ইনসাইড বাংলাদেশ

বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ বড় জিম্মি...

টানা তৃতীয় দিনের মতো চলছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকদের সড়ক অবরোধ, রাস্তায় নেই গাড়ি, অবর্ণনীয় ভোগান্তির সম্মুখীন হয়েছে সাধারণ মানুষ। গণপরিবহন তো চলছেই না, তার ওপরে ব্যক্তিগত গাড়ি নিয়ে রাস্তায় কেউ নামলেও তাকে আক্রমণ করা হচ্ছে, মুখে কালি মাখিয়ে করা হচ্ছে গালিগালাজ। এমনকি পুলিশের সামনেই ঘটছে এসব ঘটনা, পুলিশও তাকিয়ে দেখছে, তাদের যেন কিছুই করার নেই। একটা সভ্য দেশের রাজপথে এমন কাণ্ড ঘটতে পারে, এটা বাইরের কোন দেশের কাউকে বললে বিশ্বাস করবে না। অথচ বাংলাদেশে পরিবহন শ্রমিকেরা দুদিন পরপরই এই ঘটনা ঘটাচ্ছে।

সড়ক আইনে পরিবর্তন আনা হয়েছে সম্প্রতি, ইচ্ছাকৃতভাবে সড়ক দুর্ঘটনাকে খুনের আওতায় এনে বিচার করা-সহ বেশ কয়েকটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে আইনে। কঠোর অবস্থানে যাওয়া হয়েছে রাস্তায় অসতর্কভাবে চলাচলকারী পথচারীদের প্রতিও, রাখা হয়েছে বড় অঙ্কের জরিমানার ব্যবস্থা। অথচ ঠিক যেদিন থেকেই আইনটা কার্যকর হবার কথা, সেদিন থেকেই আন্দোলনের নামে নৈরাজ্য শুরু করেছে পরিবহন শ্রমিকেরা, পেছন থেকে তাদের ইন্ধন যোগাচ্ছে মালিকেরা। 

এর আগেও অজস্রবার এমন হয়েছে। যখনই সরকার সড়ক পরিবহন আইন নিয়ে একটু সিরিয়াস হতে চেয়েছে, তখনই বাগড়া দিয়েছে পরিবহন মালিক-শ্রমিকেরা। দূরপাল্লার গাড়ি চলাচল বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, ঢাকার ভেতরেও রাস্তায় নামতে দেয়া হয়নি গণপরিবহনকে। একটা অঘোষিত হরতালের অবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে, দাবী তাদের একটাই- রাজপথে খুনের লাইসেন্স চায় এই ফ্র‍্যাংকেনস্টাইনের দল।

এরা যে কতটা ক্ষমতাবান, সেটা কল্পনারও বাইরে। বছর দেড়েক আগে যখন শহীদ রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই ছাত্র-ছাত্রীকে পিষে মেরে ফেলেছিল ঘাতক এক বাস ড্রাইভার, তখন ছাত্র-ছাত্রীদের আন্দোলনে দফায় দফায় হামলা করেছে এরা। কঠোর কোন সড়ক আইন যাতে বাস্তবায়ন না হতে পারে, সেজন্যে চাপ দিয়ে গেছে বরাবর। আর তাদের শীর্ষ নেতারা তো বরাবরই খুনের দায়ে অভিযুক্ত চালকদের পক্ষে সাফাই গেয়েছেন, মানুষের ভুল হতেই পারে বলে যুক্তি দেখিয়েছেন। 

সড়ক পরিবহন মালিক এবং শ্রমিকদের যেসব সংগঠন, এগুলোর নেতৃত্বে যারা আছেন, তাদেরকে দেখলে অনেকে অবাকই হবেন। এখানে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা শাহজাহান খান যেমন আছেন, তেমনই আছেন জাতীয় পার্টির মশিউর রহমান রাঙ্গাও। আবার বিএনপির শিমুল বিশ্বাস বা বাসদের নেতারাও আছেন শীর্ষস্থানীয় পরিবহন নেতাদের তালিকায়। মানে, রাজনৈতিকভাবে যতো বৈরিতাই থাকুক, ভাগাভাগির বেলায় সব রসুনের কোয়া এক জায়গায় এসে মিলিত হয়। 

আর এটাই এদের সবচেয়ে বড় শক্তি, সিন্ডিকেট করে পায়াভারী হয়েছে এরা, ধরাকে সরা জ্ঞান করছে। সরকারও এদের কাছে অসহায়। অন্য কোন দেশে হলে গাড়ি বন্ধ করে দিয়ে রাজপথে এরকম নৈরাজ্য চালানো অমানুষগুলোকে পেঁদিয়ে বৃন্দাবন পাঠানোর ব্যবস্থা করা হতো। অথচ আমাদের সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনুনয় করেই বলেছেন, আন্দোলনের নামে জনগনকে যেন 'কষ্ট' দেয়া না হয়! জনগনের কষ্টটা যে সরকার খুব ভালোভাবে অনুভব করতে পারছে, সেটা আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতার কথাতেই প্রতীয়মান!

আমরা বারবার এই অমানুষদের কাছে হেরে যাই, আমাদের জিম্মি করে এরা এদের অন্যায় আবদারগুলো পূরণ করে নেয়। সরকার পর্যন্ত এদের কাছে অসহায়, মন্ত্রীর কথার সুরেই সেটা স্পষ্ট। আমরা জনগণ, সংখ্যায় আমরা ভারী, আমাদের ভালোমন্দটা গুরুত্ব পাবার কথা ছিল। অথচ গুরুত্ব পাচ্ছে একদল খুনীর চাহিদা, তাদের কথামতোই যেন আইন-আদালত চলবে। এরচেয়ে জঘন্য ব্যাপার আর কি হতে পারে বলুন?