রিডিং রুম

একজন সাদাত হোসাইন, ট্রল ও আমাদের ঈর্ষাকাতরতা

মুনশি মুহাম্মদ আরমান: কয়েকদিন পূর্বে একজন ভার্চ্যুয়াল জনপ্রিয় লেখককে দেখলাম সাদাত হোসাইনকে নিয়ে ট্রল করছেন। তার ট্রলের সারর্মম ছিলো— 'সাদাত হোসাইনের স্টলের সামনে গিয়ে দেখলাম, পাঠকের উপচে পড়া ভীড়। আমিও তার একটি বই কিনলাম। কিছুটা পড়ার পরে দেখলাম ত্যানা প্যাচানো উপন্যাস। খুব হাসলাম। মানুষ তাহলে এসব বাজারি লেখকদের বইও টাকা দিয়ে কিনছে? তাও আবার লাইন ধরে?'

তার কিছুদিন পর সাদাত হোসাইনের সাথে একটা জরুরী দরকারে কথা হয়েছিলো। ট্রল সম্পর্কে বললাম তাকে। তারপর তিনি ট্রলকৃত পোস্টটি দেখতে চাইলেন। দেখালাম। তিনি আইডিতে ঢুকে গিয়ে দেখলেন, ট্রলদাতা তাকে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট দিয়েছে। সবচে মজার বিষয় হলো, ট্রলদাতা তাকে ততোধিক ম্যাসেজ করেছেন এই বলে— ভাইয়া, আমি আপনার অনেক বড় ফ্যান। সেই প্রথম থেকেই আমি আপনার বই পড়ি। প্লিজ, রিকুয়েস্ট এক্সেপ্ট করেন।' ম্যাসেজগুলো দেখে সেদিন আমি শিহরিত হয়েছিলাম।

একজন লেখক তাকে এক্সেপ্ট করেনি বলে তিনি নিরুপায় হয়ে ট্রল করতে বাধ্য হয়েছেন। এতোটা কষ্ট বুকে নিয়ে মানুষ বাঁচে কিভাবে? ভাবা যায় বলুন?

সম্প্রতি সাদাত হোসাইন দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। এটা নিয়ে কিছু মানুষ সমালোচনা শুরু করেছেন নিউজফিড জুড়ে। সমালোচনা বাঙালীদের নেশা এবং পেশা। সেটা মানছি। তবে সমালোচনা করতে প্রথমে আপনাকে যার বিরুদ্ধে সমালোচনা করছেন, তাকে জানতে হবে। তার বই পড়তে হবে। না জেনে, না পড়ে আপনি কিভাবে বুঝবেন লেখকের লেখা ভালো, নাকি খারাপ? 

আমার ধারণা, যারা সাদাত হোসাইনকে নিয়ে ট্রল করছেন, তাদের ভেতরকার একশো জনের চারজনও তার বই পড়ে ভালো লাগেনি বলে ট্রল করছে না। বরং তাদের ব্যক্তিগত আক্রোশ কিংবা ব্যক্তিগতভাবে হতাশার ভরাডুবির কারণে তাদের এই ট্রল।

অন্যপ্রকাশ কোটিপতি হয়েছে হুমায়ূন স্যারের বই বিক্রি করে কথাটি যেমন সত্য, তেমনি অন্যধারা এবং ভাষাচিত্রও লাখপতি হয়েছে সাদাত হোসাইনের বই বিক্রি করে। এখন কথা হলো, অন্যধারা যদি তাদের ব্যক্তিগত স্বার্থের কারণে বা সোজাসুজি বললে হুমায়ূন স্যারের বইয়ের মত সাদাত হোসাইনের বই বিক্রি করেও কোটিপতি হওয়ার ধান্দা করার জন্য সাদাত হোসাইনক যোগ্য না হওয়া সত্ত্বেও তাকে পুরস্কার দিয়ে নিজেদের ফেভারে রাখার চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে বলুন তো বইগুলো কিনছেন কারা?

আপনার এবং আমার যদি সাদাত হোসাইনের বই ভালো না লাগে, কিংবা আপনি আর আমি যদি সাদাত হোসাইনের বই না কিনি তাহলে কি তারা বই বিক্রি করে কোটিপতি হতে পারবেন? এখানে কি সাদাত হোসাইনের কোন ক্রেডিট নেই? তার লেখা ভালো না হলে কারা যাচ্ছেন বইমেলাতে অন্যধারার স্টলের সামনে ভীড় জমাতে? কারা তার একটি বই কেনার জন্য অধীর আগ্রহে দীর্ঘ লাইন ধরছেন? হুমায়ূন স্যারের দুই তিনটা বই পড়ে যারা নিজেদেরকে হিমু বা রুপা ভাবতে শুরু করেন কিংবা নিজেদেরকে বড় মাপের সাহিত্যবিশারদ মনে করতে শুরু করেন, তাদের প্রতি আমার এই প্রশ্নটা রইলো।

একটা গল্প বলি শুনুন। একজন জ্ঞানী ব্যক্তি একটি বড় দোকানের ঠিক মাঝ বরাবর দোকানের সামনেই দাঁড়িয়ে আছেন। তার সামনে দোকানের মুখ উন্মোচন করা রয়েছে। সে ভেতরটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। আরেকজন মূর্খ্য মানুষ তার থেকে এক হাত দূরত্বে দোকানের ঠিক একপাশে দাঁড়িয়ে আছে। তার সামনেও দোকানের মুখ খোলা। সেও দোকানের ভেতরের সবকিছু স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। 

প্রথমজন অর্থাৎ জ্ঞানী ব্যক্তিকে জিগ্যেস করা হলো— দোকানের ভেতরে কয় প্যাকেট বিস্কিট আছে? সে ভালো করে খুঁজে খুঁজে উত্তরে বললো, মাত্র এক প্যাকেট। কারণ, এই প্যাকেট ছাড়া তার সামনে আর কোন বিস্কিটের প্যাকেট দেখা যাচ্ছিলো না। মানে হচ্ছে— সে তো দোকানের বরাবর দাঁড়ানো। সামনের জিনিসগুলো স্পষ্ট দেখলেও দু'পাশের দেয়াল তাকে ঠিক কি আছে, সেটা স্পষ্ট নয়।

দ্বিতীয় ব্যক্তি তথা মূর্খ্য ব্যক্তিকে জিগ্যেস করা হলো— দোকানের ভেতরে কয় প্যাকেট বিস্কিট আছে? সেও ভালো করে খুঁজে উত্তর দিলো— দুই প্যাকেট। কারণ, তার এ্যাঁঙ্গেল থেকে আলটিমেটলি দোকানের দুটো পাশ ভালো করেই দেখা যাচ্ছিলো। এক পাশ দেখা যাচ্ছিলো না। দুই পাশেই দুটো প্যাকেট বিস্কিট ছিলো।

এখন কথা হলো—
জ্ঞানী ব্যক্তি কি তাহলে ভুল দেখলো? ভুলভাল বুদ্ধি খাটানোর কারণে সে আরেকটি প্যাকেট বিস্কিট দেখলো না? মূর্খ্য ব্যক্তি ভালো করে দেখেশুনে এবং বুদ্ধির জোরে দুই প্যাকেট দেখলো? 

মূলত বিষয়টা হচ্ছে- প্রথম ব্যক্তি বা জ্ঞানী ব্যক্তির দেখার এ্যাঁঙ্গেল ছিলো বরাবর বা সোজাসুজি। তাই পাশের তাকগুলো সে ভালো করে দেখতে পারছিলো না। পক্ষান্তরে দ্বিতীয় ব্যক্তির দেখার এ্যাঁঙ্গেল ছিলো একটু আলাদা। যার দরূন সে দুটো তাক ভালো করে দেখতে পারছিলো।

তদ্রুপ আমাদের মানবজনমেও ঠিক এমনটা হয়। আমরা একটা বিষয়কে একেকজন একেক এ্যাঁঙ্গেল থেকে দেখি বলেই আমাদের মতামতের কোন অভাব নেই। কত কত মত। কত কত ভিন্নতা। আমাকে জিগ্যেস করলে আমি বলবো সাদাত হোসাইন পুরস্কারের যোগ্য। আপনাকে জিগ্যেস করলে আপনি বলবেন, রাবা খান যোগ্য। আপনার মত একরকম, আরেকজনের আরেক রকম। মূলত প্রতিটি জিনিসই সঠিক এ্যাঙ্গেল থেকে দেখতে পারলে জীবনটাই সুন্দর ও শুদ্ধ হয়ে যেতো।