সিনেমা হলের গলি

পল ওয়াকার: গতিই জীবন, গতিই মরণ!

সাইকেলটা তিনি সবার চেয়ে জোরে চালাতেন। স্কুলে তার সহপাঠীরা মনে করতে পারেন না, সাইকেল রেসে পলকে কখনও কেউ হারাতে পেরেছিল কিনা! কলেজে ওঠার পর হার্লে ডেভিডসনের বাইক নিয়ে মেতে উঠলেন, ড্রাইভিংটাও ততদিনে আয়ত্ব হয়ে গেছে। বন্ধুদের গাড়ি নিয়ে কারিকুরি দেখাতেন, সেখানেও একটা জিনিস কমন ছিল- গতি! দিন নেই রাত নেই, গাড়িতে পেট্রোল ভরে ছুট লাগাচ্ছেন যখন তখন। ইঞ্জিনের শব্দটা যেন ঝড় তুলতো তার মগজে, বাতাসের সাঁই সাঁই শব্দ অদ্ভুত এক শিহরণ জাগাতো তার মনে। কে জানতো, সেই গতিটাই পল ওয়াকারের জন্যে কাল হবে, কেড়ে নেবে তার জীবনপ্রদীপ! জানলে হয়তো উত্তাল গতির প্রেমে পড়ার দিনগুলোতে তাকে থামানোর চেষ্টা করতেন কাছের মানুষগুলো!

মা শেরিল ওয়াকার ছিলেন বিখ্যাত মডেল এবং অভিনেত্রী। জনপ্রিয়তার সঙ্গে পলের বসবাস একদম ছোট্ট বয়স থেকেই। সবার মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু হয়েই বেড়ে উঠেছেন তিনি, চাওয়ার আগেই পেয়ে গেছেন সবকিছু। তবে সেটা তাকে বেয়াড়া করে তুলতে পারেনি। ছোটবেলা থেকেই নম্র-ভদ্র হিসেবে সুনাম ছিল সবার কাছে, তার উন্মত্ত রূপটা দেখা যেতো শুধু ড্রাইভিং হুইলের সামনে বসলে, সেখানে তিনি সম্পূর্ণ আলাদা একজন মানুষ! 

মায়ের সৌজন্যে মিডিয়ার সঙ্গে সখ্যতাটাও ছোটবেলা থেকেই, মাত্র দুই বছর বয়সেই অংশ হয়েছিলেন একটা বিজ্ঞাপনচিত্রের। সত্তরের দশকের মাঝামাঝিতে নির্মিত একটা প্যাম্পার্সের বিজ্ঞাপনে দেখা গিয়েছিল তাকে। মাত্র তেরো বছর বয়সেই নাম লিখিয়েছিলেন সিনেমায়, সিনেমার নাম ‘মনস্টার ইন ইউর ক্লোজেট’- তিনি তখন হাইস্কুলে পা রেখেছেন সবে। রাতারাতি বন্ধুদের কাছে সেলিব্রেটিতে পরিণত হলেন কিশোর পল ওয়াকার। 

দেখতে দারুণ সুদর্শন ছিলেন ছোটবেলা থেকেই, তাই প্রথম সিনেমার পরে অভিনয়ের বেশ কয়েকটা প্রস্তাব চলে এলো তার কাছে। মা শেরিল ওয়াকার বাধ সাধলেন, বললেন, পড়ালেখাটা শেষ করতে। পড়ার কোন ক্ষতি হবে না, এমন আশ্বাস দিয়ে বেশ কয়েকটা টিভি সিরিজে অভিনয় করে ফেললেন পল ওয়াকার। বাড়লো জনপ্রিয়তা। কলেজে উঠে পড়ালেখা শুরু করলেন মেরিন বায়োলজির ওপরে। 

তারকাখ্যাতিটা পলের নামের সঙ্গে যুক্ত হলো ১৯৯৯ সালে। সেবছর মুক্তি পেলো পলের অভিনীত ‘ভার্সিটি ব্লু’ এবং ‘শি ইজ অল দ্যাট’ সিনেমা দুটি। দর্শকের নজরে সেবারই ভালোভাবে ধরা পড়লেন সুদর্শন এই তরুণ। আর তারপর তো জীবনকে।বদলে দেয়া 'ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস' সিরিজটাই হাজির হলো তার সামনে! গতিকে যিনি এতটা ভালোবাসেন, তিনিই কিনা অভিনয় করবেন কার রেসিং, রবারি, আর স্পাইং নিয়ে নির্মিত সিনেমায়! এ তো সোনায় সোহাগা! 

২০০১ সাল, ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াসের প্রথম কিস্তিতে ব্রায়ান ও' কনর চরিত্রে পলকে লুফে নিলো দর্শক। এমন জনপ্রিয়তা দেখে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রটিকে পরের সিনেমায় নায়ক বানিয়ে দিলেন পরিচালক! সেই সিনেমাটাও সুপারহিট! সিরিজের পরের কিস্তিতে বাদ পড়লেন, কিন্ত ভুল বুঝতে পেরে তাকে এবং ভিন ডিজেলকে ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াসের চতুর্থ সিনেমায় আবার ফিরিয়ে আনল কর্তৃপক্ষ- কারণ দুজনের জুটিটাই যেই এই সিরিজের প্রাণ! 

ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াসের ছয়টা সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন পল ওয়াকার। এর বাইরেও 'জো রাইড', 'ইনটু দি ব্লু' এবং 'টাইম লাইন' নামের বেশকিছু সিনেমায় কেন্দ্রীয় চরিত্রে দেখা গেছে তাকে। য়বে ক্লিন্ট ইস্টউডের ‘ফ্ল্যাগস অব আওয়ার ফাদার’ সিনেমাটাই এদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত- এই সিনেমায় পলের অভিনয় দারুণ প্রশংসিত হয়েছিল। 

আরও অনেক গল্পের জন্ম দেয়ার কথা ছিল, কিন্ত আচমকাই একটা ব্রেকিং নিউজ এলো। ৩০শে নভেম্বর ২০১৩, হলিউড স্তম্ভিত হয়ে গেল সংবাদটা শুনে। সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন পল ওয়াকার! দাবানলেএ মতো খবরটা ছড়িয়ে পড়লো ইউরোপ থেকে এশিয়ায়, আমেরিকা থেকে অস্ট্রেলিয়ায়। কেউ বিশ্বাসই করতে পারছিলো না সেটা! যে মানুষটা সিনেমায় গাড়ি নিয়ে এত কারিকুরি দেখাতে পারেন, তিনি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যাবেন! এটা হতেই পারে না। 

একটা চ্যারিটি শো শেষে বাড়ির পথে ফিরছিলেন পল, সঙ্গে ছিলেন বন্ধু রজার।গাড়িটা চালাচ্ছিলেন রজার, পল ছিলেন প্যাসেঞ্জার্স সিটে। সড়কের সর্বোচ্চ গতিবেগ ৭০ কিলোমিটার থাকলেও, তাদের পোরশে গাড়িটি চলছিল প্রায় দেড়শো কিলো গতিতে! নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটা গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায় তাদের গাড়ি, সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে যায় সেখানে। গাড়ি থেকে বেরুতে পারেননি কেউই, জীবন্ত ভস্মে পরিণত হন দুজনে। পুলিশ এসে লাশদুটো চিনতে পারছিলো না, এমনই বীভৎস অবস্থা হয়েছিল মৃতদেহের। পরে ফরেনসিক রিপোর্টের মাধ্যমে সনাক্ত করা হয় পল ওয়াকারের দেহ।

ছয় বছর হয়ে গেছে পল ওয়াকার নেই। তাকে ছাড়াই ফাস্ট এন্ড ফিউরিয়াস সিরিজটা এগিয়ে যাচ্ছে, সিনেমার টিম তাকে সুন্দর একটা বিদায় দেয়ার ব্যবস্থাও করেছে সিনেমাতে, সেখানে পলের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন তার ছোট ভাই। আজও ভক্ত-দর্শক নির্বিশেষে মানুষ মিস করে সেই সোনালীচুলো তরুণকে, ওয়াকারের স্মৃতি বিজড়িত 'সি ইউ এগেইন' গানটা এখনও আবেগতাড়িত করে সবাইকে। বন্ধুর স্মৃতিকে বাঁচিয়ে রাখতে ভিন ডিজেল নিজের মেয়ের নাম রেখেছেন পলিন, যাতে মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই বন্ধুকে মনে পড়ে তার। পল নেই সশরীরে, কিন্ত স্মৃতিতে আজও অম্লান তিনি...