খেলা ও ধুলা

বিসিবি: খামখেয়ালী আর অদূরদর্শী কিছু মানুষের মিলনমেলা!

এক. ২০১৬ সালের কথা। নিউজিল্যান্ডে পূর্ণাঙ্গ সিরিজ খেলতে যাবে বাংলাদেশ দল। দিবারাত্রির টেস্ট তখন কেবল শুরু হয়েছে, বলাবলি হচ্ছে, ভবিষ্যতে নাকি এই ফরম্যাটেই টেস্ট ক্রিকেট চলবে। লাল বল আর থাকবে না, সেটার জায়গা নেবে গোলাপী বল। সকালের সেশনের রোমাঞ্চ উধাও হয়ে যাবে, তার পরিবর্তে আসবে ফ্লাডলাইটের আলোয় টিকে থাকার লড়াই। বাংলাদেশ দল তখনও দেশ ছাড়েনি  নিউজিল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের পক্ষ থেকে বিসিবিকে প্রস্তাব দেয়া হলো, তিন ম্যাচের মধ্যে সর্বশেষ টেস্টটা ডে-নাইট খেলার জন্যে। 

গোলাপী বল বা দিন-রাতের টেস্ট ম্যাচ তখন বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের জন্যে পুরোপুরি অচেনা একটা ব্যাপার। এমনিতেই নিউজিল্যান্ডে বাংলাদেশের রেকর্ড যা-তা, তার ওপরে দিবারাত্রির টেস্ট খেলে খাল কেটে কুমির আনতে রাজী হলো না বিসিবি। প্রস্তাব নাকচ করে দিলো তারা। 

ঠিক তিন বছর পরে এসে ইডেনে আজ নিজেদের প্রথম দিবারাত্রির টেস্ট ম্যাচে ভারতের মুখোমুখি হলো বাংলাদেশ দল। ২০১৬ সালে গোলাপী বল বা ফ্লাডলাইটের আলোয় টেস্ট খেলা নিয়ে বাংলাদেশী ক্রিকেটারদের জ্ঞান যতটুকু ছিল, আজও ঠিক সেখানেই আটকে আছে। একটুও বাড়েনি সেটা। 

বিসিবির কর্তারা তো জানতেন, আজ না হোক কাল, কাল না হলেও বছর কয়েক পরে দিবারাত্রির টেস্ট খেলতেই হবে। সেই অনুযায়ী কি কোন প্রস্তুতি নেয়া হয়েছিল? একটা পদক্ষেপের কথাও কি স্মরণ করতে পারবেন বিসিবির কেউ? ঘরোয়া ক্রিকেটে লঙ্গার ভার্সনে দিবারাত্রির ম্যাচ আয়োজন করা হয়েছিল কখনও? গোলাপী বলে ম্যাচ খেলা হয়েছিল? সবগুলো প্রশ্নের উত্তর হচ্ছে- না! বাংলাদেশ দলের ক'জন খেলোয়াড় ভারত সফরে আগে গোলাপী বলটা কখনও ধরে দেখেছেন- এই প্রশ্নটা উঠলেও সংখ্যাটা দুই অংকে যাবে না নিশ্চিত।

দুই. মোসাদ্দেক পারিবারিক কারণে দেশে ফিরে এসেছেন দিন দশেক আগে, খেলতে পারেননি প্রথম টেস্টটা। তার রিপ্লেসমেন্ট হিসেবে নেয়া হয়নি কাউকেই। দুইদিন আগে জানা গেল, ওপেনার সাইফ হাসান খেলতে পারবেন না দ্বিতীয় টেস্ট। টিম ম্যানেজমেন্ট তার বদলী হিসেবেও কাউকে ডাকলো না! অথচ ঢাকা থেকে কলকাতায় বিমানে যেতে লাগে চল্লিশ মিনিট। এমন তো নয় যে সুদূর ক্যারিবিয়ানে পাঠাতে হবে কাউকে! তাহলে পনেরোজনের স্কোয়াড থেকে দুটো খেলোয়াড় আনএভেইলেবল হয়ে যাওয়ার পরেও কেন তাদের বদলি হিসেবে কাউকে নেয়া হলো না? 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গেলেন খেলা দেখতে, সঙ্গে গেলে মাশরাফি, দুর্জয়রা। সৌরভ গাঙ্গুলীর বিশেষ আমন্ত্রণে গেলেন ২০০০ সালে বাংলাদেশের প্রথম টেস্টের স্কোয়াডে থাকা সাবেক ক্রিকেটারেরা। বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন আর সিইও নিজামউদ্দিন চৌধুরী গতকালই চলে গেছেন ইডেনের এই টেস্টে উপস্থিত থাকতে। অথচ দুজন ক্রিকেটার যে খেলতে পারবেন না, তাদের বদলি হিসেবে কাউকে পাঠানো হলো না! 

আজ যখন লিটন মাথায় আঘাত পেয়ে উঠে গেলেন, তারপর নাঈমও এই টেস্টের জন্যে অনিশ্চিত হয়ে গেলেন, যখন মাঠে পানি নেয়ার জন্যে একটা খেলোয়াড়কে পাওয়া যাচ্ছিলো না, তখন কি বোর্ড প্রেসিডেন্ট পানি টেনেছেন? ক্রিকেটার পাঠানোর চিন্তা নেই, নিজেরা গিয়ে গ্যালারি ভরানোর চিন্তায় আছেন কর্তারা! প্রথম টেস্টের দল থেকে বাদ পড়া মিরাজ এখন শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলছেন, নাঈমের জায়গায় বোলিং করছেন তাইজুল। আর মাথায় ব্যান্ডেজ বেঁধে পানি নিয়ে হাজির হচ্ছেন নাঈম। এই দৃশ্যটা দেখতেও লজ্জা লাগছে। 

অবশ্য, লজ্জা শব্দটা তো আমাদের ক্রিকেটের সংস্কৃতিতেই নেই। এখানে বাজে পারফর্ম করে ক্রিকেটারেরা লজ্জা পান না, খেলোয়াড়ের আগে বিমানে উঠে বসে থেকে বোর্ড কর্তারাও লজ্জা পান না। লজ্জা যাদের অন্তরে নেই, তাদের সামনে লজ্জার কথা বলে নিজে লজ্জিত হবার কি মানে আছে?