পিংক এন্ড ব্লু

ড. ইয়াসমিন হকের ২৩ বছরের সাধনা ও আমাদের কৃতজ্ঞতা

ক্যান্সার চিকিৎসায় এক যুগান্তকারী বৈপ্লবিক আবিষ্কার করেছেন বাংলাদেশি বিজ্ঞানী ড. ইয়াসমিন হকের নেতৃত্বে একদল গবেষক। মাত্র ৫০০ টাকায় ৫ মিনিটেই এখন শনাক্ত করা যাবে ক্যান্সার!

সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ইয়াসমিন হকের নেতৃত্বে গবেষক দল এক বিশেষ ক্যান্সার শনাক্তকরণ যন্ত্র উদ্ভাবন করেন। অল্প খরচে এবং স্বল্প সময়ে এই যন্ত্র দিয়ে ক্যান্সার আছে কি নেই তা জানা সম্ভব।

শুনতে খুব সহজ লাগছে? রক্ত নমুনা দিয়েই ক্যান্সারের পরীক্ষা হয়ে যাবে, তাও এতো কম সময়ে, কম টাকায়। যদি কেউ মনে করেন রাতারাতি এই সাফল্য এসেছে, তা কল্পনাই করা যাবে না। কারণ, এই অভূতপূর্ব গবেষণা কাজটি চলছে আজ ২৩ বছর যাবত। যার শুরুটা হয়েছিল ১৯৯৬ সালে।

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন নন লিনিয়ার অপটিক্স নিয়ে কাজ করা শুরু হয়েছিল তখন থেকেই এই বিষয় নিয়ে কিছু করার চেষ্টা হয়ে আসছিল। কোনো বস্তুর সঙ্গে আলোর মিথস্ক্রিয়ায় বস্তুটিকে দৃশ্যমান করার বিষয় নিয়ে নন-লিনিয়ার অপটিক্স পর্যালোচনা করে। অতি তীব্র আলোর সংস্পর্শে এলে মাধ্যমগুলোর আলোকীয় ধর্মের পরিবর্তন হতে শুরু করে এবং তাদের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যগুলো প্রকাশিত হতে থাকে। ভিন্ন ভিন্ন পদার্থ বা মাধ্যমকে তখন তাদের নন-লিনিয়ার অপটিক্যাল বৈশিষ্ট্য দিয়ে শ্রেণি বিভাগ করা সম্ভব হয়। 


২০১৫ সালে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল নন লিনিয়ার অপটিক্স বিষয়ে একটি উদ্ভাবনমূলক পরিকল্পনা জমা দেয়। রক্তের নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্য পরিমাপ করে ক্যান্সারের সম্ভাব্য উপস্থিতি ও অবস্থা চিহ্নিত করার একটি প্রক্রিয়া উদ্ভাবন। মানে হচ্ছে, ক্যান্সার রোগাক্রান্ত রোগীদের রক্তে এমন কিছু একটা অনুসন্ধান করে বের করা, যার নন-লিনিয়ার বৈশিষ্ট্যটি ক্যান্সার রোগের সম্ভাব্যতার একটি ধারণা দেবে।

এভাবেই তারা গবেষণাটির সাফল্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছান। ইতিমধ্যে পরীক্ষামূলক ভাবে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে সাফল্য পাওয়া গেছে। এই আবিষ্কারটির প্যাটেন্ট আবেদনও করা হয়েছে আমেরিকা ও বাংলাদেশে।

ড. ইয়াসমিন হক বলেন, "ক্যান্সার শনাক্তকরণের এই গবেষণা প্রথমে ১০জন সাধারণ এবং ৬০জন ক্যান্সার রোগীর ওপর পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এতে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীর রক্তের সেরামে একটা চেঞ্জ আসে। সেটা নন-লিনিয়ার অপটিকস ব্যবহার করে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে আগে ভাগেই পূর্বাভাস পাওয়া যায়।"

বাংলাদেশের একদল বিজ্ঞানী মরণঘাতী ক্যান্সার রোগের লড়াইয়ে এমন এক উদ্ভাবন করলো, যা এই রোগটির চিকিৎসায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। প্রচলিত পদ্ধতিতে ক্যান্সার পরীক্ষা নিরীক্ষা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। তাছাড়া, বর্তমানে ক্যান্সার রোগ ধরা পড়েও বেশ পরে, শেষ সময়ে, যখন আর কিছুই করা থাকে না। আর বাংলাদেশের মতো একটি দেশে চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও বেশ সমস্যায় পড়তে হয় মানুষকে। ক্যান্সারের চিকিৎসা করতে গিয়ে নিঃস্ব হয়েছে এরকম পরিবারের উদাহরণও আমাদের আশেপাশেই হয়ত আছে।


ড. ইয়াসমিন ও গবেষক দলের প্রতি শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা। গোটা বিশ্বেই ক্যান্সার চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন, যার নেতৃত্বে একজন বাংলাদেশি নারী বলে গর্বিত বোধ করছি আরো বেশি। কারণ, যে সময় তিনি এই গবেষণার কথা ভেবেছিলেন, সেই ১৯৯৬ সালে কিংবা এর আগের সময়টায় নারী শিক্ষার কথা ভাবতে পারত না অনেকে। নারীদের আবার পড়ালেখা করার দরকার কি এমন একটা মানসিকতা, আর কোনো মেয়ে সাইন্স পড়বে, বিজ্ঞানী হবে এরকম স্বপ্ন কজন দেখতে পারত তা বলাই বাহুল্য।

ড. ইয়াসমিন হক সেই সময় পার করে আসা মানুষ। আজকের দিনে তার সাফল্য নিশ্চিতভাবেই অসংখ্য নারীকে অনুপ্রাণিত করবে। কোনো পরিবর্তন আনার জন্যে বয়স, লিঙ্গ, দেশ, ধর্ম কোনো কিছুই বাধা হতে পারে না। মানুষ চাইলে গোটা দুনিয়া তাক লাগিয়ে দিতে পারে নিজের সেরা কাজটা দিয়ে, ড. ইয়াসমিন হক সেটাই করে দেখিয়েছেন।

ড. ইয়াসমিন হকের স্বামী ড. মুহম্মদ জাফর ইকবাল। জাফর ইকবালের বড় ভাই হুমায়ূন আহমেদ মৃত্যুবরণ করেছিলেন ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে। ক্যান্সার রোগটার বিস্তার ক্রমশঃ বাড়ছে এই শতাব্দীতে।

ড. ইয়াসমিন এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, "দেশে অসংখ্য মানুষ ক্যান্সারে মারা যাচ্ছে। বেশির ভাগ রোগীর ক্যান্সার শনাক্ত হয় রোগের শেষ পর্যায়ে। বর্তমানে ক্যান্সার শনাক্তে যে প্রচলিত পদ্ধতি রয়েছে সেটি বেশ ব্যয়বহুল। এ ছাড়া বিশ্বে এখন পর্যন্ত এমন কোনো পদ্ধতি আবিষ্কার হয়নি, যার মাধ্যমে আগে থেকেই ক্যান্সার শনাক্ত করা যায়। গবেষকদের সব সময়ই নতুন নতুন বিষয়ের প্রতি আগ্রহ থাকে। নিজেদের সম্পদ এবং সুযোগ-সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে কাজটি করতে চেয়েছিলাম। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবটি থাকায় কাজের সুবিধা হয়েছে।"


বাংলাদেশে কেন গবেষণা হয় না, কেন সবাই হুমড়ি খেয়ে বিসিএস দেয়, কেন সবাই পারে, আমরা পারি না ইত্যাদি ইত্যাদি হাহাকার প্রচলিত আছে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়ায়। কিন্তু, কজন ড. ইয়াসমিন হকের এই বৈপ্লবিক উদ্ভাবনটির কথা আগে থেকে জানতেন এবং কজন এই ইতিবাচক খবরটি ছড়িয়ে দিবেন? গবেষকদের সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা দেখানো উচিত আমাদের, তাদের কাজকে এপ্রিশিয়েট করা উচিত, তাদের অনুপ্রাণিত করা উচিত সবসময়।

আর উদ্ভাবন যখন এই লেভেলের গুরুত্বপূর্ণ হয়, এরকম যুগান্তকারী হয় তখন পুরো জাতি মিলে সেলিব্রেট করা উচিত এরকম কাজকে, গবেষক দলকে ট্রিবিউট দেয়া উচিত, সংবর্ধনা দেয়া উচিত বরং বিশাল করে। হবে কি এরকম কিছু? সোশ্যাল মিডিয়ায় ট্রেন্ডিং হবেন কি ড. ইয়াসমিন হক? কে জানে, কিন্তু আমাদের স্যালুট, আমাদের কৃতজ্ঞতা ম্যাম, আপনার প্রতি...