তারুণ্য

মুরাদ টাকলা ও ভাষা বিকৃতির বিরুদ্ধে ৭ বছরের যুদ্ধ!

এই নভেম্বরেই ৭ বছর পেরিয়ে ৮ম বছরে পা রাখলো 'মুরাদ টাকলা'। বাংলা ভাষার বিকৃতির বিরুদ্ধে অনলাইনে সবচেয়ে সক্রিয় এক উদ্যোগের নাম মুরাদ টাকলা।

ফেসবুকে যারা নিয়মিত, তারা মুরাদ টাকলাকে চেনেন ভালোভাবেই। মুরাদ টাকলা অনলাইনে বাংলা ভাষার ব্যবহারে রীতিমতো এক বিপ্লব ঘটিয়েছে অদ্ভুত উপায়ে। আজকের দিনে অনলাইনে বাংলায় মানুষ যেভাবে লিখছে, এক সময় এতোটা রমরমা ছিল না এই পরিস্থিতি। মানুষ ইংলিশ-বিংলিশ গুলিয়ে অদ্ভুত এক ভাষায় লিখত।

যারা একটু বোধবুদ্ধিসম্পন্ন তারা ইংরেজি অক্ষরে বাংলা লিখলেও কথাগুলো অন্তত বোঝা যেত। তবে, একটা বড় অংশই ইংরেজি অক্ষর ব্যবহার করে বাংলা লিখতে গিয়ে অদ্ভুত ভাষার জন্ম দিত। যে ভাষাটা বোঝার জন্যে মাথা ঘামিয়েও কূলকিনারা মিলতো না, ওটা এমনই অদ্ভুত ভাষা যে বুঝতে গেলে মাথার ছাদ ফাঁকা হয়ে 'টাকলা' হওয়ার অবস্থা তৈরি হতো।

এই জগাখিচুড়ি মার্কা অদ্ভুত ভাষাটাই 'মুরাদ টাকলা' ভাষা হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেল। কারণ, যেখানেই যে ওইরকম অদ্ভুত ভাষায় লিখে যেমন জীবনকে ইংরেজিতে লিখে 'gebon', পাশে শব্দটাকে ইংরেজিতে লিখে 'pasa', ফাঁসিকে লিখে 'pussy' ইত্যাদি এই ভাষাকে ব্যঙ্গ করা হয় মুরাদ টাকলা পেজে। এই পেজ নিয়মিতই অদ্ভুতভাবে ভাষা বিকৃতির বিরুদ্ধে হাস্যরস, ব্যাঙ্গাত্মক অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছে। সমালোচনা করে গেছে ভাষাবিকৃতির বিরুদ্ধে।


এই কাজে এই পেজটা এতোটাই সফল যে, আজকাল কেউ যদি ওই অদ্ভুত ভাষায় বাংলা লিখে লোকে সাথে সাথে বলে, তুই / তুমি / আপনি তো একটা মুরাদ টাকলা। যারা সত্যি সচেতন মননের অধিকারী, তারা সাথে সাথে এই ভুল শুধরে ঠিক করে নেয় ভাষাটা, শুদ্ধ বাংলাটা শিখে সেটার চর্চায় নামে। আর যারা একটু 'ইয়ে' রকমের তারা গোঁয়ারের মতো মুরাদ টাকলা হয়ে বাংলার 'ইয়ে' করতেই থাকে।

'মুরাদ টাকলা' পেজে ভাষার এসব ভুল প্রয়োগ নিয়ে পোস্ট যায়, লেখা যায়, মিম যায়, ছবি যায়। মানুষ ভুল প্রয়োগ দেখে হাসে তবে তার চেয়েও জরুরি হাসতে হাসতেই তারা জেনে নেয়, উপলব্ধি করে এই ভুল ব্যবহার করা যাবে না, করলেই অন্যরাও হাসবে একইভাবে।


কিভাবে জন্ম নিয়েছে এই মুরাদ টাকলা পেজটি? যদি এরকম কৌতুহল থাকে কারো তাহলে তার জন্যে ৭ বছর আগের একটা ইতিহাস বলি। জনৈক 'জয়ন্ত কুমের' নামক এক ভদ্রলোক (!) ফেসবুকে এক যুগান্তকারী কমেন্ট করেছিলেন। যে কমেন্টের সারমর্ম উদ্ধার করতে গিয়েই জন্ম হয়েছিল 'মুরাদ টাকলা' নামক যুগান্তকারী এক উদ্যোগের।

জয়ন্ত কুমের কিংবা কুমারের মন্তব্য ছিল এরকম,
"murad takla jukti dia bal, falti pic dicos kan! lakapara koira kata bal"



এই মন্তব্য পড়ে আপনি সাধারণভাবে এক নিমিষেই কি বুঝতে পারবেন, কুমের বা কুমার নামক এই লোকটি কি লিখতে চেয়েছেন? বাংলা ভাষার শ্রাদ্ধ করে তিনি যা লিখেছেন তার জন্যে সাবটাইটেল লাগানো ছাড়া উপায় নেই।

এই কমেন্টের কারণেই জন্ম নেয় 'মুরাদ টাকলা'। যারা ভাষার এমন বিকৃতি করে, তাদের মতো মুরাদ টাকলাদের সহি পথে ফিরিয়ে আনবার জন্যেই 'মুরাদ টাকলা'র প্রয়াস।

এই নভেম্বরে টিএসসিতে কেক কেটে 'মুরাদ টাকলা' ৮ম বছরে পদার্পণ করলো। এই পেজটি দিনে দিনে দারুণ জনপ্রিয় হয়েছে। লোকে শুধু এই পেজ থেকে বিনোদনই পায় নি, বাংলা সম্পর্কে সচেতনও হয়েছে চেতনে অবচেতনে। শুধু ভাষা নয়, দেশ নিয়েও একাট্টা, এক মতবাদে বিশ্বাসী এই 'মুরাদ টাকলা' পেজের কর্তৃপক্ষ।


তারা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সচেতনতা নিয়ে কাজ করে৷ তারা দেশবিরোধী, বাংলাদেশের জন্মে যাদের ফোঁড়া টনটন করে সেই রাজাকার সমর্থকদেরও তীব্র ব্যাঙ্গাত্মক আঘাতে জর্জরিত করে। ভাষা, দেশ, যুদ্ধ, লড়াই - সব মিলিয়ে 'মুরাদ টাকলা' আমাদের অনলাইনের স্রোতধারার বিপরীতে এক টুকরো বিপ্লব। এই বিপ্লব চলুক, এই বিপ্লবে কতল হতে থাকুক, ভাষাবিকৃতিকারীরা, দেশবিরোধীরা....