ইনসাইড বাংলাদেশ

যে কারণে কসবায় ঘটল এমন ভয়ংকর ট্রেন দূর্ঘটনা...

দিবাগত মধ্যরাত। রাত ৩টার দিকে বাংলাদেশ যখন ঘুমিয়ে, কেবল রাতের যাত্রীরা স্থান বদল করছেন যানবাহনে, ঠিক তখন ঘটে গেল ভয়ংকর এক ছন্দপতন। ঝিকঝিক করে ছুটে চলা দুটি ট্রেন ধাক্কা খেল পরস্পরের সাথে। মধ্যরাতের এক ধাক্কা কেড়ে নিলো ১৫টি তরতাজা প্রাণ। যারা ঘুনাক্ষরেও হয়ত ভাবেনি এমন এক রাত আসবে তাদের জীবনে। আগের স্টেশনেই হয়ত কেউ কেউ চা খেয়েছে, স্টেশনে নেমে হেঁটেছে, দেখেছে মানুষের মেলা। এরকম আর কোনো কোলাহলে থাকবে না এই ১৫ জন, মৃত্যু এতো বিস্ময়কর ও নির্দয়...

গত রাতে ঢাকা চট্টগ্রাম রেলপথে এই ঘটনাটি ঘটে তা সকালের ঘুম ভেঙ্গে প্রায় সকলেই জেনে গেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার মন্দভাগ রেলস্টেশন জায়গাটাই কাল নামের স্বার্থকতা প্রমাণ করে মন্দভাগ্য টেনে আনলো। এখানেই ভয়াবহ এই ট্রেন দূর্ঘটনা ঘটে। সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেন দূর্ঘটনার হার যেন কিছুটা বেড়েছে, লাইনচ্যুতি হওয়া, ট্রেনে কাটা পড়া ইত্যাদি দূর্ঘটনা ঘটলেও গতরাতের দূর্ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হয়ে দেখা দিলো যেন।

প্রশাসনিক হিসাব বলছে, মৃত্যু হয়েছে ১৫ জন যাত্রীর, আহত শতাশিক। আহতদের মধ্যে এক শিশুর ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে গেছে। শিশুটি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, তার পিতামাতার কোনো সন্ধ্যান নেই। সে উদয়ন এক্সপ্রেসের যাত্রী ছিল। এই শিশুটির মতো অসহায়ত্ব নেমে এসেছে অনেকের জীবনে। হাসপাতালে প্রাণের স্পন্দন খুঁজে ফেরার লড়াই। আহতদের বেঁচে থাকার সংগ্রাম।

আহত কিংবা নিহত হবার সংখ্যাগুলো বাড়ার আশঙ্কা আছে, তবে প্রাণপণ প্রার্থনা সংখ্যাগুলো আর না বাড়ুক। একই সাথে মধ্যরাতের নিরবতা ভাংগা এমন দূর্ঘটনা কেন ঘটলো, সেটি নিয়েও কথা বলা প্রয়োজন। ট্রেন ভ্রমণ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার জায়গাটিতে আস্থা অর্জন করেছে। আরামদায়ক ভ্রমণ, মোটামুটি সাশ্রয়ী টিকেট - সব মিলিয়ে ট্রেনের প্রতি মানুষের ভালবাসা সবসময়ই বিদ্যমান। কিন্তু, এখন ট্রেন দূর্ঘটনা নিয়ে যেসব খবর আসছে তাও এতো ফ্রিকুয়েন্টলি, তাতে করে ট্রেন যাত্রা ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়ে যায় কি না কে জানে...

গতরাতে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী আন্তনগর ট্রেন তূর্ণা নিশীথা এবং সিলেট থেকে ছেড়ে আসা চট্টগ্রামগামী আন্তনগর উদয়ন এক্সপ্রেসের মধ্যে সংঘর্ষে দুর্ঘটনাটি ঘটে। দূর্ঘটনাটি কতটা আতংকের ও ভয়ের ছিল তা বোঝা যায়, আহত একজনের ভাষায়। কাউসার নামের উদয়ন এক্সপ্রেসের যাত্রী প্রথমআলোকে বর্ণনা দেন এভাবে, "ট্রেন এত জোরে ধাক্কা খায় যে, মনে হয়েছিল ট্রেন ১০ হাত ওপরে উঠে গেছে। আমার শরীর এক ধাক্কায় ওপরে উঠে নিচে আসনের ওপর আছড়ে পড়ে। ভেবেছিলাম কেউ বোমা মেরেছে।"

এরকম দুটি আন্তঃনগর ট্রেন কিভাবে এতোবড় সংঘর্ষে জড়ালো, কেন এড়ানো গেল না এই ধাক্কা তা বেশ বিষ্ময়কর ঠেকছে। মন্দভাগের স্টেশনমাস্টার যা বলছেন এই দূর্ঘটনা নিয়ে তাতে চোখ আরো কপালে উঠে যাওয়ার জোগাড়। তিনি সংবাদমাধ্যমের কাছে বলেন,

"তূর্ণা নিশীথা ট্রেনটিকে আউটারে মেইন লাইনে থামার জন্য সিগন্যাল দেওয়া হয়। উদয়ন ট্রেনটিকে মেইন লাইন থেকে ১ নম্বর লাইনে আসার সিগন্যাল দেওয়া হয়েছিল। সেই হিসেবে উদয়ন ট্রেন ১ নম্বর লাইনে প্রবেশ করে। এ সময় নিশীথা ট্রেনের চালক সংকেত অমান্য করে উদয়ন ট্রেনের ওপর উঠে গেলে দুর্ঘটনা ঘটে।"

ট্রেন সিগন্যাল অমান্য করায় এতোবড় দূর্ঘটনা যদি ঘটে থাকে, তবে বলতেই হয় এর চেয়ে দায়িত্বজ্ঞানহীন কাণ্ড আর কিছু হতে পারে না। একজন ট্রেন চালক শুধু একটা ট্রেন চালিয়ে নেন না, তিনি তার সাথে বহন করেন শত শত মানুষ। সাধারণ মানুষরা নিশ্চয়ই সিগন্যালের মান্য অমান্য বুঝবে না। মানুষ পরম আস্থা নিয়ে রাতের ট্রেনে চড়ে বসবে, আড্ডা দেবে, ঘুমিয়ে নেবে। কিন্তু, সামান্য একটা ভুল কত বড় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে তা কেউ আন্দাজও করতে পারবে না। এখানেই একজন ট্রেন চালকের ধর্যের পরীক্ষা, সহনশীলতা, নিয়ম মানার পরীক্ষা। জানি না, কেন কিসের এতো তাড়া ছিল চালকের...

তাড়াতাড়ি মানেই কি সবসময় আগে চলে যাওয়া, আগে চলে যাওয়া মানেই কি সবসময় জিতে যাওয়া...কিছু সময়ে আমাদের জিতে যাওয়ার জন্যেই হেরে যেতে হয়, থামতে হয়, অপেক্ষা করতে হয়। আমি কেবল ভাবছি, যে ১৫ জন রাতে মারা গেলেন, তাদের জীবনে আর কোনো অপেক্ষাই থাকলো না, কোনো তাড়া নেই, গন্তব্য নেই, জীবন নামের স্টেশনের শেষ তারা দেখে ফেললেন, এমন অপ্রত্যাশিত ধাক্কায়....