ইনসাইড বাংলাদেশ

হলি আর্টিজানের রায় ও কিছু দীর্ঘশ্বাসের গল্প!

রায় দেয়া হয়েছে হলি আর্টিজান হত্যাযজ্ঞের। সাত আসামীকে ফাঁসির সাজা দিয়েছেন আদালত। দুপুর নাগাদ বিচারক যখন রায় পড়ে শোনাচ্ছিলেন, ঢাকা থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে ইংল্যান্ডে বসে হয়তো মুচকি হাসছিলেন হাসনাত রেজাউল করিম। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর কথা ছিল এই হত্যাযজ্ঞের অন্যতম দুই অভিযুক্ত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক হাসনাত এবং কানাডার টরেন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাহমিদের। অথচ পুলিশের চার্জশিট থেকে মুক্তি পেয়ে দুজনেই পাড়ি জমিয়েছেন দেশের বাইরে, তারা এখন মুক্ত বিহঙ্গ! 

গুলশানের হলি আর্টিজানে হামলার পর একজন কোরীয় নাগরিকের গোপনে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর হাসনাত করিমের ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে। এর আগে উদ্ধার অভিযানের পরেও তার কথাবার্তা ছিল সন্দেহজনক। ওই ভিডিওতে তাকে জঙ্গিদের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে দেখা গিয়েছিল, মনে হচ্ছিলো, কোন ব্যপার নিয়ে জঙ্গীদের সাথে পরামর্শ করছিল সে। 

হাসনাত এবং তাহমিদের হাতে অস্ত্রও দেখা গেছে ফুটেজের বেশ কয়েকটা অংশে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় হাসনাত হিযবুত তাহরীরের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলেও অভিযোগ ওঠে। হাসনাতের মোবাইল থেকেই জঙ্গীরা আইএসের কাছে হত্যাকান্ডের ছবি পাঠিয়েছিল বলে জানা গেছে পরে। এত কিছুর পরে সন্দেহের তীর হাসনাতের ওপর পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। 

গুলশানে জিম্মিদশা অবসানের পরপরই হাসনাত ও তাহমিদকে গোয়েন্দা পুলিশের জিম্মায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের গ্রেফতার দেখিয়ে রিমান্ডেও নেয়া হয়েছিল তথ্য উদ্ধারের জন্যে। কিন্ত এই দুজন গ্রেফতার হবার সঙ্গে সঙ্গেই যেন মৌমাছির চাকে ঢিল পড়েছিল। দুজনের পরিবার আন্তর্জাতিক লবিং শুরু করেছিল তখন। হাসনাতকে গ্রেফতারের কারণ জানতে খোঁজ নিয়েছিল ব্রিটিশ হাইকমিশন, তাহমিদের গ্রেফতার অন্যায্য- এই মর্মে চিঠি দেয়া হয়েছিল কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর কাছেও! 

দেশের ইতিহাসের ভয়াবহতম জঙ্গী হামলা হয়েছে, নিচে পড়ে আছে বিশটা তাজা লাশ, যারা কয়েক ঘন্টা আগেই জীবিত ছিল। এই পরিস্থিতিতে কি কোন স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে জঙ্গীদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সিগারেটে টান দেয়া সম্ভব? কিংবা জঙ্গীদের সঙ্গেই পিস্তল হাতে শো-ডাউন করা? হাসনাত এবং তাহমিদ কিন্ত সেটাই করেছে! অথচ পরে তারা দাবী করেছে, অস্ত্রের মুখে ভয়ভীতি প্রদর্শন করেই নাকি তাদের দিয়ে কাজগুলো করানো হয়েছে! 

তাহমিদের হাতে পিস্তল কেন? কেন তারা এতো শান্তভাবে আলাপ করছিল? কি আলাপ হচ্ছিল জঙ্গীদের সঙ্গে? যদি বন্দুকের মুখে হামলাকারীরা তাদের বাধ্য করতো, তাহলেতো হাসনাত ও তাহমিদের এতো শান্ত থাকার কথা নয়। কাউকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করলে তার চেহারায় ন্যুন্যতম উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা থাকার কথা। সেটা কেন অনুপস্থিত ছিল? 

হাসনাত এবং তাহমিদ হলি আর্টিজানের হত্যাযজ্ঞে জড়িত ছিল কিনা, সেটা প্রমাণ করতে দিতে পারতো সেই জায়গার সিসি টিভি ফুটেজ। কিন্ত অবাক করার মতাও ব্যাপার হচ্ছে, ঘটনার তিন বছর পরেও সেই ফুটেজ উদ্ধার করা যায়নি, সিসিটিভি ফুটেজ ছাড়াই তদন্তের কাজ শেষ করেছে পুলিশ। কেউ যদি প্রশ্ন করে, কাউকে রক্ষার জন্যে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে সিসিটিভি ফুটেজ সরিয়ে ফেলা হয়েছে কিনা- সেটা কি খুব বেশি অন্যায্য হয়ে যাবে? 

পুলিশের পক্ষ থেকে জঙ্গিদের সঙ্গে হাসনাতের কথাবার্তা বলার ছবিকে 'পরিস্থিতির শিকার' হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। জঙ্গিরা নাকি তাকে 'মানবঢাল' হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল। জঙ্গিরা জানতে পারে হলি আর্টিজানের আশপাশে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্নাইপার রাইফেল বসিয়েছে। তাই অস্ত্রের মুখে এই দুজনকে ছাদে নেয় জঙ্গিরা, যাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিভ্রান্তিতে পড়ে। তার মানে আমাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে যে, হলি আর্টিজানে হামলাকারীরা শুধু গোলাগুলি চালানোতেই প্রশিক্ষিত ছিল না, তারা নাটক বানানোর মতো দক্ষ চিত্রনাট্যকারও ছিল! 

আজ রায় ঘোষণার পরে ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত এক জঙ্গীর মাথায় আইএসের টুপি দেখা গেছে, সেই টুপি কোত্থেকে এসেছে পুলিশ জানে না। রায়ের আগে-পরে চিৎকার করে গালাগাল করেছে আসামীরা, হুমকি দিয়েছে। কয়লা ধুইলে যে ময়লা যায় না, সেটাই প্রমাণ করে দিয়েছে বেজন্মাগুলো। অবশ্য, যে দেশে নৃশংস হত্যাকান্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ রেখেও হাসনাত বা তাহমিদেরা প্রভাব খাটিয়ে ছাড়া পেয়ে দেশের বাইরে চলে যায়, সেদেশের আদালতে জঙ্গীরা পুলিশি প্রহরায় জেলখানা থেকে আইএসের টুপি পরে আদালতে হাজির হবে, তাতে আর অবাক হবার কি আছে?