রাজনীতি নাকি জননীতি

কেন 'খাঁচায় বন্দী' রাষ্ট্রপতি?

আমাদের রাষ্ট্রপতি এই শীতের সময়টায় বিভিন্ন সমাবর্তনে দাওয়াত পান। সমাবর্তনে তিনি লিখিত বক্তব্যের বাইরে গিয়ে মন খুলে কটা কথা বলেন। সেসব কথা কখনো আমাদের হাসায়, কখনো ভাবায়, কখনো আনন্দ দেয়। যদিও রাষ্ট্রপতি হয়ে তিনি কেন এমন হালকা চালে কথা বলেন, তিনি কেন কৌতুক করেন তা নিয়ে অনেকের আবার খেদ আছে। রাষ্ট্রপতির কাছে যে লোকের প্রত্যাশা অনেক বেশি।

কিন্তু, রাষ্ট্রপতির পদটাই এমন আমাদের দেশে যে, চাইলেও তিনি সবসময় সব কিছুতে কথা বলতে পারেন না। তবে, আমি প্রায়ই দেখি বিভিন্ন সমাবর্তনে রাষ্ট্রপতি হাসি ঠাট্টা মজাচ্ছলে কথা বলার ফাঁকেও যে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেন, তা অভিনব। এতো সহজিয়া ভঙ্গিতে ভারী ভারী বিষয় নিয়ে কথা বলা সহজ কথা না।

এই যেমন ব্র‍্যাকের সর্বশেষ সমাবর্তনে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন, তা যদি কেউ শুনে থাকেন তাহলে রাষ্ট্রপতির গুণমুগ্ধ হয়ে যাবেন হয়তো। রাষ্ট্রপতি সিন্ডিকেটবাজি নিয়ে কথা তুলেছিলেন। কি সহজ তার কথা বলা, তিনি বলেন, মারাত্নক ইউনিটি দেখি আমি, একতা। কাদের মধ্যে? সেটা হইলো যেমন মটর‍যান চালক এদের মালিক বাহিনী এদের মইধ্যে একতা আছে। মটরযানের শ্রমিক বাহিনী এদের মইধ্যে একতা আছে। পেঁয়াজের যারা আড়তদার, মজুতদার এদের মইধ্যে কিন্তু ইউনিটি আছে। আবার লবনের ব্যবসায়ী যারা আছে এদের মইধ্যেও ইউনিটি আছে। যত সংগঠন আমি দেখি, শ্রমিক মালিক, সবার মইধ্যেই ইউনিটি আছে। শুধু ইউনিটি নাই জনগণের মইধ্যে..."

কথাগুলোর ভার বোঝার ক্ষমতা বাংলাদেশের জনগণের আছে কিনা কে জানে। আমাদের মধ্যে এতো ভাগাভাগি, অনলাইনে অফলাইনে আমরা কখনো কোনো এক বিন্দুতে একত্রিত হতে পারি না, একতাবদ্ধ হতে পারি না। আমাদের মধ্যে সত্যিই একতার কত অভাব, আর তাই আমাদের উপর যে যেভাবে পারে কাঁঠাল ভেঙ্গে খায়, আমরা আঙ্গুল চুষে দেখে যাই। আমরা সড়কে জিম্মি হই, আড়তদারেরা আমাদের গুজবতান্ত্রিক মনকে ব্যবহার করে...

রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন দেশের উদাহরণ দিয়ে বলেন, অন্যদেশে উৎসবের সময় জিনিসপত্রের দাম কমে। আর এইটা আল্লাহর গজব বাংলাদেশ রোজা আইলেই সব জিনিসের এমন বাড়া বাড়ে, পাবলিকও হুড়মুড় করে কিনে।

বাংলাদেশের মানুষের গুজবে বিশ্বাস ও স্বার্থপর মানসিকতার দিকটাও উঠে আসে রাষ্ট্রপতির কথায়। অন্যসময় যে এক কেজি পেঁয়াজ কিনে বা এক কেজি লবন কিনে যখন দাম বাড়ার গুজব উঠে, তখন তারাই আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে ডাবল ডাবল কিনে নিজের ঘরে মজুদ করে রাখে।

রাষ্ট্রপতি বলেন, আমরা কেন এরকম করে ভাবি না যে আমি একাই যদি পাঁচ কেজি কিনি তাহলে অন্য আরেকজন কিভাবে কিনবে, সবাই মিলে এভাবে কিনলে সংকট তো আরো বাড়বে। আমরা কেন এই সংকট একসাথে মোকাবেলা করি না? আজকে লবন যদি শর্ট পড়ে তাহলে গোটা দেশের সবার জন্যেই তো একই পরিস্থিতি হবে, এরকম সময়ে সবাই মিলে একতাবদ্ধ হয়ে এই সংকট মোকাবেলা করার ভাবনা না ভেবে আমরা কেন স্বার্থপরের মতো মজুতদার হয়ে যাই?

রাষ্ট্রপতি আঞ্চলিক কথার টানেই বলেন, পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য, যদি জনগণ একতাবদ্ধ হয়ে পেঁয়াজ কেনা থেকে বিরত থাকত মজুতদাররা বাপ বাপ কইরা বলত, দাম যা দেয়ার দিয়েন, পেঁয়াজ নিয়া যান, পচে যাইতেসে...

কিন্তু জনগণের একতাবদ্ধতা নেই। যদিও পেঁয়াজ খাওয়া বন্ধ করে দেওয়া হয়ত সমাধান হতে পারে না, রাষ্ট্রের ব্যর্থতাও এতে করে আড়াল করা যায় না তবুও রাষ্ট্রপতি যে স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে কথাগুলো বলেছেন তা সত্যিই অন্তরে গিয়ে লেগেছে।

একই কথা প্রধানমন্ত্রীও বলেছিলেন, তিনি পেঁয়াজ ছাড়া রান্না করেন। পেঁয়াজ খাওয়ার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করেছিলেন প্রধানমন্ত্রীও। কিন্তু, প্রধানমন্ত্রীত সেই কথায় হয়ত খুব বেশি লোকে কর্ণপাত করে নি। সব কিছুতে প্রধানমন্ত্রীকে এতো বেশি কথা বলতে হয় যে, সব কথার মেসেজ একরকমে হয়ত জনগণের কাছে পৌঁছায়ও না। দাম বাড়ার সাথে সাথে মানুষের নাভিশ্বাস, সরকার সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ, এরকম সময়ে জনগণকে পেঁয়াজ খাওয়ার ব্যাপারে বলাটা হয়ত জনগণ খুব একটা ভালো সমাধান ভাবতে পারে নি।

অথচ, একই বিষয়ে রাষ্ট্রপতির বক্তব্য বেশ আলোচিত হয়েছে। এই বক্তব্য যখন রাষ্ট্রপতি দিচ্ছিলেন তখন মুহুর্মুহু করতালি পড়ছিল সমাবর্তনের আয়োজনে।

আমরা দেখি ওবায়দুল কাদের প্রায় সময়ই বিভিন্ন ইস্যুতে বিবৃতি দেন। কখনো কখনো বিতর্ক উশকে উঠে তার কথাতেও। কারণ, সবার কথা বলার এপ্রোচ একরকম হয় না। সবার কথার টোন জনবান্ধবও মনে হয় না। রাষ্ট্রপতি যখন তার বক্তব্যে কথাগুলো বললেন তখন মনে হলো, জনগণের দুর্ভোগে তিনিও সমানভাবে ব্যথিত। এরকম মনে হয় তার বলার ভঙ্গির কারণে, কথার মাঝে লুকিয়ে থাকা আন্তরিক ছাপটার কারণে...

অথচ, রাষ্ট্রপতির এরকম কথা বলার সুযোগ নাই বললেই চলে। এই ডিসেম্বর জানুয়ারি এইসময়ে কিছু সমাবর্তনে যাওয়ার সুযোগে তিনি কথাবার্তা বলেন। অন্যথায় তার বলার জায়গা খুব কম।

বাংলাদেশের সংবিধানে রাষ্ট্রপতি পদটাকে অদ্ভুত সম্মান দেয়া হয়েছে। অনুচ্ছেদ ৪৮ এর ২ নং দফায় বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের অন্য সকল ব্যক্তির উর্ধ্বে স্থান লাভ করিবেন। তারপরের দফায় বলা হয়েছে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্র ছাড়া রাষ্ট্রপতি তাঁর সকল দায়িত্ব পালনে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করবেন।

রাষ্ট্রপতির নিজস্ব ভাবনা চিন্তার প্রতিফলন ঘটাবার সুযোগ তাই এমনিতেও কম। তাছাড়া, রাষ্ট্রপতি পদের অলংকারিক ধর্ম এবং প্রটোকলের কারণেও হয়ত রাষ্ট্রপতি চাইলেও খুব বেশি উদ্যোগ বা কথাবার্তা বলতে পারেন না।

যদিও আমাদের রাষ্ট্রপতির মতো একজন রাজনৈতিক চরিত্রকে দেশের ক্রান্তিলগ্নে কিংবা সংকটকালীন সময়ে কাজে লাগানোর সুযোগটা হয়ত নিলে জনগণের প্রতি সরকারের বার্তা বা কমিউনিকেশনের জায়গা আরো সুন্দর হতো বলে মনে হয়।

রাষ্ট্রপতি সমাবর্তনে অনেক কথা বলার পর বলেন, যাইহোক আমার তো বলার সুযোগ নাই। আমি হইলাম খাঁচার ভেতরে বন্দী। আমার কথা বলার সুযোগ কম। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেপেলেদের কনভোকেশন হইলে কিছু কথা বলার সুযোগ হয়। এই এডভান্টেজটাই আজকে নিলাম।"


তার এই কথায় বুঝতে পারি, দেশের কথা এবং পরিস্থিতি তিনি কতটা তীব্রভাবে পর্যবেক্ষণ ও অনুভব করেন। কতটা আন্তরিক আকুলতা নিয়ে অপেক্ষা করেন, দেশের মানুষকে কিছু বলার জন্যে। কিন্তু, প্রটোকল কিংবা ফর্মাল পদমর্যাদায় থাকার কারণে মনটা খুলে তিনি বলতে পারেন না।

কেন রাষ্ট্রপতি কথা বলতে পারেন না, এই সুযোগটা কি সাংবিধানিকভাবেই কম নাকি অলিখিত বা লিখিত কোনো নিয়ম আছে যে রাষ্ট্রপতির এই এই ইস্যুতে এই এই বিষয়ে কথা বলা নিষেধ? বাধাটা ঠিক কোথায় তা জানতে বড় ইচ্ছে হয়। একজন রাষ্ট্রপতি যাকে সংবিধান বলে দেশের অন্য সকল ব্যক্তির উর্ধ্বে, সেই মানুষটা কোন বাধায় কথা বলতে পারেন না? তিনি কথা বললে সেটা বরং আরো ভালো ইম্প্রেশন তৈরি করতে পারে, জনগণ ও সরকারের মধ্যে সমঝোতার জায়গা পোক্ত করতে পারে। কিন্তু কেন এই সুযোগটা নেয়া হচ্ছে না?

রাষ্ট্রপতি যেন মন খুলে কথা বলতে পারেন, দেশের মানুষের ব্যথা অনুভব করে মানুষকে মানুষের বোধের ভাষায় বুঝিয়ে বলতে পারেন, আঙ্গুল তুলতে পারতেন অন্ধকারের দিকে, সেই জায়গাখানি তৈরি করতে বাধা যা আছে, তা কি দূর করার উদ্যোগ নেয়া হবে? আশাবাদ রাখি, রাষ্ট্রপতি খাঁচায় বন্দী না থাকুন আর, মুক্ত মনে মুক্ত মতের প্রবক্তা হন বরং...