ইনসাইড বাংলাদেশ

গুজবপ্রিয় এত কিউট লোকজন লইয়া আমরা কী করিবো?

মানুষের যেমন আদমশুমারী হয়, বাঘেদের যেমন বাঘশুমারী হয়, গাধা বা রামছাগলের সংখ্যা গণনার জন্যে সেরকম কোন পদ্ধতি আছে কিনা জানা নেই। সেরকম কোন শুমারী চালানো হলে সবচেয়ে বেশি বুদ্ধিহীন এবং গর্ধব প্রজাতির লোকজন পাওয়া যাবে এই বাংলাদেশে, আমাদের আশেপাশেই। মাঝেমধ্যেই তো খবরে আসে, ছাগল উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষে। সব ছাগল যে চারপেয়ে হবে, এমন কোন কথা নেই। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন, প্রচুর দোপেয়ে ছাগলও দেখা যাচ্ছে চারপাশে। এই দেশে যারা পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগবে টাইপের গুজবে বিশ্বাস করে, কিংবা লবনের দাম বাড়বে এই শঙ্কায় পাঁচ-দশ কেজি লবন কিনে জমিয়ে রাখতে গিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ফেলে, তাদের গাধা বা ছাগল ছাড়া আর কীইবা বলা যাবে?

ভারত থেকে আমদানী বন্ধ থাকায় পেঁয়াজের দাম চড়া বেশ কিছুদিন ধরেই, মধ্যবিত্তের আয়ত্বের অনেকটা বাইরেই চলে গেছে পেঁয়াজ। ক'দিন আগেও যে জিনিসটার দাম ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ টাকা কেজি ছিল, সেটাই নাকি কোন কোন জায়গায় তিনশো টাকা ছুঁয়ে ফেলেছে! মিশর-মিয়ানমার থেকে পেঁয়াজ এনেও নিয়ন্ত্রণে রাখা যাচ্ছে না অবস্থা, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন পেঁয়াজ ছাড়া তরকারী খেতে। এমন সময়ে চালের দামও কেজি প্রতি বেশ খানিকটা বেড়েছে, এরমধ্যে লবনের দামের গুজব শুরু হলো গতকাল থেকে।

সিলেটের কিছু জায়গায় এবং হবিগঞ্জে লবন পাওয়া যাচ্ছে না, এই খবর গতকালই এসেছিল। পেঁয়াজের মতো হু হু করে লবনের দামও বাড়বে- এই গুজব ছড়িয়ে পড়েছে দাবানলের মতো। সকাল নাগাদ মফস্বল শহরগুলোতে লোকজন ছুটেছে মুদির দোকানে, লবনের প্যাকেট শেষ হয়েছে চোখের পলকে। অবস্থা বুঝে কেউ কেউ লবনের দাম কেজি প্রতি পাঁচ থেকে পঞ্চাশ টাকাও বাড়িয়ে বিক্রি করেছে। লবনের ডিলারেরাও বিস্মিত হয়েছে হঠাৎ এমন চাহিদা বেড়ে যাওয়ায়।

ঢাকা থেকে অনেকে মফস্বলে থাকা আত্নীয়-স্বজনের কাছে ফোন করে জানিয়েছেন, লবনের দাম বাড়তে পারে, তারা যেন কিনে মজুদ করে রাখেন। লবন তো আর পেঁয়াজের মতো পঁচে নষ্ট হবে না, তাই বুদ্ধিশূন্য মস্তিস্ক নিয়ে ঘোরা লোকজন এসব গুজবে বিশ্বাস করে একেকজন পাঁচ-দশ কেজি করে লবন কিনে নিয়ে গেছে বাড়িতে, সৃষ্টি হয়েছে একটা সংকটের। এই সংকটের জন্যে ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট দায়ী নয়, আড়তদারের মজুদ দায়ী নয়, দায়ী হচ্ছে গুজবে বিশ্বাস করা গর্ধব আমজনতা!

অবস্থা এমনই বেগতিক দাঁড়িয়েছে, ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত নামিয়েও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছিলো না। লবনের বাড়তি দাম নেয়ায় অনেক খুচরা ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে, কিন্ত মানুষ তো বেশি দামেও লবন কিনতে রাজী, তাদের কে বোঝাবে! তারা ধরেই বসে আছে, লবনের দাম দুইশো টাকা ছোঁবে, আর সেজন্যে যে মানুষটার ঘরে মাসে দুই কেজির বেশি লবন লাগে না, সে-ও পাঁচ কেজি লবন কিনে নিয়ে গেছে। 

অনেকে আবার দাম বাড়লে পরে বিক্রির আশায় কিনেছে দশ-পনেরো কেজি করে। অনেক জায়গায় তো পুলিশ নিয়ম করে দিয়েছে, কেউ দুই কেজির বেশি লবন কিনতে পারবে না। কিছু এলাকায় মাইকিংও করা হয়েছে প্রশাসনের উদ্যোগে, লবনের দাম বৃদ্ধির ব্যাপারটা যে গুজব ছাড়া আর কিছুই না, সেটা লোকজনকে বোঝানো যে কত বড় চ্যালেঞ্জ ছিল, সেটা ভাষায় প্রকাশের অযোগ্য আসলে। 

এমন যদি হতো যে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত লোকজনই শুধু না বুঝে এসব গুজবে বিশ্বাস করেছে, তাহলেও মেনে নেয়া যেতো। উচ্চশিক্ষিত লোকজনও যখন হাওয়ায় ভেসে আসা এই ভিত্তিহীন গুজবে বিশ্বাস করে দোকানে ছুটেছে, ফেসবুকে এসব শেয়ার করেছে, তখন মনে হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার কি আসলেই কোন মূল্য আছে? 

গত কিছুদিন ধরেই পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে, কক্সবাজার এবং পটুয়াখালীতে এবার রেকর্ড পরিমাণ কাঁচা লবন উৎপাদন হয়েছে, লবন চাষীরা অল্প দামেই লবন বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। দেড়শো টাকা মণ হিসেবে কাঁচা লবন বিক্রি হয়েছে কক্সবাজারে। তাহলে লবনের দামটা বাড়বে কিসের ভিত্তিতে? পেঁয়াজের দাম বাড়ার একটা কারণ ছিল ভারতের ওপর অতি নির্ভরশীলতা, লবনের ব্যাপারটা তো সেরকম নয়।

তারচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, লবনের দাম নির্ধারণ করে দেয়া থাকে, প্যাকেটের গায়ে উল্লেখ করা থাকে টাকার অঙ্কটা। সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে যে অঙ্কটা থাকে, এর বেশি এক টাকাও যদি কেউ দাম রাখে, সেটা অপরাধ হবে। আলু-পেঁয়াজ এসবের এমন কোন নির্ধারিত দাম নেই, এগুলো ওঠানামা করে, পরিবর্তনশীল; লবনের দাম সহজে পরিবর্তন করা যায় না। লাখ লাখ বিবিএ স্টুডেন্টের বাংলাদেশে এমআরপি সম্পর্কে ন্যুন্যতম ধারণা রাখা মানুষের সংখ্যা যে হাতেগোনা, সেটার প্রমাণও পাওয়া গেল আজ। 

পেঁয়াজের আকাশছোঁয়া দামের পেছনে ব্যাবসায়ীদের কারসাজী আছে, সিণ্ডিকেটের কূটচাল আছে। কিন্ত লবনের দাম নিয়ে আজ যেটা হলো, সেটার দায়ভার আমাদের, এই গুজবপ্রিয় বাঙালীর। এই দেশের মানুষ গুজবে যতোটা বিশ্বাস করে, পত্রিকায় প্রকাশিত খবরেও তাদের এত বিশ্বাস নেই। সেজন্যেই ছেলেধরার গুজবে তাসলিমার মতো মায়েরা গণপিটুনির শিকার হয়ে মরে যায়, ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেয়ার মিথ্যে গুজবে প্ররোচিত হয়ে তৌহিদী জনতা পুলিশের ওপর হামলা চালায়। মাছেভাতে বাঙালী এখন হয়ে গেছে গুজবে-গল্পে বাঙালী- এই লজ্জাটা যে কোথায় রাখা যায়, সেই জায়গাটাই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!