এরাউন্ড দ্যা ওয়ার্ল্ড

মানুষ এত নির্মম, এতটা নৃশংস হয় কীভাবে?

ফে ডি সুজার সাংবাদিকতা জীবন প্রায় দেড়যুগের। ফিল্ড জার্নালিস্ট হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন দৈনিক পত্রিকায়, এখন দিল্লিভিত্তিক একটা ইংরেজী নিউজ চ্যানেলের প্রধান কর্তা তিনি। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে অজস্র ধর্ষণের ঘটনা কাভার করেছেন এই ভদ্রমহিলা। দিল্লির নির্ভয়া রেপ কেস থেকে কাশ্মীরের নাবালিকা শিশু আসিফা বানুর ধর্ষণ ও হত্যাকান্ড- সব ঘটনাতেই খবর সংগ্রহ কিংবা স্পেশাল রিপোর্ট তৈরি করার জন্যে ছুটেছেন তিনি। সেই ফে ডি সুজাও বলছেন, তার জীবনে এমন বীভৎস, এমন নির্মম নির্যাতনের মাধ্যমে হত্যার কথা শোনেননি কখনও!

ভারতের হায়দরাবাদের তেলেঙ্গানায় এক তরুণী পশু চিকিৎসককে গতকাল গণধর্ষণের পর জীবন্ত অবস্থায় গায়ে পেট্রোল ঢেলে পুড়য়ে হত্যা করা হয়েছে। প্রমাণ লোপাটের জন্যে লাশটা ফেলে রাখা হয়েছিল জনবিরল একটা জায়গায়। ছাব্বিশ বছরের সেই তরুণীর মুখটার দিকে তাকালেও বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়, তাকে এমন ভয়ংকর পরিণতি বরণ করে নিতে হয়েছে! পুড়ে প্রায় কয়লা হয়ে যাওয়া নিথর দেহটার ছবিও এসেছে কিছু সংবাদমাধ্যমে, শিউরে ওঠার মতো সেই ছবি। 

পুলিশ ইতিমধ্যেই ঘটনার সাথে জড়িত সন্দেহে চারজনকে গ্রেফতার করেছে, থানা হেফাজতে তারা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দীতে জানিয়েছে, পরিকল্পনা করেই সেই তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণের পর খুন করেছে তারা। বেশ কিছুক্ষণ তাকে অনুসরণ করা হয়েছে, তার অলক্ষ্যে তার স্কুটারের চাকা পাংচার করে দেয়া হয়েছে। তারপর সাহায্যের আশ্বাস দিয়ে তাকে আটকে রেখে পালাক্রমে।করা হয়েছে ধর্ষণ। 

হায়দরাবাদের কল্লুরু গ্রামের একটি পশু-হাসপাতালে কাজ করতেন তরুণী। তদন্তে পুলিশ জেনেছে, ঘটনার সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে প্রথমে গোচিবাওলিতে এক চর্মচিকিৎসকের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। নিজের স্কুটারটি সামশাবাদ টোল প্লাজার কাছে রেখে ট্যাক্সি নিয়ে ওই চিকিৎসকের সঙ্গে তিনি দেখা করতে যান। ফিরে এসে দেখেন, স্কুটারের পিছনের চাকাটি পাংচার হয়ে গেছে। 

হায়দরাবাদ শহর থেকে শামশাবাদ প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরে। তরুণী ওই টোল প্লাজা থেকে রাত ৯টা নাগাদ তার বোনকে ফোন করে বলেন, দুই ট্রাকচালক তাকে সাহায্য করবে বলছে। তিনি রাজী না হওয়ার পরেও টায়ার সারিয়ে দেবে বলে স্কুটার নিয়ে চলে গিয়েছে এক জন। বোন তাকে পরামর্শ দেন, স্কুটারটি রেখে ট্যাক্সি ধরে যাতে তিনি বাসায় চলে আসেন। এরপরে আর তরুণীর সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেননি তার বোন। পৌনে ১০টায় বোন আবার ফোন করে দেখেন, মোবাইল বন্ধ। পরের দিন সকালে সামশাবাদের আউটার রিং রোডের আন্ডারপাসের নীচে ওই চিকিৎসকের পোড়া দেহাংশ পাওয়া যায়।

পুলিশ বলেছে, সেই তরুণী যখন টোল প্লাজার সামনে স্কুটার পার্ক করে বন্ধুর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলেন, তখন সেখানে বসে মদ্যপান করছিল চার অভিযুক্ত। তার সবাই ট্রাক শ্রমিক। তখনই তারা পরিকল্পনা করে তরুণীকে ধর্ষণের। সেই মোতাবেক পাংচার করে দেয়া হয় তার স্কুটার। ফিরে এসে তরুণী যখন দেখলেন এই স্কুটার নিয়ে বায়ারি ফেরা যাবে না, তখন উপযাচক হয়ে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে চারজন। এদের মধ্যে শিবা নামের একজন চলে যায় স্কুটার নিয়ে। 

রাত তখন সাড়ে নয়টার বেশি, সুনশান হয়ে এসেছে এলাকা। বোনের সঙ্গে কথা বলার পর সেই তরুণী যখন ট্যাক্সির খোঁজ করছিলেন, তখন আচমকাই তার ওপর হামলে পড়ে তিনজন। মুখ চেপে ধরে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় পার্শ্ববর্তী একটা ঘরে। সেখানে হাত-পা-মুখ বেঁধে পালাক্রমে ধর্ষণ করা হয়। ততক্ষণে শিবা ফিরে এসেছে, সে-ও অংশ নেয়া ধর্ষণে। 

প্রমাণ লোপাট করার জন্যে তরুণীকে মেরে আহত করার পরে তার দেহটা নিয়ে যাওয়া হয় শহর থেকে খানিকটা বাইরে নদীর ধারে। জায়গাটা আবর্জনা ফেলার জন্যে ব্যবহৃত হয়, সহজে কেউ আসে না। সেখানে তরুণীর গায়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয় নরপিশাচেরা, তখনও তার দেহে প্রাণ ছিল! পরের দিন ভোরে এক দুধ-বিক্রেতা সেখান দিয়ে যাওয়ার সময় দেহটি জ্বলতে দেখে পুলিশে খবর দেন।

নির্ভয়া ধর্ষণ-কান্ডের পরে জেগে উঠেছিল ভারত। কাশ্মীরে মুসলমান হবার অপরাধে যখন মন্দিরের ভেতরে বন্দী করে শিশু আসিফাকে টাকা কয়েকদিন ধর্ষণের পর খুন করা হয়েছিল, তখনও ভারতের সর্বস্তরের মানুষ প্রতিবাদ করেছিল। স্থানীয় রাজনীতিবিদেরা অপরাধীর পক্ষে থাকলেও পার পায়নি তারা। হায়দ্রাবাদের এই নৃশংস ঘটনায় আরও একবার গর্জে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছে ভারতের মানুষ, সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠেছে ঝড়। 

নির্ভয়া কাণ্ডের অপরাধীরা সাজা পেয়েছে, বিচার হচ্ছে আসিফা বানুর ধর্ষণ এবং খুনের সঙ্গে জড়িতরাও। ছয় বছর আগে ধর্ষণের বিরুদ্ধে স্লোগান তুলে দিল্লির রাজপথে নেমে এসেছিল যে জনতা, তাদের আশা কি পূরণ হয়েছে? উপমহাদেশের পথঘাট কি নারীর জন্যে নিরাপদ হয়েছে একটুও? হলে তো রাত নয়টার পরে এভাবে ধর্ষণের পর প্রমাণ লোপাটের জন্যে নৃশংসভাবে খুন করা হতো না হায়দরাবাদের এই ভেটেরিনারি চিকিৎসককে! 

নির্ভয়া ধর্ষণের প্রধান অভিযুক্ত রাম সিং একটা কথা বলেছিল সাক্ষাৎকারে। তার দাবী ছিল, কেন মেয়েরা এত রাতে বাড়ির বাইরে বের হবে, যারা বের হয় তারা খারাপ মেয়ে, তাদের সঙ্গে এমনটাই হওয়া উচিত! এমনকি রাম সিং এমনটাও দাবী করেছিল, সে যদি আবারও এমন সুযোগ পায়, আবার ধর্ষণ করবে! জেলের ভেতরে রাম সিংকে নাহয় মেরে ফেলা গেল, কিন্ত রাম সিংয়ের মতো বিকৃতমনস্ক চিন্তা নিয়ে যে লাখো মানুষ মুক্ত বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তাদের চিন্তাভাবনাকে কি এত সহজে বদলানো যাবে?