রাজনীতি নাকি জননীতি

বন্ধুত্বের সম্মান যারা দিতে পারে না, তাদের সঙ্গে একতরফা প্রেমের কি দরকার?

মাসখানেকের মধ্যে দু'বার ভারত সফরে গেলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অক্টোবরে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় সফরে, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে। বেশ কয়েকটা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে তখন, ফেনী নদীর পানির ছোট একটা অংশ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে দেয়ার চুক্তিটাও তখনই হয়েছে। দুইদিন আগে আবার কলকাতা গেলেন প্রধানমন্ত্রী, ইডেন গার্ডেনে ভারত-বাংলাদেশের ঐতিহাসিক টেস্ট ম্যাচের উদ্বোধন করতে। কিন্ত আক্ষেপের বিষয় হচ্ছে, দু'বারের কোনবারই তাকে পরিপূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিয়ে অভ্যর্থনা জানায়নি ভারত সরকার! 

অন্য দেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানানোর কিছু নিয়ম-কানুন আছে। বেশিরভাগ সময় স্বাগতিক রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীই বিমানবন্দরে হাজির হয়ে অতিথি রাষ্ট্রের প্রধানকে অভ্যর্থনা জানান। সেটা সম্ভব না হলে পূর্ণ মন্ত্রীর পদমর্যাদার কাউকে পাঠানো হয়। কিন্ত অক্টোবরে যখন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারত সফরে গিয়েছিলেন, দিল্লি বিমানবন্দরে তাকে রিসিভ করতে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় নারী ও শিশু কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী দেবশ্রী চৌধুরী, যিনি মাস তিনেক আগেই প্রথমবার সাংসদ হয়েছেন! 

দিল্লিতে তো তা-ও প্রতিমন্ত্রী মর্যাদার কেউ এসেছিলেন, দিন তিনেক আগে যখন সৌরভ গাঙ্গুলীর আমন্ত্রণে ইডেন টেস্ট দেখতে শেখ হাসিনা আবারও ভারতে গেলেন, তখন তাঁকে স্বাগত জানাতে কেন্দ্রীয় সরকারের পক্ষ থেকে কোনও মন্ত্রী, এমনকি শীর্ষ আমলাকেও পাঠানো হয়নি! নরেন্দ্র মোদির সরকার এমন একটা আচরণ করলো, যেন শেখ হাসিনা বলে কাউকে তারা চেনেই না! 

প্রতিবেশী রাষ্ট্র, এবং সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র, বিপদে আপদে দুই দেশ একে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছে, সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করেছে। অথচ ভারতের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার কিনা আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানানোর বেলায় কূটনৈতিক শিষ্টাচারের ধার ধারলেনই না! ন্যুন্যতম সম্মানটাও দিলেন না তথাকথিত 'মিত্র রাষ্ট্রের' রাষ্ট্রপ্রধানকে!

এই বিষয়টা নিয়ে কলকাতার দৈনিক আনন্দবাজার একটা প্রতিবেদন ছেপেছে আজ। সেখানে তারা লিখেছে- 'শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী নেতারা ঘরোয়া ভাবে জানিয়েছিলেন, এটা ‘যেচে অপমান নেওয়া’। প্রতিবেশী বলয়ে ভারতের ‘পরম মিত্র’ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানাতে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নিজে বা কোনও সিনিয়র ক্যাবিনেট মন্ত্রী উপস্থিত থাকবেন- এটাই ছিল প্রত্যাশা। প্রথম বার জিতে আসা কোনও প্রতিমন্ত্রী নন।' 

বাংলাদেশ প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদি নানা সময়েই বলেছেন, শেখ হাসিনার সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক একটা অন্যরকম উচ্চতায় গিয়ে পৌঁছেছে। তাহলে সেই উচ্চতর সম্পর্কের প্রতিদান কেম এভাবে দিলো মোদি সরকার? কাল যদি নরেন্দ্র মোদি বা অমিত শাহ বাংলাদেশ সফরে আসেন, আর তাদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্যে তিনশো সাংসদের মধ্যে থেকে যেকোন একজনকে দায়সারাভাবে এয়ারপোর্টে পাঠানো হয়, সেটা কি ভারত মেনে নিতে পারবে? 

বাংলাদেশ যদি ভারতের এত বিশাল মিত্রই হবে, সেই মিত্রতার খাতিরেও তো ন্যুন্যতম কূটনৈতিক সম্মানটুকু প্রদর্শন করতে পারতো কেন্দ্রীয় সরকার? আমেরিকা-চীন বা জাপান-রাশিয়ার কথা বাদই দিলাম, ইউক্রেন, চিলি বা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী যখন ভারতে আসেন, তাদেরকে রিসিভ করার জন্যেও নরেন্দ্র মোদিকে এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি আমরা, আমাদের দেশেও যখন ভূটানের প্রধানমন্ত্রী এসেছেন, তখন শেখ হাসিনা নিজে গিয়ে তাকে রিসিভ করেছেন। এটাই কূটনৈতিক শিষ্টাচার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কেন সেটা বলবৎ থাকবে না তাহলে? 

ত্রিপুরার সাব্রুম শহরের বাসিন্দারা পানীয় জলের অভাবে ভুগছেন, পানি নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অনেকগুলো ইস্যু থাকার পরেও শুধু মানবিক দিকটা বিবেচনা করে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ফেনী নদীর পানির একটা অংশ ভারতকে দিতে রাজী হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ থেকে ত্রিপুরা বা সেভেন সিস্টার্সের রাজ্যগুলোতে যোগাযোগটা দুরূহ হয়ে উঠেছিল ভারতের জন্যে, তাই আমরা আমাদের স্থলভাগ ব্যবহার করতে দিচ্ছি ভারতকে। ভারতের ভারী ট্রাকগুলো পণ্য নিয়ে আমাদের রাস্তা ব্যবহার করে ছুটে চলেছে ত্রিপুরা-আসামের দিকে। টনপ্রতি মালামালের চার্জ যেখানে আগে টনপ্রতি ১২০০ টাকার বেশি ছিল, সেটা কমিয়ে আনা হয়েছে দুইশো টাকায়। 

জঙ্গী দমনে দুর্দান্ত কাজ করেছে বাংলাদেশ, ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা আগে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলগুলোতে আশ্রয় নিতো, এখান থেকে ভারতে আক্রমণের পরিকল্পনা সাজাতো। সেই অবস্থা পুরোপুরি বদলে গেছে এখন। তার ওপরে কূটনৈতিক নানা ইস্যুতে বরাবরই ঢাকাকে পাশে পেয়েছে ভারত। অথচ রোহিঙ্গা ইস্যুতে তারা আমাদের পাশে দাঁড়ায়নি, উল্টো আসাম আর পশ্চিমবঙ্গ থেকে ত্রিশ-চল্লিশ লাখ মানুষকে 'অবৈধ বাঙালী' ট্যাগ দিয়ে আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিতে চাইছে! 

ভারত আমাদের তিস্তার পানি দিচ্ছে না, গরু দিচ্ছে না, পেঁয়াজ দিচ্ছে না, আর এখন তো আমাদের প্রধানমন্ত্রীকে ন্যুন্যতম সম্মানটাও দিচ্ছে না! তাহলে এই বন্ধুত্বের দরকার কি? বন্ধু রাষ্ট্রের প্রধানমন্ত্রীকে যারা প্রাপ্য সম্মানটা দেখাতে পারে না, তাদের সঙ্গে এই এক তরফা প্রেম দিয়ে আমাদের কি আদৌ কোন লাভ আছে?