তারুণ্য

স্কলারশিপের টাকায় ভাসমান স্কুল, বাংলাদেশের উদ্ভাবক জিতলেন 'আর্থ হিরো' খেতাব!

সেই ২০০২ সালে নিজের স্কলারশিপের টাকায় তিনি শুরু করেছিলেন ভাসমান স্কুল। স্বপ্ন ছিল, বন্যায় সব বন্ধ হলেও যেন বাচ্চাদের পড়ালেখা বন্ধ না হয়। এগিয়ে চলো'তে তাকে নিয়ে আর্টিকেল লিখেছিলাম ২ বছর আগে। কেউ পাত্তাও দেয় নি। এই মানুষটার এমন কাজকে কেউ ভালবাসা জানায় নি। ফেসবুকে ভাইরাল হন নি তিনি৷ আমাদের নিউজ ফিড জুড়ে কেবল ঘুরেছে নেগেটিভিটি।

আমরা না চিনলেও বাংলাদেশের এই উদ্ভাবককে যুক্তরাজ্য চিনেছে ঠিকই। ভাসমান স্কুল স্থাপনার জন্যে স্থপতি মোহাম্মদ রেজওয়ানকে তাই দেয়া হয়েছে 'আর্থ হিরো' খেতাব। পৃথিবী জুড়ে রেজওয়ানের ভাসমান স্কুল মডেল প্রশংসিত হয়েছে। কারণ, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকিতে পৃথিবীর বিরাট এক অংশ ভেসে যেতে পারে জলের তলায়। সেই অনাগত দুঃসময় নিয়ে কজনই বা ভাবেন মন দিয়ে? ভেবেছেন রেজওয়ান, নাটোরে নিজের এলাকায় বন্যায় পড়ালেখা বন্ধ হওয়া দেখেছেন।

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার চলনবিল এলাকার সিধুলাই গ্রামটি বন্যাকবলিত গ্রাম। চলনবিলে বছরের সাত মাস পানি থাকায়, এই এলাকার শত শত স্কুল বন্যার কারণে বন্ধ হয়ে যায়। সিধুলাই গ্রামের সন্তান স্থপতি মোহাম্মদ রেজওয়ানের মনে দাগ কেটে যায় বিষয়টি। বাংলাদেশ নদীর দেশ, জলের দেশ। এখানে পানি থাকবে এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু পানির কারণে ছেলেমেয়েরা স্কুলে যেতে পারছে না এই বিষয়টি রেজওয়ানকে ভাবিয়ে তোলে।

তিনি তার সৃজনশীলতা দিয়ে এই সমস্যার একটি যুগান্তকারী সমাধান খুঁজে বের করেন। জলই যেহেতু সমস্যা, জলই হবে সমাধান। নৌকার মধ্যেই স্কুল করার চিন্তা করলেন, নকশাও করে ফেললেন স্কুলের। প্রথমবারের মতো তিনি শুরু করলেন একটি ভাসমান স্কুল! অভিনব এই স্কুল গড়ার পেছনে আইডিয়ার কথা বলেছিলেন রেজওয়ান-

'বন্যাকবলিত অঞ্চলে বেড়ে ওঠার ফলে আমি খুব কাছ থেকেই এখানকার মানুষের কষ্ট দেখেছি। এখানকার মানুষের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হতে দেখতে দেখেছি। বর্ষার সময়টায় ছাত্রছাত্রীরা একদমই স্কুলে যেতে পারে না, কারণ রাস্তা তখন ডুবে থাকে পানির তলায়। এর ফলে স্কুল থেকে প্রতিবছর অনেক ড্রপআউট হয়।  যদিও আমার পরিবারের একটি নিজস্ব নৌকা ছিলো। আমি সেই নৌকাতেই বর্ষার সময়ে স্কুলে যেতাম।

কিন্তু অনেকেই এভাবে যেতে পারতো না। আমি ভেবেছিলাম যদি ছেলেমেয়েরা যাতায়াত সমস্যার কারণে স্কুলে না যেতে পারে,তাহলে স্কুলই তাদের দ্বারে দ্বারে যাবে, নৌকা করে। কিন্তু একজন স্থপতি হিসেবে আমাকে ভাসমান স্কুলটা করার আইডিয়া কাজে লাগানোর জন্য ইনভেস্টর খুঁজে পেতে কষ্ট হয়েছে। কিন্তু সামাজিক উদ্যোক্তা হিসেবে আমি একটি অলাভজনক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করি। সংস্থাটির নাম “সিধুলাই স্বনির্ভর সংস্থা”। সেটা ১৯৯৮ সালের কথা।"

আটানব্বুই সালে মাত্র একটি কম্পিউটার, নিজের জমানো কিছু টাকা আর নিজের স্কলারশীপের ৫০০ ডলারের টাকা দিয়ে ভাসমান স্কুলের কাজ শুরু করেন। ইন্টারনেট সম্পর্কে তার ধারণা ছিল। তাই তিনি বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় প্রায় একশটার বেশি সংগঠনের কাছে মেইল পাঠানো শুরু করলেন সাহায্য পাবার আশায়। 

সে সময়টা খুব কঠিনই ছিলো রেজওয়ানের জন্যে। মানুষ কত কিছু করে, আর রেজওয়ান কি না নিজের স্কলারশীপের শেষ পয়শাটাও খরচ করে ফেলেছেন ভাসমান স্কুল গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়ন করার জন্য। 

ভাসমান স্কুল গড়ার জন্যে এলাকায় খোঁজখবর রাখতেন। যেখানে পুরানো কিংবা অচল নৌকা পাওয়া যেতো সেগুলো তিনি সংগ্রহ করতেন। পরে তাদেরকে মেরামত করে স্কুল করার উপযোগী করে সাজাতেন। প্রথম ভাসমান স্কুলটি তৈরি করার জন্য রেজওয়ানের প্রায় চার বছর সময় লেগেছিলো।

কী আছে স্কুলটিতে?

একটি সৌর বিদ্যুৎ প্যানেল রয়েছে ভাসমান এই স্কুলটিতে। এই বিদ্যুৎ ব্যবহার করে সন্ধ্যার পরেও স্কুলের কার্যক্রম চালানো যায়। নৌকার আলোতে কিংবা কে জানে শিক্ষার আলোতে গ্রামটাও উজ্জ্বল হয়ে জ্বলে রাতে। নৌকার ভেতরেই ক্লাসরুম বানানো হয়েছে। আছে চেয়ার,টেবিল, ব্ল্যাকবোর্ড। বই এর সেলফও আছে নৌকার ভেতরেই। স্কুলটিকে যতটা সম্ভব সুযোগ সুবিধা সংযুক্ত করেছেন রেজওয়ান।

বরং, সাধারণ ভূমির স্কুলগুলো থেকেও এটিকে আধুনিক স্কুল বলা যেতে পারে। কারণ, স্কুলটি শুধু কম্পিউটারই নয়, শিক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয় এমনঅনেক ইলেকট্রনিক ডিভাইস দ্বারা সুসজ্জিত৷ আছে ইন্টারনেট সংযোগের সুবিধাও। নৌকাই যেনো আরেক ভাসমান পৃথিবী! দৈর্ঘ্য ৫৫ ফুট, ১১ ফুট প্রস্থের একেকটি নৌকায় ত্রিশজন ক্লাস করতে পারেন। রেজওয়ান সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন এই ভাসমান নৌকায়। বই, খাতা, কলম সব কিছুই দিচ্ছেন বিনামূল্যে।

তবে সবচেয়ে সুবিধা পাচ্ছেন গ্রামের মেয়ে শিক্ষার্থীরা। গ্রামের অনেকেই মেয়েদের স্কুলে পাঠাতে চায় না। কিন্তু যখন স্কুলই ঘরের কাছে চলে আসে তখন বাবা মায়েরাও আপত্তি করতে পারেন না, বরং আগ্রহ নিয়েই এখন মেয়েদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন তারা। রেজওয়ানের সংস্থাটি ভাসমান স্কুলের মাধ্যমেই কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখেনি। বন্যাকবলিত অঞ্চলে এমনিতেই অসুখ বিসুখ বেশি হয়।

বিশেষ করে পানিবাহিত রোগ হওয়ার আশংকা তো সবসময়ই থাকে এই এলাকাগুলোতে। তিনি তাই শুরু করলেন ভাসমান ক্লিনিকের কার্যক্রমও! ভাসমান ক্লিনিকের মাধ্যমে গ্রামবাসীকে চিকিৎসার সুবিধা দিচ্ছেন তিনি। এছাড়া ভাসমান লাইব্রেরিও আছে রেজওয়ানের। যেখানে ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন বিষয়ের উপর বই পড়তে পারেন। আছে ভাসমান কৃষি বিষয়ক ট্রেইনিং সেন্টার। এই ভাসমান প্রকল্পের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হচ্ছে ভাসমান খামার। ভাসমান খামার বর্ষাকালের জন্য, যখন কৃষকরা প্রচলিত ফসল ফলাতে পারেন না, বেকার বসে থাকতে হয়, তাদের কথা ভেবেই এই উদ্যোগ। 

ভাসমান স্কুলের স্বীকৃতি

পুরষ্কার এর কথা যদি বলা হয়, তাহলে এই স্কুলের উদ্যোগ নেয়ার জন্যে  এ পর্যন্ত  ১৫টির অধিক পুরষ্কার পেয়েছেন রেজওয়ান। “বিল গেটস ফাউন্ডেশন” থেকে “মিলিয়ন ডলার ফান্ড”পেয়েছেন স্কুলের জন্যে। বিখ্যাত ইন্টেল কোম্পানিও তাকে এওয়ার্ড দিয়েছে ভাসমান স্কুলের জন্যে। 

২০১২ সালে পেয়েছেন “WISE AWARD”। এই পুরষ্কার পাওয়ার পর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাবিদরা, পরিবেশবাদীরা নড়ে চড়ে উঠেন।তারা বুঝেন যে বাংলাদেশের মতো একটি দূর্যোগপ্রবণ দেশে, যেখানে প্রতিবছরই প্রায় বন্যা হয়, এখানে কি ভাবে একটা বঞ্চিত জনগোষ্ঠীতে অভিনব আইডিয়া ব্যবহার করে শিক্ষার আওতায় নিয়ে আসা হয়েছে। রেজওয়ানের এই পদ্ধতি এখন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রোল মডেল হিসেবে কাজ করছে।

আর এবার তিনি পেলেন 'আর্থ হিরো' খেতাব। সত্যিই তিনি হিরো, যদিও এই হিরোর কদর আমরা এখনো হয়ত করছি না, কিন্তু গোটা দুনিয়া ঠিকই রত্ন চিনতে ভুল করে নি!