এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

'মেয়েটাকে যেভাবে ওরা পুড়িয়ে মেরেছে, আমার ছেলেকেও সেভাবে পুড়িয়ে মারুন!'

তেলেঙ্গানা এখন উত্তাল বিক্ষোভের নগরী, ক্ষোভে ফেটে পড়ার অপেক্ষায় পুর ভারত। ছাব্বিশ বছরের এক তরুণীকে গনধর্ষণের পর জীবন্ত অবস্থায় তার গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছে, এই নৃশংস ঘটনার বিচারের দাবীতে রাস্তায় নেমেছে সাধারণ মানুষ। দিল্লির নির্ভয়া কান্ডের পরে যেমনটা হয়েছিল, ঠিক সেরকমই একটা অবস্থা এখন তেলেঙ্গানায়। এরইমধ্যে এক ধর্ষকের মা তার সন্তানের কৃতকর্মের জন্যে ক্ষমা চেয়েছেন জাতির কাছে, বলেছেন, সেই তরুণীকে যেভাবে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়েছে, তার ছেলেকেও সেভাবে পুড়িয়ে মারা হোক!

হায়দরাবাদের ঘটনায় নিহত তরুণী প্রিয়াঙ্কা রেড্ডি'র মা ঘটনার পরে হত্যাকারীদের পুড়িয়ে মারা উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন। গতকাল ভারতাইয় গণমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এক ভিডিওতে এক অভিযুক্তের মাকে বলতে শোনা গেছে, 'আমার ছেলে দোষী হলে তাকেও পুড়িয়ে মারা উচিত। নিহত তরুণীও তো কারও মেয়ে। এখন আমি কষ্ট পাচ্ছি। বুঝতে পারছি,  ওই তরুণীর মা কতটা কষ্ট পাচ্ছেন।' 

ঘটনার পরে শুধু নির্যাতিতার পরিবারের কাছে না গিয়ে মিডিয়া ছুটে গেছে অভিযুক্তদের ঘরেও, মাইক্রোফোনের বুম এগিয়ে ধরে জিজ্ঞেস করেছে তাদের কিছু বলার আছে কিনা। কেউ মুখ লুকিয়েছেন, জবাব দেননি প্রশ্নের, বন্ধ করেছেন দরজা। কয়েকজন আবার মুখ খুলেছেন, ভুলু নামের এক ধর্ষকের মা বলেছেন, "দোষ করে থাকলে ওকে উপযুক্ত শাস্তি দিন। আমারও মেয়ে আছে।" আরেক অভিযুক্ত শিবার মায়ের মুখ থেকে বেরিয়ে এলো- 'যা করা প্রয়োজন বলে মনে হয়, তা-ই করুন। ঈশ্বর জানেন কী হবে।'

হায়দরাবাদের কল্লুরু গ্রামের একটি পশু-হাসপাতালে কাজ করতেন প্রিয়াঙ্কা রেড্ডি। তদন্তে পুলিশ জেনেছে, ঘটনার সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে প্রথমে গোচিবাওলিতে এক চর্মচিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। নিজের স্কুটারটি সামশাবাদ টোল প্লাজার কাছে রেখে ট্যাক্সি নিয়ে ওই চিকিৎসকের সঙ্গে তিনি দেখা করতে যান। ফিরে এসে দেখেন, স্কুটারের পিছনের চাকাটি পাংচার হয়ে গেছে। আসলে সেটি পাংচার করে দিয়েছিল চার ট্রাকশ্রমিক, প্রিয়াঙ্কাকে ধর্ষণ করার পরিকল্পনা তারা করেছিল তাকে দেখার পরেই। 

হায়দরাবাদ শহর থেকে শামশাবাদ প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। প্রিয়াঙ্কা ওই টোল প্লাজা থেকে রাত ৯টা নাগাদ তার বোনকে ফোন করে বলেন, দুই ট্রাকচালক তাকে সাহায্য করবে বলছে। তিনি রাজী না হওয়ার পরেও টায়ার সারিয়ে দেবে বলে স্কুটার নিয়ে চলে গিয়েছে এক জন। বোন তাকে পরামর্শ দেন, স্কুটারটি রেখে ট্যাক্সি ধরে যাতে তিনি বাসায় চলে আসেন। এরপরে আর প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তার বোন। পৌনে ১০টায় বোন আবার ফোন করে দেখেন, মোবাইল বন্ধ। পরের দিন সকালে সামশাবাদের আউটার রিং রোডের আন্ডারপাসের নীচে প্রিয়াঙ্কার পোড়া দেহাংশ পাওয়া যায়।

পুলিশ বলেছে, প্রিয়াঙ্কা যখন টোল প্লাজার সামনে স্কুটার পার্ক করে বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তখন সেখানে বসে মদ্যপান করছিল চার অভিযুক্ত। তার সবাই ট্রাক শ্রমিক। তখনই তারা পরিকল্পনা করে তরুণীকে ধর্ষণের। সেই মোতাবেক পাংচার করে দেয়া হয় তার স্কুটার। ফিরে এসে প্রিয়াঙ্কা যখন দেখলেন এই স্কুটার নিয়ে বায়ারি ফেরা যাবে না, তখন উপযাচক হয়ে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে চারজন। এদের মধ্যে শিবা নামের একজন চলে যায় স্কুটার নিয়ে। 

রাত তখন সাড়ে নয়টার বেশি, সুনশান হয়ে এসেছে এলাকা। বোনের সঙ্গে কথা বলার পর প্রিয়াঙ্কা যখন ট্যাক্সির খোঁজ করছিলেন, তখন আচমকাই তার ওপর হামলে পড়ে তিনজন। মুখ চেপে ধরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পার্শ্ববর্তী একটা ঘরে। সেখানে হাত-পা-মুখ বেঁধে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়। ততক্ষণে শিবা ফিরে এসেছে, সে-ও অংশ নেয় ধর্ষণে। 

প্রমাণ লোপাট করার জন্যে প্রিয়াঙ্কাকে মেরে আহত করার পরে তার দেহটা নিয়ে যাওয়া হয় শহর থেকে খানিকটা বাইরে নদীর ধারে। জায়গাটা আবর্জনা ফেলার জন্যে ব্যবহৃত হয়, সহজে কেউ আসে না। সেখানে তরুণীর গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় নরপিশাচেরা, তখনও তার দেহে প্রাণ ছিল! পরের দিন ভোরে এক দুধ-বিক্রেতা সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেহটি জ্বলতে দেখে পুলিশে খবর দেন।

প্রিয়াঙ্কার মোবাইল বন্ধ দেখে তার পরিবার সেই রাতেই থানায় ডাইরী করতে গিয়েছিল, কিন্ত পুলিশ উল্টো অসহযোগীতা করেছে তাদের। একারণ্ব তিন পুলিশকে সাসপেন্ডও করা হয়েছে। তেলেঙ্গানার মূখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, দ্রুত বিচার আইনে চালানো হবে প্রিয়াঙ্কার খুনের মামলা। এই ঘটনা নিয়েও নানামুখী রাজনীতি শুরু হয়েছে ভারতে। প্রিয়াঙ্কার ধর্ষণে জড়িতদের একজন মুসলমান, তাকে লক্ষ্য বানিয়ে মুসলমানদের আক্রমণ করে যাচ্ছে গোঁড়া হিন্দুত্ববাদী বিজেপি এবং আরও কিছু দল-উপদল। অথচ বাকী তিন অভিযুক্ত যে হিন্দু, সেটা দেখেও দেখছে না তারা! মাদার ইন্ডিয়া হয়ে ধর্ষকের মায়েরা তার ছেলের বিচার চাইতে পারে, অথচ ধর্মান্ধ এই লোকগুলো তখনও সেটা নিয়ে অপরাজনীতি করার চেষ্টা চালিয়ে যায়!