এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

মোদি-শাহ'র কূটকৌশল ব্যর্থ করে দেয়া এক মারাঠা 'স্ট্রংম্যান'!

মহারাষ্ট্রের মানুষ তিনি, মুম্বাই তার ডেরা। জাতে মারাঠী, তাকে ডাকাই হয় 'মারাঠা স্ট্রংম্যান' নামে। সেই স্ট্রংম্যান নামের প্রমাণ তিনি দিলেন আটাত্তর বছর বয়সে এসে, দীর্ঘ পাঁচ দশকের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আর নিজের ধুরন্ধর মস্তিষ্ক খাটিয়ে যিনি মহারাষ্ট্রের মসনদ নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে চলা নাটকের যবনিকাপাত করে দিয়েছেন, বিজেপির আগ্রাসন থামিয়ে দিয়ে হাত থেকে বেরিয়ে যাওয়া ফলাফলটাকে টেনে এনেছেন নিজের ঘরে, জোট বাঁধতে বাধ্য করেছেন দুই চিরশত্রু কংগ্রেস আর শিবসেনাকে- তাকে স্ট্রংম্যান না ডেকে আর কোন নামে ডাকা যায়? তিনি শরদ গোবিন্দরাও পাওয়ার, জীবনের শেষপ্রান্তে এসে ভারতীয় রাজনীতিতে চাণক্যের ভূমিকায় আবির্ভূত হলেন যিনি। 

মহারাষ্ট্রের নাটকের কথা দিয়েই শুরু করা যাক। প্রায় দেড় মাস আগে প্রাদেশিক নির্বাচন হয়েছে সেখানে। একপক্ষে ছিল বিজেপি-শিবসেনা জোট, গত পাঁচ বছর ধরে মহারাষ্ট্রের ক্ষমতায় ছিল যারা। অন্যপ্রান্তে কংগ্রেস এবং এনসিপি (ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি) জোট, এই এনসিপির প্রধান ছিলেন শরদ পাওয়ার। জাতীয় নির্বাচনে বিজেপির যে আগ্রাসন দেখা গেছে মাসকয়েক আগে, তাতে ভোটের খেলায় উড়ে যাওয়ার কথা ছিল প্রতিপক্ষের। 

কিন্ত শরদ পাওয়ার হেরে যাওয়ার আগে হার মানেননি। এই বুড়ো শরীর নিয়ে চক্কর মেরে বেড়িয়েছেন পুরো মহারাষ্ট্রে, ভোট চেয়ে ঘুরেছেন দ্বারে দ্বারে। কংগ্রেসের শীর্ষ নেতারা যেখানে অনেক আগেই আশা ছেড়ে দিয়েছেন, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ছাড়া আর কোন কেন্দ্রীয় নেতাকেই দেখা যায়নি প্রচারণায়, সেখানে শরদ পাওয়ার ছিলেন ব্যতিক্রম। ঝড়বৃষ্টি উপেক্ষা করে তিনি প্রচারণা চালিয়েছেন, বিরতি নেননি একদিনও। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজে তার বক্তৃতা দেয়ার একটা ছবি ভাইরাল হয়েছিল তখন। 

বৃষ্টিতে ভিজে প্রচারণা চালাচ্ছেন শরদ পাওয়ার

ভোটের ফলাফলে দেখা গেল, পাওয়ারে ভর করেই বাজীমাত করেছে এনসিপি। আগের নির্বাচনে যারা আটাশটা আসন পেয়েছিল, তারা এবার জিতেছে ৫৪ আসনে! মহারাষ্ট্রে মোট আসন সংখ্যা ২৮৮টি, কোন জোট ১৪৫ আসন পেলেই গঠন করতে পারবে সরকার। নির্বাচনে বিজেপি পেলো ১০৫টি আসন, তাদের জোটসঙ্গী শিবসেনার দখলে গেল ৫৬টি। সরকার গঠন করবে দুই দল মিলে, এমনটাই যখন ভাবনা সবার, তখনই শিবসেনা দাবী করলো, তাদের মূখ্যমন্ত্রীর পদ দিতে হবে। নইলে জোট থেকে বেরিয়ে যাবে তারা। ১০৫ আসন পাওয়া বিজেপি স্বভাবতই সেই দাবী আমলে নিলো না। মাসখানেক ধরে চললো টানাপোড়েন। 

তখনই এগিয়ে এলেন শরদ পাওয়ার। কংগ্রেসকে রাজী করালেন শিবসেনার সঙ্গে বসতে। গত ত্রিশ বছরে যেটা হয়নি, সেটাই দেখলো ভারতের মানুষ, এক টেবিলে বসলেন শিবসেনা আর কংগ্রেসের নেতারা! সাপ আর নেউলের মাঝখানে রেফারী হয়ে সেতুবন্ধন রচনা করলেন শরদ পাওয়ার। পাশার দান বদলে যেতে লাগলো ধীরে ধীরে, শিবসেনাকে রাজ্যের মূখ্যমন্ত্রীর পদটা ছেড়ে দেয়ার অঙ্গীকার করে তিন দলীয় জোট গড়া হলো। 

কিন্ত নাটক তখন কেবল শুরু হয়েছে! বিজেপি কি আর চুপ থাকবে? নভেম্বরের বাইশ তারিখ রাতে তিন দলের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, পরদিন রাজ্যপালের কাছে নিজেদের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে উপস্থাপন করে সরকার গঠনের দাবী জানাবে তারা। তেইশে নভেম্বর সকালে ঘুম ভেঙে মহারাষ্ট্রের মানুষ ব্রেকিং নিউজ পেলো- মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে ফেলেছেন বিজেপির দেবেন্দ্র ফডনবীস! আর তাকে সমর্থন দিয়েছে এনসিপি, উপমূখ্যমন্ত্রী হয়েছেন শরদ পাওয়ারের ভাইপো অজিত পাওয়ার! 

অজিত পাওয়ার: চাচার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে যিনি ভিড়েছেন শত্রু শিবিরে

ঘটনা খোলাসা হলো ধীরে ধীরে। অজিতই নিজের দলের সাথে, পরিবারের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। তার নামে দুর্নীতির যেসব মামলা ছিল, সেসব তুলে নেয়ার আশ্বাস, সেইসঙ্গে মহারাষ্ট্রের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ- এই দুইয়ের লোভ সামলাতে পারেননি অজিত। কাকার মুখে চুনকালি মাখিয়েই তিনি ভিড়েছেন বিজেপির ডেরায়। তাকে সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে নির্বাচন করেছিল এনসিপি, ৫৪ সাংসদের স্বাক্ষরিত চিঠি রাজ্যপালের কাছে জমা দিয়ে অজিত দাবী করলেন, এনসিপির সমর্থন আছে বিজেপির সঙ্গে! গভীর রাতে নাটকের চিত্রনাট্য লেখা হয়েছে, ভোর পাঁচটায় রাষ্ট্রপতি শাসন তুলে নেয়া হয়েছে সবার অজান্তে, আর সাড়ে সাতটা নাগাদ শপথ পাঠও হয়ে গিয়েছে- যেখানে রাজ্যপাল অন্যান্য দিন দশটার আগে অফিসেই ঢোকেন না!

আটাত্তর বছর বয়সে এরকম একটা ধাক্কা খেলে যে কেউই বাংলা সিনেমার প্রবীর মিত্র বা আনোয়ার হোসেনের মতো বুক চেপে ধরে স্ট্রোক করতো। কিন্ত মানুষটা তো শরদ পাওয়ার, স্ট্রংম্যান, তিনি ভাংবেন, তবু মচকাবেন না। কংগ্রেসের কয়েকজন ততক্ষণে বলা শুরু করেছে, এসবই আসলে শরদের সাজানো নাটক, তিনিই অজিতকে ঘুঁটি বানিয়ে চাল চালছেন। শরদ জবাব দিলেন না এসবের, ছুটে গেলেন শিবসেনা নেতা উদ্ধব ঠাকরের বাসায়, তাকে জানালেন, এনসিপি জোটে আছে, জোট যাতে না ভাঙে। দুই জোটসঙ্গীকেই বললেন, নিজেদের সাংসদদের সামলে রাখুন, বাকীটা আমি দেখছি। 

অজিত পাওয়ারের সঙ্গে আরও সাত-আটজন সাংসদ যোগ দিয়েছিলেন, একে একে সবার সঙ্গে যোগাযোগ করলেন শরদ। কি বলেছেন তাদের, কি কথাবার্তা হয়েছে, সেসব মিডিয়াতে আসেনি। তবে দিনশেষে ঘরের ছেলেরা ঘরে ফিরেছে। ঘোড়া কেনাবেচার রমরমা সময়টায় তিনি আগলে রেখেছেন দলকে, দলের সাংসদদের। শত শত কোটি টাকার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে একেকজন সাংসদকে, তিন দলই নিজেদের সাংসদদের নিয়ে তুলেছে হোটেলে, বসানো হয়েছে কড়া পাহারা, রাখা হয়েছে নেটওয়ার্কের বাইরে। 

এনসিপির চার সাংসদকে বিজেপি নিয়ে গিয়েছিল দিল্লির গুরগাঁয়ে, সেখানে এক হোটেলে আটকে রাখা হয়েছিল তাদের। ক্যাডার পাঠিয়ে সেখান থেকে তাদের উদ্ধার করেছেন, তারপর ফিরিয়ে এনেছে মুম্বাইয়ে। হাইকোর্টে ততক্ষণে রিট করা হয়ে গেছে বিজেপির ক্ষমতাগ্রহণ অবৈধ- এই মর্মে, কোর্টে চলছে বাদানুবাদ, আর এদিকে ঘর গুছিয়ে পাল্টা আক্রমণের পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন শরদ। ভাইপোর অপরাধের ক্ষমা ঘোষণা করে দিয়ে ফিরে আসার সুযোগ দিলেন, অজিতের সঙ্গীরাও স্রোত বুঝে ফিরে এলেন একে একে। অজিতও বুঝতে পারলেন, সময় ফুরিয়ে এসেছে।

শরদ পাওয়ারকে নিয়ে এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠেছে

তিনদিন ধরে চলা বিবাদের পর আজ সকালে ভারতীয় হাইকোর্ট জানালো, সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে হবে বিজেপিকে, সেটাও বদ্ধ কোন কামরায় নয়, একদম জনসম্মুখে। তারপর আর করার কিছুই ছিল না বিজেপির। দুপুরে অজিত ইস্তফা দিলেন উপমূখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে, সন্ধ্যে নাগাদ মূখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেয়া দেবেন্দ্র ফডনবীসও পদত্যাগ করলেন। 

দিল্লিতে বসে মুম্বাইয়ের রাজনীতি উল্টে দিতে চাওয়া নরেন্দ্র মোদি আর অমিত শাহকে শরদ পাওয়ার বার্তা দিলেন- হিন্দুত্ববাদ বা পাকিস্তান বিরোধীতার উগ্র ট্রাম্পকার্ড ছাড়াও রাজনীতির মাঠে বাজীমাত করা যায় শুধু মাথার জোরে। মোদি-শাহ জুটি জনপ্রিয় হতে পারে, কিন্ত অভিজ্ঞতার পাল্লায় দুজনকে একসঙ্গে মাপা হলেও সেটা শরদের চেয়ে কম হয়ে যাবে! 

রাজনৈতিক জীবন বলুন কিংবা সংগঠক জীবন, শরদ পাওয়ারের পুরো ক্যারিয়ারটাই ঘটনাবহুল। মহারাষ্ট্রের মূখ্যমন্ত্রী থেকে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, কিংবা বিসিসিসআইয়ের প্রেসিডেন্ট থেকে আইসিসির সভাপতি- সব দায়িত্বই পালন করেছেন তিনি। কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে গেছেন, আবার তাদের সঙ্গে জোট গড়েই মহারাষ্ট্রের বুকে কংগ্রেসকে বাঁচিয়ে রেখেছেন, বারবার উদ্ধারকর্তা হয়েছেন দলটার। যে শিবসেনার বিরোধীতা করেছেন সারা জীবন, শেষ বয়সে এসে হাজারটা নাটকের পর তাদেরই বিপদ থেকে উদ্ধার করে মান বাঁচিয়ে বুঝিয়ে দিলেন, কেন তাকে স্ট্রংম্যান বলা হয়!