ইনসাইড বাংলাদেশ

জনতার গণপিটুনি, মৃত্যুদণ্ড, অতঃপর ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বানর হত্যা!

বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন ২০১২ অনুসারে কোনো প্রাণীকে হত্যা করা দণ্ডনীয় অপরাধ। অথচ, এক্ষেত্রে খোদ বনবিভাগের কর্মকর্তার নির্দেশেই নাকি বানরটাকে হত্যা করা হয়েছে। ঘটনাটি মৌলভীবাজারের বড়লেখায় ঘটেছে। পাহাড় থেকে দলছুট হয়ে লোকালয়ে চলে আসা একটি বানরকে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে মৌলভীবাজারে হত্যা করা হয়। যেন তেন উপায়ে হত্যা না, একেবারে আয়োজন করে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে হত্যা কার্যকর করে জনতা।

নভেম্বরে শুরুর দিকে একটি বণ্য বানর বড়লেখা উপজেলার কাঁঠালতলী লোকালয়ে চলে আসে দলছুট হয়ে। পাথারিয়া পাহাড়ের বানরটি এলাকায় বেশ আতঙ্ক ছড়াতে সক্ষম হয়। বানরটির বিরুদ্ধে স্থানীয়দের অভিযোগ আছে, বানরটি দ্বারা নাকি শিশুদের উপর হামলা হয়েছে। এছাড়া বানরটি অত্র অঞ্চলে নাকি তান্ডব চালিয়েছে...

বলা হচ্ছে, বানরের হামলায় বড়খলা গ্রামে এক শিশুকন্যা নিহত হন এবং একই সাথে বেশ কিছু মানুষ আহত হন। তারা স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানের কাছে অভিযোগ করলে ইউপি চেয়ারম্যান বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা এনামুল হককে খবর দেন।

এধরণের ক্ষেত্রে বনবিভাগের কর্মকর্তাদের উপর কি নির্দেশনা থাকে তা তারাই ভাল জানেন। তবে যেহেতু কোনো বন্যপ্রাণী হত্যার নিয়ম নেই, তাই তারা বন্যপ্রাণীদের বনে ফিরিয়ে নেবার পক্ষেই তৎপরতা দেখাবেন এরকমটাই হয়ত হওয়া উচিত৷ কিন্তু, আশ্চর্যজনকভাবে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ বিভাগের কর্মকর্তা এলাকা পরিদর্শন করে বানরকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে যান, তিনি বানরটিকে বনে ফেরানোর ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেন নি।

দুই সপ্তাহ আগে যখন বন কর্মকর্তা এমন লাইসেন্স দিয়ে যান যে বানরটিকে হত্যা করা যাবে, তখন থেকেই মানু্ষ হন্যি হয়ে বানরটির পেছনে লাগে। একটা বানর নাকি গোটা অঞ্চলে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে আর সেই একটা বানরকে ধরতে ৬/৭ গ্রামের মানুষ একসাথে উঠে পড়ে লেগেছে এ যেন মানুষের বানররুপী আচরণের বহিঃপ্রকাশ।

যাই হোক, মানুষ যখন সংঘবদ্ধ হয় কোনো দুর্ধর্ষ হিংস্র কাজে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা সেই কাজে সফল হয়। বানরটিকে তারা ধরার বিভিন্ন চেষ্টা চালান। বানরকে বাগে আনতে ভাতের সঙ্গে নাকি অতিমাত্রায় ঘুমের ঔষধও খাওয়ান। তারপর বানরকে ধাওয়া করতে করতে গত ২০ নভেম্বর দুপুরে শেষমেষ এক ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকা বানরটাকে মানুষ আটক করেন তারা।

ধাওয়া করার সময় মানুষের হাতে ছিল দা বটি, লাঠি, সড়কি। তারা বানরটাকে আটক করার সময় তুমুলভাবে পিটান। পিটিয়ে শেষ পর্যন্ত সায়েব আলি মোকাম এলাকায় রশি দিয়ে ফাঁসি দেয়ার মতো করে ঝুলিয়ে রাখেন। শত শত মানুষের 'আদালত' বানরের ফাঁসির পক্ষে একতাবদ্ধ ও সমর্থন দেয়। বানরের ফাঁসি কার্যক্রমকে তারা উপভোগ করে।


স্থানীয়দের বক্তব্য অনেকটা এরকম, "বুধবার সকাল ১১টা থেকে বিক্ষুব্ধ কয়েকশ’ লোক বানরটিকে ধরতে লাঠি, দা, সড়কি নিয়ে ধাওয়া করে। দিনভর বানরটি ধরতে ধাওয়া করে লোকজন। অনেক উৎসাহী লোকজনও জড়ো হন এতে। একপর্যায়ে বানরটি প্রাণ বাঁচাতে আশ্রয় নেয় একটি ধানক্ষেতে। সেখানে বিকেল আনুমানিক চারটার দিকে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়। পরে স্থানীয় সায়েব আলীর মোকাম এলাকায় রশি দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা হয়। বেশ কিছু সময় বানরটি ঝোলানো অবস্থায় ছিল। পরে একটি টিলায় বানরটিকে মাটিচাপা দেওয়া হয়।"

এই হলো, সৃষ্টির সেরা জীব মানুষের বিবেক। একটা প্রাণীকে ধরতে যারা প্রাণীটির চেয়েও বেশি বন্য হয়ে যায়। মানুষ নিজেই এতোটা বুনো হয়ে কিভাবে ভয় পায় বন্যপ্রাণীকে কে জানে! মানুষের সবচেয়ে বেশি ভয় পাওয়া উচিত বরং মানুষকেই....