা অনেকটাই গতিরোধ হতো। 

সেই খোকন সাহেবের 'রাক্ষস' করেও যখন জাতীয় পুরস্কার পেলেন না,তখন হয়তো ভেবেই নিয়েছিলেন আর কখনো জাতীয় পুরস্কার পাওয়া হবে না। অনেক বছর পর, তিনি জুরি বোর্ডের সদস্য হয়েছিলেন তখন তিনি 'খন্ডগল্প ৭১' এর জন্য জাতীয় পুরস্কার নিতে অপারগতা জানান,কারন তিনি বিচারক।   

অবশেষে নিজের প্রযোজিত 'গহীন বালুচর'র সুবাদে চলচ্চিত্রে অভিনয় জীবনের ৪০ বছর পর জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেতে যাচ্ছেন এই গুণী অভিনেত্রী। তিনি আমাদের বর্ণাঢ্য টিভি নাটকের সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেত্রী, চলচ্চিত্রেও আছেন সমাদৃত হয়ে, বর্তমানে সংসদ সদস্য- কিংবদন্তি 'সুবর্ণা মুস্তফা'। 

বাংলাদেশের ইতিহাসে যুগান্তকারী ধারাবাহিক নাটক 'কোথাও কেউ নেই' তে কেন্দ্রীয় চরিত্র। লেখক হুমায়ূন আহমেদ এতটাই সুনিপুণ ভাবে সৃষ্টি করেছিলেন সবার মন ছুঁয়ে যেতে বাধ্য। অনাথ হলেও মুনার কাছের মানুষ ছিল, ভালোবাসা ছিল, সুখ ছিল, তাকে পাওয়ার জন্য একজনের পাগলামি ছিল। তবে ভাগ্যের পরিহাসে সেই কাছের মানুষ গুলো নানা ভাবে একে একে ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তার আর কেউ ছিল না। সুবর্ণা মুস্তফার অনবদ্য অভিনয় মুনাকে যেন প্রাণ  দিয়েছিল, বাংলাদেশের আপামর অশ্রুসজল দর্শকদের কাছে তিনি যুগ যুগ ধরে চিরঅম্লান একজন হয়ে থাকবেন ওই এক কোথাও কেউ নেই- এর কারণেই। 

বাবা কিংবদন্তি অভিনেতা গোলাম মুস্তফা, সেই সূত্রেই তার নাট্যজগতে আসা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'সুভা' হয়ে আবির্ভূত হয়েছিলেন টিভি নাটকে, 'বরফ গলা নদী'তে অভিনয় করে পরিচিতি পান।আশির দশকে এসে টিভি নাটকে হয়ে উঠেন শীর্ষ অভিনেত্রী, আফজাল হোসেনের সঙ্গে টিভি জগতে সবচেয়ে জনপ্রিয় জুটি, এই জুটির 'পারলে না রুমকি' নাটকটি রোমান্টিক নাটকের তালিকায় একদম ওপরের দিকে স্থান করে নিয়েছে। 

সেই সময় তিনি 'লাক্স' এর বিজ্ঞাপন করে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন। 'সংশপ্তক' ধারাবাহিকেও নিজের দ্যুতি ছড়িয়েছিলেন। এছাড়া উল্লেখযোগ্য নাটক ছিল কূল নাই কিনার নাই, অচিনবৃক্ষ, শিল্পী, নিলয় না জানি, তুমি, ভাঙনের শব্দ শুনি। মীরা হয়ে 'আজ রবিবার' এ তিনি এসেছিলেন একান্নবর্তী পরিবারের সমস্যা সমাধান করতে। কাছের মানুষ, ডলস হাউজের পর এখনো মাঝে মাঝে টিভি পর্দায় আসেন।

নাট্যঙ্গনের বর্ণিল ক্যারিয়ারের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও তিনি সমুজ্জ্বল। প্রথম ছবি প্রথা ভাঙানিয়া 'ঘুড্ডি'- সেটি বেশ সুপরিচিতি পেয়েছিলেন। তবে প্রথম বাণিজ্যিক সফল ছবি 'নয়নের আলো', এই ছবির পর তার জনপ্রিয়তা বেড়ে গিয়েছিল। আশির দশকে প্রচুর সিনেমার অফার পেতেন, কিন্তু ফিরিয়ে দিতেন, ফিরিয়ে দিয়েছিলেন পদ্মা নদীর মাঝিও! 

এই দশকের সিনেমার মধ্যে লাল সবুজের পালা, নতুন বউ, সুরুজ মিঞা, স্ত্রী অন্যতম। নব্বই দশকে এসে বেশ সংখ্যক বাণিজ্যিক ছবিতে অভিনয় করেন, এর মধ্যে কমান্ডার, রাক্ষস, অপহরন, আজকের হিটলার, ফাঁসি, শঙ্খনীল কারাগার, পালাবি কোথায়- অন্যতম। পরবর্তীতে দূরত্ব, হেডমাস্টার, খন্ডগল্প ৭১ ছবিতে দেখা যায় উনাকে। নিজের প্রযোজনায় মুক্তি দিয়েছেন 'গহীন বালুচর'। 

'চলো না ঘুরে আসি অজানাতে' গানের সেই স্টাইলিশ তরুনী থেকে 'আমি তোমার দুটি চোখে দুটি তারা হয়ে থাকবো' পেরিয়ে মধ্যবয়সীর ছিমছাম সাজ, সব সময়ই তিনি সৌন্দর্যের প্রতীক।

১৯৫৯ সালের আজকের এইদিনে জন্মগ্রহণ করা এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী আজ পেরোচ্ছেন জীবনের ৬০ বছর, শুভকামনা রইলো। নিজেকে আরো বর্ণিল করুন, এই প্রত্যাশা রাখি।

শুভ জন্মদিন, প্রিয় সুবর্ণা মুস্তফা!