ইনসাইড বাংলাদেশ

"এই দৃশ্য দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না আমার"

ফেসবুকে সিসিটিভির ফুটেজটা দেখেছিলাম দুইদিন আগে। স্তব্ধ হয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় ছিল না, হয়েছিলাম বাকরুদ্ধও। ওয়াশরুমে একজন মহিলা সম্ভবত একটি ফুটফুটে বাচ্চা শিশুকে গোসল করাচ্ছিলেন। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে এই মহিলা খুব ভয়ংকর ক্ষীপ্ত ছিলেন। শিশুটিকে তিনি যেন সহ্য করতে পারছেন না।

শিশুটির গায়ে প্রবল আক্রোশে আঘাত করতে দেখা যাচ্ছিলো তাকে, এরপর দেখা গেল আরো ভয়ংকর দৃশ্য। তিনি শিশুটিকে বাথরুম থেকে ছুঁড়ে মারলেন বাইরে। মানুষ ময়লা যেভাবে ছুঁড়ে মারে কিংবা প্রবল আক্রোশে মোবাইল ভাঙ্গার উদ্দেশ্যে যেভাবে ছুঁড়ে মারে তিনি সেভাবে নির্দয়ের মতো বাচ্চাটাকে ছুঁড়ে মারেন।

তারপরেও থেমে যান নি৷ ছুঁড়ে মারার পর বাচ্চাটাকে এলোপাথাড়ি লাত্থি মারা শুরু করলেন। ফুটবলে যেমন মানুষ লাত্থি মারে, তিনি বাচ্চাটাকে কিছুক্ষণের জন্যে সেরকম ভাবে আঘাত করতে থাকলেন।

এই ফুটেজ দেখার পর নিশ্চিত ছিলাম না আসলে কি হচ্ছিলো সেখানে, কেনই বা এই মহিলা এভাবে বর্বর আচরণ করছিলেন। ফুটেজটা যখন দেখছিলাম, তখন এই নারীর পরিচয় সম্পর্কেও জানতে পারি নি কিছু। কেবল একটা কথাই ভাবছিলাম, একজন নারী কি করে এমন করতে পারেন! প্রত্যেকটা নারীর মধ্যেই তো একজন মা বিরাজ করেন, সহজাত মমত্ববোধ থাকে তাদের মনে শিশুদের প্রতি। কিন্তু এই নারীর ভেতরে এই হিংস্রতার জন্ম কি করে হলো?

আমি ভাবছিলাম, আচ্ছা শিশুটির দোষ কি? এই মানবসন্তানকে এভাবে আছাড় দেয়া হলো, তাকে ফুটবলের মতো লাত্থানো হলো, তীব্র আক্রোশে তাকে মারা হলো- কিন্তু আমাদের মতো এই শিশুটিও হয়ত জানে না, কেন তার প্রতি এমন নির্দয়তা। শিশুটির মনোজগতে এই ঘটনা কি রকম প্রতিক্রিয়া ফেলবে তা ভাবলেই আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়। এই ঘটনায় তার মনে যে ভয় ঢুকে গেছে, এই ভয় শিশুটিকে তাড়িয়ে বেড়াবে হয়ত জনমভর।

অবশেষে সংবাদমাধ্যমের বদৌলতে জানতে পারলাম, যিনি শিশুটিকে এভাবে মারলেন, তিনি সেই বাড়ির গৃহকর্মী। বাবা মা দুজন জীবনের তাগিদে জীবিকার অন্বেষণ করছেন, দুজনই চাকরি করছেন। শিশুটিকে দেখভাল করার জন্যে ছিলেন সেই গৃহকর্মী। বাড়িতে সিসিটিভি লাগানো ছিল। বাবা অফিসে বসে দেখলেন এই দৃশ্য, তিনি দেখতে পেলেন, যার কাছে বিশ্বাস করে বাচ্চাটাকে রেখে গেছেন, সেই বিশ্বাসী মানুষটাই এমন প্রাণঘাতী আচরণ করলো তার বাচ্চাটার প্রতি।

ঘটনাটি রাজধানীর শাহাজানপুরে। বাচ্চাটির পিতার নাম মোহাম্মদ আলআমিন সরকার যিনি একজন ইঞ্জিনিয়ার। মা লুতফুন্নাহার উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। তাদের একমাত্র সন্তান, দুই বছরের আদরের সন্তানের নাম আবদুল্লাহ আয়াত।

এই ব্যস্ততম শহরে আজকের দিনে অনেক পরিবারেই বাবা মা দুইজনকেই জীবিকার তাগিদে ছুটতে হয়। একই সাথে সন্তানের কথাও তাদের মাথায় রাখতে হয় প্রতিনিয়ত। সন্তানের দেখাশোনার জন্যে নির্ভরযোগ্য কাউকে পাওয়া বেশ কঠিন। তাই এই দম্পতি বাড়িতে একজন গৃহকর্মীকে রেখেছিলেন, গৃহকর্মী শাহিদা আবার একেবারেই অপরিচিত কেউ নন। তাদের আত্মীয় বলয়েরই মানুষ ওই নারী। তাকে বিশ্বাসযোগ্যও মনে করেছিলেন, দেখে মনে হয়েছে শাহিদা পরহেজগার এবং কোমল মনের অধিকারী।

কিন্তু কে জানতো, এই নারীর কাছেই সন্তান এভাবে নির্যাতিত হবে?

শিশুটির পিতা আল আমিন সরকার বলেন,
"আমি একজন অসহায় বাবা, যাকে দেখতে হয়েছে ২ বছরের সন্তানকে বীভৎস মারের দৃশ্য! এই নির্যাতনের দৃশ্য দেখেও কিছু করতে না পারার আক্ষেপে পুড়ছি আমি। দেখা ছাড়া কিছু করার ছিল না আমার।"

এই ঘটনায় অনেকেই বাবা মাকে দোষ দিচ্ছেন। এই কাঁদা ছোঁড়াছুড়ি আমাদের মূল সমস্যাটা নিয়ে ভাবতে দেয় না। বাংলাদেশে শিশু সুরক্ষার জন্যে অভিজ্ঞ গৃহকর্মী, ট্রেইনিং প্রাপ্ত গৃহকর্মীর অনেক অভাব। অভাব আছে চাইল্ড কেয়ার সেন্টারেরও যেখানে শিশুদের যত্ন সহকারে দেখভাল করা হয় দিনজুড়ে। এই জায়গাগুলো নিয়ে কথা বলা উচিত। আর বাবা মায়েদের এই জায়গাটা নিশ্চিত করা উচিত, যার কাছে সন্তানকে রেখে যাচ্ছেন সে মানুষটা কতটা নির্ভরযোগ্য, কিংবা সেই মানুষটা কেমন মানসিকতার অধিকারী এসব দিক ভাবার দরকার।

আপনারা সেই দম্পতিকে যারা তিরস্কার করছেন, তারা দুইজনই কেন চাকরি করে, টাকার লোভ ইত্যাদি ইত্যাদি বলে সেই দম্পত্তির উপরেই মানসিক নির্যাতন চালাচ্ছেন অনলাইনে তারা কি সেই বাবা মায়ের কষ্টের জায়গাটাও একটু উপলব্ধি করতে চেষ্টা করছেন? আপনি আমি ভিডিওটা দেখে যতটা কষ্ট পেয়েছি, সেই বাবা মা নিশ্চয়ই আমাদের চেয়ে একটু হলেও বেশি কষ্ট পেয়েছেন। কোন বাবা মা সহ্য কর‍তে পারবে এভাবে নিজের সন্তানকে নির্যাতিত হতে দেখে? তারাও মানসিকভাবে দুর্বিষহ অবস্থায় আছেন, এটাও আমাদের উপলব্ধি করা উচিত।

বাচ্চাটার বাবার কথাতেই স্পষ্ট, কতটা মানসিক আঘাত পেয়েছেন তিনি। তিনি বলেন, "সেদিন বাসায় ফিরে আমার সন্তানকে জড়িয়ে ধরেছি, কোলে তুলে নিয়েছি, অনেক আদর করেছি। কিন্তু অন্য দিনের মতো চিৎকার করে 'বাবা' 'বাবা' করে নাই। বাচ্চাটা আমার মার আর লাথির ভয়ে এতটাই ভীত হয়ে পড়েছিল যে, 'বাবা' বলতে যেন ভুলেই গিয়েছিল! আমি এই ঘটনার বিচার চাই। সেইসঙ্গে আমাদের মতো দম্পতিরা যেন সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে সচেতন হয়।"

আমরাও বিচার চাই, সুরক্ষা চাই৷ এই শহরে সবার স্বপ্ন বাঁচুক, কলিজার টুকরাগুলোও নিরাপদে থাকুক। আমরাও চাই, সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে বাবা মায়েরা আরো সচেতন হোক। আমরা চাই, মানুষের মন যেন কোমল হয়, মানুষ যেন মানুষের প্রতি আরো সহনশীল উদার হয়, মানুষের হৃদয় যেন আরো ভালবাসায় পূর্ণ হয়। কেউ যেন ওই গৃহকর্মীর মতো মানসিকভাবে বিকৃত না হয়ে যায়....