সিনেমা হলের গলি

লতা মঙ্গেশকর: পৃথিবীর বুকে এক টুকরো কোহিনূর!

দেবব্রত মূখার্জী: অমিতাভ বচ্চন বিমানে চড়ে দেশে ফিরছিলেন। তার পাশেই বসেছিলেন এক পাকিস্তানী ভদ্রলোক। অমিতাভকে পেয়ে নানারকম গল্প করছিলেন। হঠাৎ বললেন, ‘দেখুন, ভারতের চেয়ে আজকের দিনে পাকিস্তান কোনো অংশেই আর পিছিয়ে নেই। শুধু দুটো জিনিসের অভাব আমাদের।’

অমিতাভ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী, কী?’ 
‘প্রথমত আমাদের দেশে তাজমহল নেই।’
‘আচ্ছা। আর কীসের অভাব?’
‘আমাদের কাছে কোনো লতাজি নেই।’

অমিতাভ গল্পটা বলতে বলতে এক গাল হেসে দর্শকের দিকে চেয়ে বললেন, ‘এই জায়গাটায় অন্তত ভারত বিশ্বসেরা। আমাদের কাছেই আছেন কেবল লতাজি; লতা মঙ্গেশকার।’

তবে আমি অমিতাভের সাথে দ্বিমত পোষন করি। আমি বলি, লতা মঙ্গেশকর কেবল ভারতের নন; তিনি সারা পৃথিবীর সম্পদ। পৃথিবীতে এমন সম্পদ একটার বেশী থাকতে নেই। পৃথিবীর আকাশে একটা চাঁদ, পৃথিবীর বুকে একটাই কোহিনুর; তাই এই পৃথিবীতে একজনই আছেন লতা মঙ্গেশকর; লতাজি। সম্ভবত দেশ-কাল-ধর্ম-বর্ণ-রাজনীতি নির্বিশেষে সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশী ভালোবাসা পাওয়া গায়কের নাম এই লতা মঙ্গেশকর।
 
এমন একটা পরিবারে জন্মেছেন যে, সুরের পাখি হওয়া ছাড়া যেনো আর কোনো নিয়তি ছিলো না তার। লতাজির বাবা পন্ডিত দীননাথ মুঙ্গেশকার। একাধারে প্রখ্যাত নাট্যকার, থিয়েটার অভিনেতা, মিউজিশিয়ান এবং কণ্ঠশিল্পী। বাবার কাছেই হাতেখড়ি হয়েছিলো গানের। তবে গানের জগতে আসার আগে, মাত্র পাঁচ বছর বয়সে অভিনয় করেছিলেন বাবার নির্দেশিত একটি নাটকে। 

লতাজিদের খুব ছোট রেখে মারা যান পন্ডিত দীননাথ; লতার বয়স তখন ১৩। এরপর অনেক লড়াই করতে হয়েছে এই পরিবারটিকে। লতাজি নিজে আস্তে আস্তে ভয়েস অব ইন্ডিয়া হয়ে উঠেছেন এবং নিজের এক ঝাক ভাই বোনকে করে তুলেছেন সুরের জগতের সঙ্গী। বোন মীনা খাদিকার, আশা ভোঁসলে, উশা মঙ্গেশকর গানের জগতে যথেষ্ঠ নাম করেছেন। একমাত্র ভাই হৃদয়নাথ মঙ্গেশকার নামকরা শাস্ত্রীয় সঙ্গীতজ্ঞ। 

লতা মঙ্গেশকরের কীর্তি বলে শেষ করা যাবে না। সে জন্য একটু ইন্টারনেট ঘেটে নিতে পারেন। চির কিশোরী কণ্ঠের এই অধিকারীনি কী কী অর্জন করেছেন, কী কী রেকর্ড করেছেন; সে এক বিশাল আলাপের ব্যাপার। ছোট্ট একটা তথ্য দেওয়া যেতে পারে-তিনি মাত্র দ্বিতীয় কণ্ঠশিল্পী হিসেবে ‘ভারতরত্ন’ সম্মাননা পেয়েছেন। এ ছাড়া পদ্মভূষন, দাদাসাহেব ফালকে, লিজিয়ন অব অনার (ফ্রান্সের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব), অনেকবারের ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরষ্কার তার হাতে উঠেই সম্মানিত হয়েছে। তার নামেও চালু হয়েছে পুরষ্কার। 

মোহাম্মদ রফি সাহাব ছিলেন গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ড অনুযায়ী সর্বোচ্চ গান রেকর্ড করার রেকর্ডের অধিকারী। সে সময় কে বেশী গান করেছেন, এ নিয়ে বিতর্ক ছিলো। রফি সাহাব মারা যাওয়ার পর লতাজি অনায়াসে এই রেকর্ড একার করে নিয়েছেন। 

একটার পরে একটা রেকর্ড হয়েছে, দুনিয়ায় লাখের পর লাখ মানুষ তার কণ্ঠে মুগ্ধ হয়েছেন। কয়েক দশক ধরে রাজত্ব করে গেছেন তিনি সুরের দুনিয়ায়। 

গত কয়েকটা দিন ধরে লতাজি অসুস্থ। বারবার গুজব ছড়াচ্ছে। বয়স হয়েছে; এই বয়সে গুজব পালে হাওয়া পাবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা প্রার্থনা করি, লতাজি দ্রুত সুস্থ হয়ে ফিরুন। শতায়ু হোন তিনি। আরও আরও কিছুকাল মুগ্ধ হয়ে এই সুরের পাখির কলতান শুনি। 

তারপরও একদিন লতাজি চলে যাবেন। এই জাগতিক কণ্ঠ হয়তো থেমে যাবে। কিন্তু মহাকাল জয় করে তারপরও আমাদের কানে বেজে উঠবে কিন্নরীর সেই সুর- 'পেয়ার কিয়া তো ডরনা কেয়া।' লতাজির প্রেমে পড়ার পর আর ভয় কীসের! পেয়ার কিয়া লতাজি!