ইনসাইড বাংলাদেশ

সেই পারভেজ, এই পারভেজ

ছয় মাস আগের কথা। পারভেজ তখন অন ডিউটিতে। বরাবরের মতোই সেদিনও পারভেজের জীবনে সকাল এসেছিল নতুন উদ্যমে। কাজ পাগল মানুষ তিনি। ডিউটিতে গেলেন, নিজের কাজ করতে থাকলেন পুলিশ কন্সটেবল পারভেজ। তার ডিউটি ছিল মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায়। কিন্তু দিনটা অন্যদিনের মতো নির্বিঘ্নে শেষ হলো না। পারভেজের জীবনে ঘোর অমানিশা নেমে এলো।


যে দিনটার কথা বলছি, সেদিন ক্যালেন্ডারের পাতায় তারিখ ছিল ২৭মে। পারভেজ হয়ত এই দিনটাকেই কালো দিবস হিসেবে মনে রাখবেন আজীবন। কারণ, স্বপ্নবাজ এই মানুষটার জীবনে এক মারাত্মক ঝড় যে এলো এদিন। ঢাকা চট্টগ্রাম হাইওয়েতে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় এক বেপরোয়া গতির কাভার্ড ভ্যান ধাক্কা দিলো পারভেজকে। গুরুতর আহত হন পারভেজ, হাতে ও ডান পায়ে গভীর আঘাত তিনি৷


এবার আরো আগের কথা বলি। দুই বছর আগের কথা। হয়ত আপনারও পারভেজকে মনে পড়ে যাবে।

সেদিন ছিল ২০১৭ সালের ৭ জুলাই। সেই ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক।ওইদিন কুমিল্লার দাউদকান্দির গৌরীপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় চাঁদপুরগামী একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ডোবায় পড়ে যায়। মানুষের চিতকার, বাঁচার আকুতি। কিন্তু কে ডোবায় নেমে তাদের সাহায্য করবে? লোকজন তো উল্টো এরকম অবস্থায় মোবাইল বের করে লাইভে চলে যায়, ছবি তুলতে ব্যস্ত হয়ে যায়।

সেদিন পারভেজ দুঃসাহসী কাজটাই করলেন। দাউদকান্দি হাইওয়ে থানার পুলিশ কন্সটেবল পারভেজ নেমে গেলেন ডোবায়। ময়লা পানির ডোবায় লাফিয়ে নেমে তিনি একাই বাস দূর্ঘটনার কবলে পড়া ২৫ জনকে জীবিত উদ্ধার করেন।


বাসটি যে ডোবায় পড়েছিল, তা ছিল ময়লায় ভর্তি, পচা গন্ধের। দুর্ঘটনার সময় বিকট শব্দ শুনে অনেকে সেখানে এলেও শুরুতে পানিতে নামার সাহস দেখাননি অনেকেই। পারভেজ মিয়া লাফিয়ে নেমে পড়েন। হাতে ইট নিয়ে প্রথমে বাসটির জানালার কাচ ভাঙেন। এরপর ভেতরে আটকে পড়া যাত্রীদের উদ্ধার শুরু করেন।

পারভেজের পরনে তখনো পুলিশের ইউনিফর্ম। যে ইউনিফর্ম দেখলেই কত লোকে চোখ কুঁচকে তাকায়, ভাবে পুলিশ মানেই ঘুষ, ধামকি, হয়রানি৷ পারভেজ সেই ধারণাটাকে বদলাতে নিজের জায়গা থেকে প্রায় জীবনটাই যেন বাজি রাখলেন।

দুর্ঘটনার শিকার সেই বাসের যাত্রী মতলব দক্ষিণ উপজেলার বিউটি আক্তার বলেন, "বাসটি পানিতে পড়ে যাওয়ার পর মনে হয়েছে এই বুঝি শেষ। বাঁচতে পারব না। ঠিক সেই মুহূর্তে পুলিশ কনস্টেবল আমাদের উদ্ধার করেন। তাঁর কথা জীবনেও ভুলতে পারব না।"

এই অসীম সাহসিকতার জন্যে পারভেজকে পুলিশের সর্বোচ্চ পদক 'বাংলাদেশ পুলিশ মেডেল' দেয়া হয়। সাথে নগদ অর্থ পুরস্কার ও মোটরসাইকেলও দেয়া হয় তাকে। পারভেজ খুব স্বপ্নবাজ মানুষ। পদক পাওয়ার পর তিনি বলেছিলেন, "আমার স্বপ্ন এখন ইন্সপেক্টর হওয়া"।

হায়! সেই পারভেজ যিনি একা সড়ক দূর্ঘটনায় আহত মানুষগুলোকে নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁচালেন, তাকেই কিনা পড়তে হলো বেপরোয়া গতির কাভার্ড ভ্যানের তলায়। ভাগ্য কতটা নির্মম জানেন?

পারভেজের চিকিৎসায় মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। চিকিৎসকরা জানান, জীবন বাঁচাতে চাইলে কেটে ফেলতে হবে পারভেজের পা! এবং সত্যিই পারভেজের পা কেটে ফেলা হয়। হাঁটুর নিচ থেকে পারভেজের ডান পাটা এখন কাটা, যে পায়ে তিনি দুই বছর আগে লাফিয়ে ডোবায় পড়া বাসের ২৫ জন মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিলেন।


পারভেজের দিন এখন কেমন যায়? এখনো কি তিনি স্বপ্ন দেখেন? নাকি বুক ভেঙ্গে কান্না আসে তার? কেউ রেখেছে সেই খোঁজ? এদেশে পুলিশের যা ভাবমূর্তি তাতে পারভেজের মতো মানুষদের খুব দরকার ছিল। পারভেজ 'সামান্য' একজন কন্সটেবল ছিলেন, কিন্তু কর্তব্যপরায়ণতায় তিনি হয়ত অনেকের চাইতে এগিয়ে। এমন একজন মানুষ এখন নিশ্চল হয়ে বসে আছেন, ভাবতেই কেমন হতাশা লাগে।

আচ্ছা, পারভেজের এই সময়ে তাকে সাহস দিতে পারি না আমরা? বলতে পারি না সোশ্যাল মিডিয়ায়, প্রিয় পারভেজ আপনার এই দুঃসময়ে আপনি একা নন, ভেঙ্গে পড়বেন না প্লিজ, আপনি আমাদের হিরো, আপনি হেরে যাবেন না প্লিজ, আমরা আপনার পাশে আছি। বলতে পারি আমরা?