ইনসাইড বাংলাদেশ

"কুত্তার বাচ্চা, গাড়ি নিয়া বের হইসোস ক্যান?"

সন্ধ্যার পর অফিস থেকে বেরিয়ে আশ্চর্য হয়ে গেলাম। আমাদের রুটে রাইদা, তুরাগ, নূরে মক্কা বাসগুলো চলে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম, একটা বাসও নেই। অন্যদিন মিনিটে অন্তত একটা করে বাসের দেখা পাই। আজকে পেলাম না। বহুতক্ষণ অপেক্ষার পর নূরে মক্কা বাস আসলো কিন্তু বাসের ভেতর এতো ভীড় যে তুরাগও ফেইল। হয়ত এই ভীড়েও অপেক্ষমাণ জনতা উঠে পড়তো বাসে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কিন্তু বাসের হেল্পার উঠতে দিলেন না। কারণ তিনি নিজেই দাঁড়াতে পারছেন না ঠিকমতো।

এইদিকে উবারে কল দিয়ে যাচ্ছি সমানে। গুণে গুণে দশজন আমাকে রিজেক্ট করলেন, আমি যেদিকে যাব ওইদিকে যাবেন না কেউ। এরকম অন্যদিন হয় না। উবারে আজ রাইডারও কম মনে হলো।

সড়ক পরিবহন আইন কার্যকর শুরু হবার মুহুর্তে আবারো সড়কে পরিবহন সংকট, আইনবিরোধী সিন্ডিকেটের সেই পুরানো চাল। তারা আইন পছন্দ করেন নি, তাই সড়কে গাড়ি না নামিয়ে, কোথাও ধর্মঘট করে তারা প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। এই আইন তারা মানবেন না, আইন সংস্কার করতে হবে এটা তাদের দাবি৷ কিংবা কেউ হয়ত আইনে বাঁধা পড়ার ভয়েও সড়কে গাড়ি নামান নি।

রাজধানীতে যেসব লক্কর ঝক্কর বাসে আমরা চড়ি, ঠিকভাবে আইনের প্রয়োগ শুরু হলে হয়ত এরা সবাই আটকা পড়বে। তার উপর অনেকের কাগজপত্র নেই হালনাগাদ করা, কারো নেই ড্রাইভিং লাইসেন্স। তাই, এভাবে সড়কে সংকট তৈরি করে পরিবহনের মাফিয়ারা বুঝিয়ে দিচ্ছেন, তারা যেভাবে চান সব সেভাবেই চলতে হবে। নাহলে তারা চাইলে কেমন ভোগান্তি তৈরি করতে পারেন, কিভাবে অচল করে দিতে পারেন শহর তার ডেমোন্সট্রেশন আরো একবার দেখিয়ে দিলেন তারা। জনগণ তাদের কাছে জিম্মি হলো আরো একবার।

বার বার জনগণকে জিম্মি হতে হয়। শাহাজাহান খানরা দাঁত কেলায়, ওবায়দুল কাদেররা টেনে টেনে বিবৃতি দিয়ে যায়। ইলিয়াস কাঞ্চনের ছবিতে উঠে জুতার মালা, পোড়া মবিলে মুখে কালি পড়ে। এভাবেই চলবে?

জনগণের কষ্ট কেমন, কতটা তীব্র এটা নিজেই আমি টের পেয়েছি আজকের সন্ধ্যায়। সাধারণ অবস্থাতেই এই শহরে চলাচল করা কি কষ্টসাধ্য আমি জানি। লোকাল বাসে ঝুলে ঝুলে প্রতিদিন আসা যাওয়া করি। রাস্তায় জ্যামে আটকে থাকতে থাকতে পা ব্যথা হয়ে যায়। এসব সমস্যা নিত্যদিনের। আর যখন পরিবহন শ্রমিকরা বলা নেই কওয়া নেই হুট করে এরকম ধর্মঘট দিয়ে ফেলে, জনগণকে জিম্মি করে, সড়কে মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলে তাদের ক্ষমতার প্রদর্শনী করে তখন এই মানুষরা কি করবে বলতে পারেন?


মন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতিরা তো ভিআইপি প্রটোকলে ঠিকই চলাফেরা করবেন, আর মিডিয়া ডেকে বিবৃতি দিবেন, এরকম দিনে জনগণের ভোগান্তি কতটা বাজে পর্যায়ে যায় তার মর্ম তারা কি বুঝতে পারবেন আদৌ?

সরকার এতো কিছুতে জিরো টলারেন্স নেয়া শুরু করেছে, দূর্ণীতিবাজ, ক্যাসিনো মাফিয়াদের ধরতে পেরেছে পরিবহন সেক্টরের মাফিয়াদের ব্যাপারে হার্ড লাইনে কেন যাচ্ছে না?

বাংলাদেশে কি কেউ নাই আইন মেনে সড়কে পরিবহন নামাতে রাজি? কোনো ব্যবসায়ী নাই কোনো কোম্পানি নাই যারা আইন ও জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে সড়কে বাস নামাতে রাজি? যদি আইন মেনে পরিবহন চালানোর মতো কোম্পানি থাকে বা আসতে চায় তাদেরকেই সড়কে চলাচলের অনুমতি দেয়া হোক। আর যেসব মাফিয়া আইনের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে বেআইনিভাবে এভাবে জনগণকে ভোগান্তিতে ফেলে, একবার না বারবার, বিনা নোটিশে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক। নাকি ইচ্ছে করেই এই মাফিয়াদের পোষা হচ্ছে? জানতে ইচ্ছে করে।

জানতে ইচ্ছে করে এদের কেন এতো সাহস, ট্যাক্স দিয়ে কেনা প্রাইভেট গাড়ি রাস্তায় নামার কারণে তারা পোড়া মবিল মেখে দেয়? কোন মাফিয়া, পরিবহন গডফাদার এদের পেছনে যে এদের এতো কইলজা? পুলিশ ছাত্রদের মারতে পারে, হেলমেট বাহিনী নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে আক্রমণ করতে পারে কই এখন এদের থামাতে তো কেউ আসে না। পোড়া মবিল দিয়ে যারা মুখে কালি মাখায় এদের কজনকে এখন পর্যন্ত ধরা হয়েছে? ও! এদের ধরলে তো এরা জিম্মি করবে, এদের ইন্ধনদাতা দাদারা নাখোশ হবে তাই না?


আজকে সকালে আকিব দীপ্ত নামে এক ভদ্রলোকের প্রাইভেট গাড়ির চালককে তথাকথিত পরিবহন শ্রমিক ওরফে রাজপথের মাস্তানরা এসে হুমকি দেয়। বলে, "কুত্তার বাচ্চা অবরোধ দিসি, গাড়ি নিয়া বের হইসোস ক্যান?" বলেই মুখে পোড়া মবিলের কালি মেখে দেয়।

আরিফ হোসেন বাণী নামে এক ভদ্রলোকের গাড়ির ড্রাইভারকে পুলিশের সামনেই এসে পোড়া মবিল মাখিয়ে যায় ইতরের দল। কুমিল্লায় এই ইতররা ছাড়ে নি এম্বুল্যান্সকেও। এম্বুলেন্সের ড্রাইভার কেন গাড়ি বের করেছে, এই অপরাধে মুখে পোড়া মবিল মাখিয়ে দেয় তারা।

এই হলো এসব মাফিয়াদের ক্ষমতা, যাদের ইন্ধনে একদিনে গোটা শহরকে পোড়া মবিলে কালো করে দিতে পারে ওরা। একদিনে দেশটা অচল করে দিতে পারে। ক্ষমতার রাজনীতিতে হয়ত এদের অনেক বেশি প্রয়োজন তাই এদের সাথে বার বার আপোষ হয়, জিম্মি হয়, বলি হয় জনগণ। এরা বার বার ছাড় পায়, সড়কে মৃত্যুতে এরা হাসে, ভেটকায়, তাও এদের পদত্যাগ যেন না করতে হয় তার পক্ষে সাফাই গায় মাফিয়াদের পৃষ্ঠপোষকরা।

উন্নয়ন, উন্নয়ন, উন্নয়ন - কেবল এই স্লোগান শুনি সারাদিন টিভিতে। উন্নয়ন করবেন পথে ঘাটে, আর সেই পথে ঘাটের রাজা হবে পরিবহন মাফিয়ারা, আর তাদের হাতেই জিম্মি থাকতে হবে আমাদের? কতকাল???