মনের অন্দরমহল

জেসন-মেরিন্ডা দম্পতির মানবতা বনাম আমাদের উগ্রপন্থী অপপ্রচার!

হাসনাত কালাম সুহান: বাংলাদেশের গ্রামে কাজ করতে যাওয়া মার্কিন ডাক্তার দম্পতিকে নিয়ে ইত্যাদিতে প্রতিবেদনের পর বিভিন্নমুখী আলোচনা হচ্ছে। কেউ নিজের বিদ্ধেষ দেখাতে, দেশের ডাক্তারদের পঁচিয়ে কিছু রাখছে না। কেউ বিদেশে সেটল করা বাংলাদেশীদের এই সুযোগে এক চোট গালমন্দ করছে! বিপ্লবী কেউ কেউ এই ডাক্তার দম্পতির পিছনে  মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী 'মানবিক অস্ত্রের' লক্ষণ ঠাওর করে ষড়যন্ত্র-থিওরি দিয়ে ফেলছে।

কিন্তু সবচে' ভয়ানক প্রচারণা হচ্ছে, উনাদের খ্রিস্টান মিশনারী হিসেবে আখ্যা দিয়ে- লোকজনকে খ্রিস্টান বানানোর মিশন নিয়ে আসছে এই প্রচারণাটা। এটাই বেশী মানুষ খাচ্ছে। এরা মিশনারি হিসেবে আসছেন কিনা এটা ইত্যাদির সাক্ষাতকারে ক্লিয়ার না। কেননা  প্রয়াত ডাঃ এড্রিক বেকারের প্রতি সম্মান জানাইতেই বাংলাদেশে গিয়েছেন, এটা স্পষ্ট! 

এই মার্কিন দেশের প্রচুর ছেলেমেয়ে মোটা বেতনের চাকুরি, গাড়ি বাড়ির নিশ্চিন্ত জীবন ছেড়ে আফ্রিকার প্রত্যন্ত গ্রামে গিয়ে সোলার প্যানেল বানায়, বতসোয়ানাতে গিয়ে চিকিৎসা দেয়, ইন্ডিয়ায় গিয়ে ইংরেজি শেখায়। এদের অনেকেই কোন মিশনারীই না। বেশীরভাগই ধর্ম-কর্ম করেনই না।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি নিয়ে কাজ করা ব্রিটিশ নাগরিক ভ্যালরি টেইলর যেমন একজন ভলান্টিয়ার। কোন ধর্মীয় মিশনে থেকে গোটা জীবন বাংলাদেশে শেষ করে দেন নাই উনি! সম্পূর্ণ জীবনবোধ থেকে করেছেন। 

আর এই জেসন-মেরিন্ডা দম্পতি এই দুনিয়ার সবচে' ল্যাভিশ দেশের  সবচে' ব্যায়বহুল, প্রতিযোগিতাময় ১২ বছুরে ডাক্তারি ডিগ্রী নিয়ে বাংলাদেশের গ্রামে গিয়ে মিশনারীগিরি করলেও আসলে; আমাদের এপ্রিশিয়েটই করা উচিত। কাউকে তো মেরে-কেটে করে খ্রিস্টান বানাইচ্ছেন না তারা। 

কিন্তু ইত্যাদিতে এই প্রতিবেদনের পর এই আমেরিকান ডাক্তার দম্পতির জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যাবে। পেইজগুলোতে যেভাবে প্রচার হচ্ছে, এই প্রসংগে মনে পড়ছে, ভারতে কুষ্ঠ রোগীদের সেবা দেয়া গ্রাহাম স্টেইনসের কথা। তার দুই ফুটফুটে বাচ্চাসহ গাড়িতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল ১৯৯৯ সালে, উড়িষ্যা রাজ্যে। 

ভারতে কুষ্ঠ রোগীদের পরিবার ব্রাত্য করে দিত কিংবা জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলতো। গ্রাহাম স্টেইনস তাদের এক ছোট মাটির ঘরের হাসপাতালে চিকিৎসা দিতেন। সারা উড়িষ্যার জুড়ে গাড়ি নিয়ে কুষ্ঠ রোগী খুজতেন। তারপর কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা তার বিরুদ্ধে স্থানীয় পত্রিকায় লিখতে থাকে। এক রাতে নিজের দুই বাচ্চা ছেলেসহ উনাকে গাড়িতে পুড়িয়ে মেরে ফেলা হয়।

সারাবিশ্বে এই খবর চাউড় হয়। অথচ উনার যে ম্যানেজার বাবুলাল, সে নিজেই সাক্ষাতকার দিয়ে বলে- গ্রাহাম স্টেইনের হাতে তিনি নিজেই খ্রিস্টান হয় নাই। বরং হিন্দুই রয়ে গেছেন। কুষ্ঠ রোগ ১০ বছর আগে সেরে গেলেও  লোকজনের ভয়ে মন্দিরে যেতে পারেন না। তাই গ্রাহাম স্টেইন তাকে অনেক দূরে মন্দিরে অবধি পৌঁছে দিতেন।

গ্রাহাম স্টেইনসকে যারা পুড়িয়ে মেরেছিল, সেই হিন্দুত্ববাদীদের কয়েকজনের জেল হয়েছিল। কিন্তু মূল হোতাদের একজনকে নরেন্দ্র মোদী এবার মন্ত্রী বানিয়েছে। তার নাম প্রতাপ সারেংগী। 

অস্ট্রেলিয়ান চিকিৎসক গ্রাহাম স্টেইনসকে দুই পূত্রসহ পুড়িয়ে মারা নিয়ে এবছর একটা মুভিও রিলিজ হয়েছে বিশ্বজুড়ে। ভারতে যদিও ছবিটা নিষিদ্ধ করেছিল মোদী সরকার। পরে ইন্ডিয়ায় অনুমতি মিলেছিল কিনা শিউর না।  মুভিটার নামঃ The Least of These: The Graham Staines stories. ইন্টারনেটে পাওয়া যায়। 

এই হিন্দুত্ববাদী হত্যাকান্ডের  প্রতিবাদে হিন্দু ধর্ম পরিবর্তন করা কবির সুমনের একটা গানও আছে বিখ্যাত- 'আমি সংখ্যালঘুর দলে'। বাংলাদেশে যাওয়া মার্কিন ডাক্তার জেসন আর মেরিন্ডার জীবন যাতে সহী-ছালামতে থাকে এই প্রত্যাশাই করি।

আপাতদৃষ্টিতে দুনিয়ার সবচে' লোভনীয়- ঐশ্বর্য সম্ভাবী জীবন ছেড়ে তৃতীয় বিশ্বের  কাদামাখা, পানাপুকুর-শেওলাগন্ধী এক গ্রামে যিনি যেতে পেরেছেন;- স্ত্রী সন্তানসহ। তার ধর্ম, মিশন, কোয়ালিফিকেশন;- যাই হউক না কেন- তার 'জীবনবোধ' নিয়ে কথা বলবার কোন যোগ্যতা আসলেই আমাদের নাই।