খেলা ও ধুলা

ডিয়ার বিসিবি, কোহলির কথাগুলো একটু শুনবেন?

দুই ম্যাচেই দল জিতেছে বিশাল ব্যবধানে, প্রতিপক্ষকে নিয়ে ছেলেখেলা করেছে, উড়িয়ে দিয়েছে মহাশূন্যে। দুই ইনিংসে ব্যাট করে নিজে একটা সেঞ্চুরী হাঁকিয়েছেন, তবুও কথাবার্তায় বিন্দুমাত্র অহঙ্কারের প্রলেপ নেই কোথাও, বরং অতিথিদের ব্যথায় সমব্যাথীই মনে হলো বিরাট কোহলিকে। ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েই যেন বাংলাদেশকে রক্ষা করতে চাইলেন সমালোচনার তীর থেকে, বাজে পারফরম্যান্সের কারণও দর্শালেন নিজের মতো করে। এবং সেই যুক্তিগুলো খুব একটা ঠুনকোও নয়। 

টেস্ট সিরিজে দাঁড়াতেই পারেনি বাংলাদেশ, বিশেষ করে ব্যাটসম্যানরা থিতু হতে পারেননি উইকেটে। র‍্যাঙ্কিঙের মতো মাঠের ক্রিকেটেও যে ভারত আর বাংলাদেশের ব্যবধানটা আকাশের সঙ্গে পাতালের সমান, সেটাই দেখিয়ে দিয়েছে এই সিরিজ। তবুও কোহলি ব্যাট করলেন বাংলাদেশের হয়ে, শুধু দায় এড়িয়েই পাশ কাটাতে চাইলেন না, ঢুকতে চাইলেন সমস্যার গভীরে, আঙুল তাক করলেন সিস্টেমের দিকেও। 

সেখানে সাকিব-তামিমের না থাকার প্রসঙ্গ যেমন ছিল, তেমনই ছিল টেস্টের মাঝে বিশাল বিরতি পড়ার ব্যাপারটাও। খেলোয়াড়দের নিবেদন নিয়ে যেমন কথা থাকলো, তেমনই কথা উঠলো টেস্ট খেলার জন্যে যথাযোগ্য পারিশ্রমিক পাচ্ছে কিনা সেই প্রসঙ্গেও। কোহলি কথা বলে গেলেন একটানা, মন্ত্রমুগ্ধের মতো সেসব কথা শোনা যায়, যদিও আমাদের ক্রিকেটের কর্তাব্যক্তিদের কানের তালা ভেঙে এসব কথা হয়তো পৌঁছাবে না কখনও, দেশের ক্রিকেটের ঘুণেধরা সিস্টেমও পাল্টাবে না। তবুও কোহলির কথাগুলো শুনে আশায় বুক বাঁধতে ইচ্ছে করে, একদিন হয়তো কোহলির মতো করেই আমাদের ক্রিকেট নিয়ে আমাদেরই কেউ ভাববে! 

“প্রথমত, দলের সবচেয়ে অভিজ্ঞ দুজন ক্রিকেটার ছাড়াই তারা খেলেছে। সাকিব নেই, তামিম নেই। মুশফিক আছে, মাহমুদউল্লাহ আছে, কিন্তু কেবল দুজন অভিজ্ঞ ক্রিকেটার দিয়ে আপনি একটা দলের কাছ থেকে খুব বেশি কিছু আশা করতে পারেন না।"

“দলের বাকি ক্রিকেটাররা তরুণ, তাই তারা এখান থেকে অভিজ্ঞতা অর্জন করবে। যেটা আমি বললাম, ওরা যত বেশি টেস্ট খেলবে তত বেশি অভিজ্ঞ হবে। যদি আপনি এখন দুটো টেস্ট খেলেন, এবং এরপর আবার দেড় বছর পর টেস্ট খেলতে নামেন তাহলে আপনি বুঝতে পারবেন না চাপের পরিস্থিতিতে কিভাবে খেলতে হয়। ওই অভ্যাসটা আপনার মধ্যে তৈরি হবে না।”

“দক্ষতা অবশ্যই আছে বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের। যারা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলছে, যোগ্য বলেই খেলছে। তবে ম্যাচের পরিস্থিতি বোঝা বা কি করে আরও ভালো করতে হয় সেটা বোঝা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। যেটা আমি বললাম, বোর্ড ও খেলোয়াড়দেরকে বুঝতে হবে, তাদের কাছে এটার গুরুত্ব কেমন। কেবল মাত্র তখনই আপনি টেস্ট ক্রিকেটে সামনে এগোতে পারবেন।” 

“আমি মনে করি, ক্রিকেটারদের ভূমিকা শুধুমাত্র একটা নির্দিষ্ট সীমা পর্যন্ত থাকে। আপনার ক্রিকেট বোর্ড এটা কিভাবে সামলাচ্ছে, সেটার একটা অবদান থাকে পুরো ব্যাপারটাতে। আমি নিশ্চিত নই, টেস্ট ক্রিকেট নিয়ে বাংলাদেশের বোর্ড কিভাবে আলোচনা করে, কিভাবে এটাকে প্রমোট করা হয় বা কতটুকু গুরুত্ব দেওয়া হয়।” 

“আমি মনে করি, দিনশেষে টেস্ট ক্রিকেটে শক্তিমত্তার দিকটা অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর নির্ভর করে। যদি টেস্ট ক্রিকেটারদেরকে ভালো একটা অর্থনৈতিক নিশ্চয়তা না দেওয়া হয়, তাহলে কিছুদিন পরেই তাদের অনুপ্রেরণার জায়গাটা কমে যাবে। কারণ কিছু ক্রিকেটার আছে যারা ২০ ওভারের খেলায় চার ওভার বোলিং করে আরেক জনের চেয়ে দশ গুণ বেশি অর্থ উপার্জন করছে।” 

“দিনশেষে, এটা আপনার জীবিকা। তাই ৫-৬ বছর পর আপনি আর চালিয়ে যাবার যুক্তি খুঁজতে যাবেন না। আপনি তখন কেবল টি-টোয়েন্টি খেলার কথা বলে দেবেন। আমি মনে করি, এই ব্যাপারটা আপনার কেন্দ্রীয় চুক্তি দিয়েই সমাধান করা যায়। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউ জিল্যান্ডের মতো দলগুলো অনেক বছর ধরে শক্তিশালী, কারণ তাদের চুক্তির কাঠামোর ভিত্তি হচ্ছে টেস্ট, বাকিগুলো আসে তার পর।” 

“আমার দৃষ্টিকোণ থেকে, আমরা একারণেই এই পরিবর্তনগুলো এনেছি যাতে করে টেস্ট ক্রিকেটাররা মনে করে খেলাটার প্রতি নিবেদন ধরে রাখলে তারা একটা নিরাপদ ভবিষ্যৎ পাবে। আপনারা দেখে থাকবেন, দল হিসেবে গত দুই-তিন বছরে আমরা কতটা রোমাঞ্চকর জায়গায় পৌঁছেছি। আমার মনে হয়, এটা বোর্ড ও খেলোয়াড়দের একটা সুন্দর জুটির মতো, যা সঠিক পথে এগিয়ে নিচ্ছে সব। আপনি যদি আমাদের চুক্তির ব্যাপারটা দেখেন, তাহলে দেখবেন টেস্ট ক্রিকেটারদের এখানে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়।’

“আপনি শুধু ক্রিকেটারদেরই টেস্ট ক্রিকেটের প্রতি নিবেদিত হতে বলতে পারেন না। আমরা পেশাদার ক্রিকেটার। এটা আমাদের রুটি-রুজি। যখন বলা হবে টেস্ট ক্রিকেট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তখন সবকিছুই সেই হিসেব মেনেই হওয়া উচিত। কারণ, একজন ক্রিকেটারের জন্য অন্য কোনো পেশার খোঁজ করতে হলে হয়তো সে কাজই পাবে না, কারণ সে কেবল ক্রিকেটটাই খেলতে পারে। আমার মনে হয়, এর একটা পথ আমরা বের করেছি এবং এখন এটার ফল আপনারা দেখতে পারছেন।”

বাংলাদেশের ক্রিকেট বোর্ড এবং ক্রিকেটারেরা কি কোহলির কথাগুলো শুনেছেন??