মনের অন্দরমহল

ফেল থেকে যদি দারুণ কিছু হয়, তাহলে তো ফেলই ভালো!

ক্লাস নাইনে আমি একবার সাময়িক পরীক্ষায় ফেল করে ফেললাম। আমার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটিনার তালিকা যদি করতে বলা হয়, তাহলে তামাশা বা যাব হ্যারি মেট সেজেলের ফ্লপ হওয়া নয়, ওই ফেলটাকেই সবার ওপরে রাখব আমি। হতভম্ভ হয়ে গিয়েছিলাম, আমি, আমার বাবা-মা'ও। আমার সব বন্ধুরা পাশ করেছে, শুধু আমিই ফেল! বুঝতেই পারছিলাম না কি করা উচিত। কিন্ত স্কুলে তো যেতে হবে, ক্লাস শুরু হয়ে গেছে ততদিনে। বাবা-মা আমাকে বোঝালেন, যা হবার হয়ে গেছে, স্কুলে যাওয়া দরকার আমার। 

স্পষ্ট মনে আছে, টানা চারদিন আমি স্কুল ড্রেস পরে গিয়েছি, কিন্ত গেটের ভেতরে ঢুকতে পারিনি। একটা অদৃশ্য শক্তি যেন বাধা দিচ্ছিলো আমাকে। দেখতে পাচ্ছি যে ক্লাস হচ্ছে, আমার বন্ধুরা সবাই ক্লাস করছে, আমি শুধু নেই সেখানে। নিজেকে এলিয়েন মনে হচ্ছিলো, ভাবছিলাম, জগত-সংসারের সবকিছুই ঠিকঠাক আছে, শুধু আমি ঠিক নেই। নিজেকে অপরার্থ আর অযোগ্য মনে হচ্ছিলো শুধু। 

আমি যে শহর থেকে এসেছি, সেই জামশেদপুরকে একটা সময়ে বলা হতো সুইসাইড ক্যাপিটাল অফ ইন্ডিয়া। এখান থেকে সবচেয়ে বেশি ছাত্র আইআইটিতে চান্স পেতো তখন। কাজেই বাবা-মায়েদের মধ্যে তুলনা করার একটা সহজাত প্রবৃত্তি তৈরি হতো। অমুকের ছেলে আইআইটি দিল্লিতে চান্স পেয়েছে, তুই কেন ঘাস কাটছিস? তোর পেছনে কি খরচ কম করেছি? এরকমটাই ছিল বেশিরভাগ বাবা মায়ের চিন্তাভাবনা। এই প্রেশারটা সবাই নিতে পারতো না, অনেকেই পৃথিবীকে বিদায় জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলতো শুধু 'সমাজ' আর বাবা মায়ের সামনে কিভাবে মুখ দেখাবে, এই দুশ্চিন্তায়! 

আমাকে সেই পথে হাঁটতে হয়নি, কারণ বাবা মা প্রচণ্ড সাপোর্টিভ ছিলেন। সাময়িক পরীক্ষায় আমার ফেল করাটাকে ইস্যু বানাননি তারা। হ্যাঁ, ক্লাসে তো ঠাট্টা-তামাশার শিকার হয়েছি, শিক্ষকেরাও মাঝেমধ্যে টিপ্পনী কেটেছে। নিজের মধ্যে তাই একটা তাড়না তৈরি হয়ে গিয়েছিল, এমন কিছু যাতে আর কখনও না ঘটে। 

অদ্ভুতভাবেই এরপরে আমি পড়ালেখার প্রতি সিরিয়াস হয়ে গেলাম, ক্রিকেট খেলা শুরু করলাম, ফাজলামী করতে করতে থিয়েটারেও যোগ দিয়ে ফেললাম! দুই বছর পরে স্কুল থেকে বেত হলাম ভালো রেজাল্ট নিয়ে, তার আগে স্কুলের ক্রিকেট টিমের ক্যাপ্টেন হয়ে গেছি আমি, থিয়েটার গ্রুপের কল্যানে শহরেও নাম-ডাক ছড়িয়েছে একটু!

 

ইউরোপীয়ান কালচার পড়তে গেলে দেখবেন, সেখানে দুট ভাগ। রেঁনেসার আগে একরকম, রেঁনেসার পরে আরেক। আমি আমার জীবনটাকেও সবসময় দুই ভাগে ভাগ করি, ক্লাস নাইনের আগের ইমতিয়াজ, আর ক্লাস নাইনে ফেল করার পরের ইমতিয়াজ। সেই ফেলটা আমাকে শক্ত করেছে, শিক্ষা দিয়েছে, ভাবতে শিখিয়েছে। পড়ালেখার বাইরেও যে বিশাল একটা দুনিয়া পড়ে আছে, সেটা আমি আবিস্কার করেছি পরীক্ষায় ফেল করার পরে। আজকের এই ইমতিয়াজ আলি হবার পেছনে সেই ফেলের বিশাল একটা অবদান আছে।

মাঝেমধ্যে পত্রিকায় পড়ি, পরীক্ষায় খারাপ রেজাল্ট করে বাচ্চারা আত্মহত্যা করছে। আমি বুঝি, ওদের মনে কি ভয়টা কাজ করে। বাবা-মায়েরা ওদেরকে যতোটা যোগ্য মনে করে, ওরা ভাবে পরীক্ষায় ফেল করে সেই যোগ্যতার প্রমাণ বুঝি তারা দিতে পারলো না। এই ছেলেমেয়েগুলোকে সামনে পেলে আমি শুধু ওদের বোঝানোর চেষ্টা করতাম যে, পৃথিবীর এই ব্যাপারগুলো কতটা ছোট, কতটা তুচ্ছ। আশেপাশের পাঁচটা মানুষ কি বলবে না বলবে, সেটার ভয়ে নিজেকে শেষ করে দেয়া এই বাচ্চাগুলো জানেও না, কি অমূল্য প্রতিভা হয়তো ওদের বুকের ভেতরে লুকিয়ে আছে!