মনের অন্দরমহল

প্রদীপের নিচেই সবচেয়ে বেশি অন্ধকার!

তারকারা দূর গ্রহের বাসিন্দা। মাটিতে দাঁড়িয়ে আমরা ভাবি, কি চমৎকার তাদের জীবন! আলো ঝলমলে একটা অন্যরকম দুনিয়ায় তাদের বসবাস, যেখানে অর্থ, খ্যাতি, বিত্ত- কোনকিছুর অভাব নেই! এর যেকোন একটা পেলেই তো আমরা বর্তে যাই! আমাদের মনে হয়, কত সুখেই না তাদের জীবন কাটে! অথচ প্রদীপের ঠিক নিচেই যে নিকষ অন্ধকারে ঢাকা, সেটা বোঝা যায় যখন মানসিক অবসাদে ভুগে তারকাদের কেউ নিজেকে শেষ করে দেন। তাদের আত্মহত্যার খবরগুলো শুনে আমরা অবাক হয়েই ভাবি, কী এমন ঘটেছিল এই সুখী মানুষটার জীবনে, যার কারণে তাকে অকালেই চলে যেতে হলো?

দক্ষিণ কোরিয়ান কে-পপ মিউজিকের ভক্ত এদেশে প্রচুর, বিশেষ করে এই জেনারেশনের কিশোর-তরুণদের মধ্যে কোরিয়ান পপ মিউজিকের ক্রেজটা অন্যরকম। এরমধ্যে 'কারা' নামের ব্যান্ডটা যথেষ্ট জনপ্রিয়। এক মাসের ব্যবধানে সেই ব্যান্ডের সাবেক দুই সদস্য আত্মহত্যা করেছেন, দুজনই নারী শিল্পী। এরমধ্যে পপ তারকা সুলির মৃতদেহ তার বাসভবনে পাওয়া যায় ১৬ই অক্টোবর। পুলিশ জানিয়েছিল, তিনি আত্মহত্যা করেছেন। 

কোরিয়ান পপ তারকা সুলি

সুলির মৃত্যুতে যিনি সবচেয়ে বেশি দুঃখ পেয়েছিলেন, তার নাম গু হারা। সুলির সবচেয়ে কাছের বান্ধবী ছিলেন তিনি, সুলিকে নিজের বোনের মতোই জানতেন। দুজনেই একই ব্যান্ডের সদস্য ছিলেন, পরে অবশ্য ব্যান্ড ছেড়ে একক অ্যালবাম বের করেছিলেন গু হারা। সুলির মৃত্যুতে ব্যথিত হৃদয় নিয়ে মাসখানেক আগে গু হারা লিখেছিলেন, 'আশা করছি, আর কোনো দুশ্চিন্তা ছাড়াই স্বর্গে তুমি শান্তিতে ঘুমাবে। রাতের পর রাত সেখানে জেগে কাটাতে হবে না তোমাকে...' কে জানতো, মাত্র চল্লিশদিনের ব্যবধানে নিজেকে শেষ করে দিয়ে সুলির কাছেই চলে যাবেন গু হারা! 

গতকাল রোববার সিউলের শহরতলিতে নিজ বাসায় গু হারাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। গত শনিবার ইনস্টাগ্রামে সর্বশেষ ছবি পোস্ট করেন তিনি। বিছানায় শুয়ে থাকা সেই ছবির ক্যাপশনে তিনি লিখেছিলেন, ‘গুড নাইট।’ কেউ ভাবতেও পারেনি, দুনিয়াকে চিরবিদায় জানানোর গুঢ় অর্থ লুকিয়ে ছিল ইনস্টাগ্রামে পোস্ট করা সেই ছবির মধ্যে!

তারকারাও আর দশজনের মতো মানুষ, তাদের শরীরটাও রক্ত-মাংসে গড়া, তাদেরও হৃদয় বলে একটা বস্তু আছে। তাদেরও ভালো-লাগা, খারাপ লাগার অনুভূতি আছে। তাদের জীবনটাও হাজারো যন্ত্রণায় জর্জরিত থাকে। গু হারার কথাই ধরুন না, গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে সাবেক প্রেমিকের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ করেছিলেন তিনি। কারণ, সেই প্রেমিক তার ক্যারিয়ার ধংস করা এবং গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা গু হারার ছবি ও ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিয়েছিল। ছেলেটি তাকে শারীরিকভাবেও লাঞ্ছিত করেছিল। শেষ পর্যন্ত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় আদালত তার সেই প্রেমিককে কারাদণ্ড দিয়েছিল। এর আগেও একবার আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিলেন গু হারা। সেবার হাসপাতাল থেকে ফিরেছিলেন মরতে মরতে। 

পপ তারকা গু হারা

কিংবা সুলির প্রসঙ্গে ফিরে যাই। গান গেয়ে তিনি যতোটা বিখ্যাত হয়েছিলেন, তারচেয়ে বেশি আলোচিত ছিলেন 'নো ব্রা' মুভমেন্টের কারণে। এটা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল সুলিকে। মুক্তমনা সুলি নিজের মতো জীবন যাপন করতে চাইতেন। কিন্তু রক্ষণশীল কোরীয় সমাজ তা মেনে নিতে পারেনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার প্রোফাইল আর পোস্টগুলোতে ঘৃণা উদ্রেককারী কমেন্ট আর মেসেজ এসে হাজির হতো রোজই। এসব নিয়ে প্রচণ্ড মানসিক চাপ আর হতাশায় ভুগছিলেন সুলি। সেকারণেই নিজের জীবনটাকে অসময়ে শেষ করে দেয়ার আত্মঘাতি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন তিনি। 

আপনি সাধারণ একজন মানুষ, মন খারাপ হলেই আপনি হয়তো কারো না কারো সাথে সেটা শেয়ার করতে পারবেন, অন্তত সেই অপশনটা খোলা থাকছে আপনার সামনে। কিন্ত তারকা হবার সবচেয়ে বড় অসুবিধা কি জানেন? আপনি সহজে কাউকে বলতে পারবেন না কি ভয়ঙ্কর মন খারাপের অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে আপনি যাচ্ছেন। দিনের পর দিন ধরে হতাশা কুরে কুরে খাচ্ছে আপনাকে, অথচ সবার সামনে অভিনয় করতে বাধ্য হচ্ছেন আপনি, যাতে কেউ কিছু বুঝতে না পারে! সবকিছু লুকিয়ে রাখার এই ব্যর্থ চেষ্টাটাই মানুষকে আরও বেশি আত্মঘাতি করে তোলে ধীরে ধীরে। 

মৃত্যুর আগেরদিন তোলা চেস্টার বেনিংটনের ছবি

গুগলে সার্চ করলে চেস্টার বেনিংটনের মারা যাওয়ার ঠিক আগেরদিনের তোলা একটা ছবি খুঁজে পাবেন। স্ত্রীর সঙ্গে কোথাও বেড়াতে গিয়েছেন তিনি, হাসছেন মানুষটা। তার হাস্যোজ্জ্বল চেহারাটা দেখে কে বুঝতে পেরেছিল, পরদিন মানুষটা নিজেকে শেষ করে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেবে! যন্ত্রণাগুলো বাড়তে বাড়তে এমন একটা জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ যে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পিছপা হয় না। 

হতাশা বা বিষণ্ণতা মানুষের পেশা হিসেব করে আক্রমণ করে না, খ্যাতি বা অর্থের ঝনঝনানি থাকলেই যে কেউ তাতে আক্রান্ত হবেন না, সেটাও তাই বলার কোন উপায় নেই। চেস্টার বেনিংটন, সুলি কিংবা গু হারার মৃত্যুগুলো সেই সত্যিটাই আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় বারবার...