পিংক এন্ড ব্লু

রোদ্দুর রয়- যেতে যেতে পথে...

ফেসবুক আইডি বন্ধ থাকায় দেশে কি চলে সে ব্যাপারে কিছুটা অন্ধকারে ছিলাম৷ তাই, "যেতে যেতে পথে, পূর্ণিমা রাতে..." গানটি যখন মানুষ ব্যঙ্গাত্মক সুরে গাচ্ছে, ভাই বন্ধুদের মধ্যেও কেউ কেউ গানটি বেখাপ্পা সুরে গেয়ে মজা করছে তখন বুঝতে পারছিলাম না কেন এমন হচ্ছে। ঘটনা কি!

রবীন্দ্রনাথের লেখা এই গানটি আমার অত্যন্ত প্রিয়। আমার কোনো গান ভালো লাগলে সেটা রিপিট মুডে শুনার বদ-অভ্যাস আছে। এই গানটিও একসময়ে আমি রিপিট মুডে শুনেছি বহুবার। সেই প্রিয় গানটার এরকম দুর্দশায় আমি তাই একটু বিভ্রান্ত হয়ে গেলাম।

স্রোতের সাথে তাল মিলাতে না পারলে যা হয় আর কি! তাই ঘটনাটা একটু বুঝে স্রোতে ফেরার চেষ্টা নিলাম। কি জানি হয়ত ভুলই করে ফেলেছি কিনা! কারণ, রবীন্দ্রনাথের গান এভাবে গাওয়ার কারণ পোস্টমর্টেম করতে গিয়েই ভদ্রলোক(!)টির সম্পর্কে জানতে পারলাম, রোদ্দুর রয় নামখানা যার পরিচয়।

রোদ্দুর রয় কলকাতার মানুষ। তার পরিচয় তিনি কবি। হাসছেন? হ্যা, ইউটিউবের ভিডিও'তে হাতে গাঁজা নিয়ে তিনি কবিতার নামে যা বকেন, খিল্লিখেউড় ঝাড়েন, ওই দৃশ্যটাকে মাথায় রেখে রোদ্দুর রয়কে কবি স্বীকৃতি দিতে আপত্তি জানাতেই পারেন। কিন্তু, আপনি জেনে অবাক হবেন হয়ত, এই লোকটির প্রকাশিত বই আছে। আমাজন ডট কমে রোদ্দুর রয়ের তিনটি বইয়ের সংগ্রহ দেখতে পেয়েছি৷ যার মধ্যে একটি হচ্ছে 'পরম ক্যাওড়া কাব্য গ্রন্থ' আরেকটি হলো 'ছেলেবেলা আমাদের মামাবাড়ি টিয়া ছিল'।


রোদ্দুর রয়ের ইংরেজিতে প্রকাশিত বইও আছে! যার নাম 'And Stella Turns A Mom'। এই বইটিতে তিনি সাইকোলজিক্যাল বর্ণনায় সেক্স, মাতৃত্ব, ব্যক্তিত্ব ইত্যাদির উপর মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির উপর কথাবার্তা লিখেছেন। এছাড়া, কলকাতা লিটল ম্যাগাজিন সিনে এই রোদ্দুর রয় নামক লোকটি ভীষণ পরিচিত। অর্থাৎ, মোটা দাগে বললে শিল্প সংস্কৃতিমনা একজন লোক তাকে বলা যেতে পারে।

তাহলে কেন রোদ্দুর রয় খ্যাপা হয়ে গেলেন?

এটেনশন সিকিং মানসিকতা কিছু কিছু মানুষের মধ্যে প্রবল। সামটাইমস ল্যাক অফ এটেনশন মেইকস অ্যা ম্যান মনস্টার। আমি ধারণা করছি, রোদ্দুর রয় লিখে কিংবা বলে কখনো সেই এটেনশনটা পান নি যেটা পেলে নিজের কথাগুলো মানুষকে শুনাতে পারতেন। তাই তিনি এরকম একটা পন্থা বেছে নিলেন। গাঁজা খাচ্ছেন, সিগারেট জ্বালাচ্ছেন, হেরে গলায় গান গাইছেন। নিজেকে বলছেন 'বিশ্যো কবি'। একটা ভিডিওতে দেখলাম, রবীন্দ্রনাথ বা বিশ্বকবি টার্মটার উপর তিনি রাগ ঝাড়ছেন। রোদ্দুর সেখানে বলছেন, কেউ কেউ বিশ্বকবি বলেছেন অমুক অমুক...এইরকম করে কথা বলতে পারলে নিজেকে খুব ইয়ে টিয়ে ভাবে। আবার বিশ্বকবি কিছু বলেছেন মানে সেটা প্রবাদ প্রতিম এরকমটা একটা ভাব থাকে অনেকের। এসব বলার পর রোদ্দুর সেখানে বিভিন্ন রকমে খিল্লি দিয়ে, গালাগাল দিয়ে বোঝাতে চাইছেন, বিশ্বকবি যা বলেছেন, যা করেছেন তাকে ধ্রুব ভাবার কিছু নেই। এটা রোদ্দুরের কথাগুলোর মূল সারমর্ম। তার এই কথাগুলোর মধ্যেও বুঝলাম, কবি রোদ্দুর রায় দুনিয়ার উপর ক্ষীপ্ত যেখানে রবীন্দ্রনাথ রবীন্দ্রনাথ করতেই সবাই পাগল, কিন্তু কেউ তাকে পাত্তা দিচ্ছে না।


এছাড়া, তার একটা সিরিজ আছে, 'মক্সা' সিরিজ। তিনি মক্সাগল্প, মক্সাকমেডি, মক্সাগান, মক্সাকবিতা নামে বিভিন্ন ভিডিও ছাড়েন। বাংলা সাহিত্যে নকশার কথা শুনেছি। কালীপ্রসন্ন সিংহের 'হুতোম প্যাঁচার নকশা' নামে কিছু লেখা ছিল যেখানে তিনি ব্যঙ্গ, সারকাজমে নিজের মনের ভেতরকার কথাবার্তাগুলো লিখে গেছেন। আর এখন দেখছি, রোদ্দুর রয়ের 'মক্সা'। মক্সা'র নামে তিনি উদুম গালাগাল দেন, ছন্দে ছন্দে বিভিন্ন আপত্তিকর শব্দে কবিতা বলেন। তার এই মক্সা আলাপের একটা প্রধান লক্ষ্যবস্তু রাজনীতি, শাসকদল, রাজনীতিবিদ, সংসদ।

তিনি মোদী, মমতা ব্যানার্জিকে নিয়ে প্রচুর ব্যঙ্গ করেছেন তার ভিডিও'তে। মোদীর 'আচ্ছে দিন' আর মমতার 'মা মাটি মানুষ' ডায়ালগকে রীতিমতো তুলোধুনো করেছেন। রাজনীতিবিদরা কিভাবে পুতুল নাচের মতো দেশ নাচায় তার অশ্লীল বর্ণনা এসেছে রোদ্দুর রায়ের কথাবার্তায়। রোদ্দুর রায়ের এইসব ভিডিও'র নিচে আবার কেউ কেউ কমেন্ট করে, আপনার কথায় খুব গভীরতা আছে গুরু কিংবা এসব বোঝার তো কেউ নেই ইত্যাদি ইত্যাদি। সরকার কিংবা রাজনীতি নিয়ে কথা বলে এমনিতে হয়ত এটেনশন কোনো কালে পেতেন না রোদ্দুর রয়। তাই গালাগাল দিয়ে, মক্সা করার ফাঁকে দুই চার লাইন ভালো কথার মধ্যে অনেকগুলো বাজে শব্দ মিলিয়ে তিনি বিরোধীতা প্রকাশ করছেন, এটা তার পাগলামো নাকি প্রতিবাদ?

একটা তথ্য দেই। বাংলাদেশের সুন্দরবনের রামপালে কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ পরিকল্পনার প্রতিবাদে রোদ্দুর রায়ও প্রতিবাদ করেছেন। বইমেলায় তার একটা স্টল ছিল ২০১৭ সালে, মক্সা কর্নার নামে। তিনি সেই স্টলে বসে সুন্দররক্ষার পক্ষে গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করছিলেন। পাশাপাশি গান, কবিতা ও চিত্রাঙ্কন করে প্রতিবাদ করছিলেন।


সেই রোদ্দুর রায় ইউটিউবে অন্য এক মানুষ। একটার পর একটা গাঁজা খান। রবীন্দ্রনাথের গানকে যাচ্ছে তাই ভাবে গেয়ে যান। যারা আসল গানটাও এতো শুনে না, তারা রোদ্দুর রয়ের গাওয়া বিকৃত গলার গানটা কয়েকবার শুনে ফেলে। ইউটিউবে অনেক ভাল ভাল চ্যানেলে কন্টেন্ট আছে, ভিউ নেই। কিন্তু রোদ্দুর রায় ঠিকই ভিউ পান, লাখ লাখ লোক তার চ্যানেলে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। তিনি যা করেন, তাতেই সাড়া পান। ফেসবুকেও তার ভিডিও ছড়ায় বেশ বিস্তৃত পরিসরে।

সর্বশেষ, 'যেতে যেতে পথে পূর্ণিমা রাতে...' গানে তিনি কয়েকটি স্ল্যাং জুড়ে দিয়ে যে ভার্সনটা গাইলেন তা নাকি রীতিমতো সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং হয়েছে। আমিও খেয়াল করে দেখলাম, এই বিকৃত ভার্সনের গানটারই আবার অনেক কাভার হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের গানকে নয়, তারা রোদ্দুর রয়ের গান(!)কে কাভার করছে।

এই যখন সমাজের অবস্থা, তখন প্রতিভার কদর হবে কিভাবে? ভালো কন্টেন্টের কদর করবে কে? রোদ্দুর রয় কেউ না, যদি না লোকে তাকে রোদ্দুর রয় না বানাতো। রোদ্দুর রয় খারাপ, অশ্লীল কন্টেন্ট বানায় মেনে নিয়েও বলছি, এই খারাপের দর্শকপ্রিয়তাই বেশি। রোদ্দুর রয়ের ভিডিও দেখে আনমনে 'শালা পাগল' বলতে দ্বিধা হয় না কারো, কিন্তু এই পাগলামো বারবার দেখে যারা তাকে পাগল বলে তারা কতটুকুই বা সুস্থ?

রবীন্দ্রনাথকে রোদ্দুর রয় পছন্দ না-ই করতে পারে, কিন্তু তাই বলে তাঁর গান নিয়ে এভাবে তামশা করতে হবে? বিকৃতি চলতে থাকবে এরকম? ভেবে দেখলাম চলতে থাকবেই। কারণ, রবীন্দ্রনাথের গানগুলো কখনো এভাবে ভাইরাল হতে দেখিনি, রোদ্দুর রয়ের গাওয়া বিকৃত ভার্সন যতটা ভাইরাল হয়েছে। একজন এটেনশন সিকার মানুষ যে যতই গাঁজা খেয়ে 'ডোন্ট কেয়ার' ভাব নিক, পাবলিক রিয়েকশন আর রেসপন্স দেখে সে নিশ্চয়ই আরো অনুপ্রাণিত। তাই এই গানের বিকৃতি যে চলবে তা অনুমান করা কঠিন কিছু নয়।

রোদ্দুর রয়ও হয়ত জানে, সে যা বলতে চায় তা শুনবে না কেউ। লোকে খাঁটি কথা শুনতে চায় না। ভালো একটা বই পড়ার সময় নেই। সত্যিকারের প্রতিভা বেশিরভাগ সময় নজরের বাইরেই থেকে যায় অনুপ্রেরণার অভাবে। লোকে বরং সেফুদা, হিরো আলম, রোদ্দুর রয়দেরকে সেলিব্রেট করতে বেশি আরাম পায়। তাই যেতে যেতে পথে পূর্ণিমার চাঁদ মুখ লুকিয়ে ফেলে লজ্জায়....