রিডিং রুম

মাওলানা ভাসানী কি আসলেই শ্রদ্ধার পাত্র?

নিঝুম মজুমদার: মাওলানা ভাসানী অনেকের কাছেই শ্রদ্ধার আর নানা কারনেই তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের সাথে নানাভাবে রয়েছেন। এতে করে তার ভক্তরা খানিকটা হাইপার হয়ে থাকেন। এসব ভক্তদের কথা ভেবে এই লেখায় মাওলানাকে নিয়ে আমি কড়া ভাষায় মন্তব্য করছি না। (নীচে শুধু এক যায়গায় বাছুর শব্দটি মেটাফোর হিসেবে ব্যবহার করেছি। হাইপার ভক্তরা সে শব্দ এক্সপাঞ্জ করে নিতে পারেন)

কিন্তু কিছু কথা আজকে অনুপমের (অনুপম দেবাশীষ রায়) পোস্টে আলোচনা হবার পর উঠে এলো ফলে মনে হচ্ছে আমার ভাবনাটা এখানে লিখে রাখা প্রয়োজন।

মাওলানা ভাসানী প্রাক মুক্তিযুদ্ধ পর্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য কিংবা পাকিস্তানী মিলিটারী শাসন আমলে আসলে কি কি করেছেন সেসব বয়ানেও আমি যাচ্ছিনা কেননা পোস্ট মুক্তিযুদ্ধে পর্বে মাওলানার দু"টি ভূমিকার কথা আমি তথ্য ও প্রমাণ সহ জানবার পর তার প্রতি আমার সামান্যতম শ্রদ্ধা আর নেই এবং তার অতীত ভূমিকা আমাকে আসলে আগ্রহী করে তোলে না।

যাই হোক। দুটি বিষয়ের প্রথমটি হলো মুক্তিযুদ্ধের পর দালাল আইনে যখন রাজাকার-আলবদরদের বিচার শুরু হোলো ৭২ সালে, (দালাল আইন-৭২ নামে পরিচিত) তখন এই আইনের বিরোধিতা করে জল ঘোলা করেছিলো মাওলানা ভাসানী। 

শুধু বিরোধীতা করেই মাওলানা ক্ষান্ত হন নি, বরং এই বিচার বন্ধে তিনি আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন এবং ৭৩ এর নির্বাচনের প্রাক্কালে ন্যাপের মেনিফেস্টোতে এই বিচার বন্ধ করবেন বলে আবার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছিলেন।

অনুপমের সাথে আলোচনায়, মাওলানার পক্ষে বেনিফিট অফ ডাউট দিয়ে একটা প্রসঙ্গ উঠেছিলো এমন যে, একজন মানুষ ডিউ প্রসিজিওর এর দূর্বলতা বা না মানা, তদন্ত দলের দূর্বলতা কিংবা আইনের নানাবিধ লুপ-হোল-কে কেন্দ্র করে একটি বিচারের সমালোচনা করতে-ই পারেন এবং এটি সেই ব্যক্তির নাগরিক অধিকার বটে।

আমরা এই যুক্তিকে যদি আমাদের বোর্ডে নেই এবং ইতিহাসের সলুক সন্ধান করি তাহলে দেখতে পাব ৭২ এর পর পর শুরুর দিকে মাওলানা এই দালাল আইনে বিচার নিয়ে একটা উচ্চ-বাচ্য করেন নি। তার দলের মধ্যে থাকা রাজাকার ( অভিযোগ ওঠে) মশিউর রহমান যাদুমিয়া কিংবা শ্রমিক নেতা হামিদুল হক কে দালাল আইনে গ্রেফতারের পর পর মাওলানা দাবী তোলা শুরু করেছিলো যে এই বিচারের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীদের হয়রানী করা হচ্ছে। 

ঠিক যেমনটি সাম্প্রতিক সময়ের আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের ক্ষেত্রে জামাতীরা বলেছিলো যে এই বিচার রাজনৈতিক প্রহসন মাত্র।   ঠিক একই সুরে মাওলানা তখন মাতম করেছিলেন এবং এই বিচারের বিরুদ্ধে ছিলো তার স্পস্ট অবস্থান।

যাদু মিয়ার বিচার শেষ হতে পারেনি কিংবা বিচার হতে পারেনি হামিদুল হকেরও।

এই বিচারের বিরুদ্ধে বলতে গিয়ে মাওলানা বা তার দল এই বিচারের আইন নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন উঠান নি, বিচারের ক্ষেত্রে কোনো স্ট্যান্ডার্ডের কমতি রয়েছে কিনা সেটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন নি, ইনভেস্টিগেশনের কাজ নিয়ে বা সেটির প্রেক্ষিতে প্রসিজিওরাল কোনো কনসার্ণ ব্যাক্ত করেন নি। শুধু গড়-পড়তা আজকের জামাতীদের বলে গেছেন এই বিচার বাতিল কর, করতে হবে। অনেকটা বকনা বাছুরের মতন। ডাক ছাড়ছে তো ছাড়ছেই, কেন ছাড়ছে জানেনা। (বকনা বাছুর শুনে ভাসানীর হাইপার ভক্তরা রেগে যাবেন না। উদাহরন হিসেবে বাছুর বলেছি। আসলে ভাসানী মানুষ ছিলেন)

দালাল আইনে মাওলানার এই অবস্থা আমার বিবেচনায় ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। অন্যদের ভিন্ন মত থাকতে পারে। আমি তা শ্রদ্ধা করি কিন্তু আমি আমার অবস্থান বলে গেলাম।

এইবার আসি মাওলানার আরেকটি ভয়াবহ ভূমিকা নিয়ে। ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুরো পরিবার সহ খুন হবার পর মাওলানা এই খুনী কর্ণেল ফারুক-ডালিম-রশিদদের এই ঘৃণ্য কর্মকান্ডকে বাহবা দিয়েছিলো এবং খুনী মোশতাকের সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলো।

আমার এই বক্তব্যের প্রেক্ষিতে আমি এই লেখাতেই ডকুমেন্ট দিয়ে দিলাম। আপনারা দেখে নিতে পারেন।

জাতির পিতার এই মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের পর মাওলানার ভূমিকা ঘৃণ্য এবং শুধু এই ঘটনাটির কারনেই মাওলানাকে আমি খারিজ করে দেই।

অনুপমের সাথে আজকে এই বিষয়ে আলাপ হচ্ছিলো বলেই আমার মনে হলো ফেসবুকে আমার এইভাবনাকে টুকে রাখি ডকুমেন্ট সহ। এই প্রজন্মের যারা এই ব্যাপার সম্পর্কে জানেন না, তাঁরাও জেনে নিলেন।

অনেকেই আমার দিকে আঙ্গুল তাক করে বলতে পারেন, মাওলানা ভাসানীকে নিয়ে এই জাতীয় কথা বলাটা এক ধরনের স্পর্ধা এবং আমার বলা উচিৎ না। এসব কথা যদি আমার এই পোস্টে ওঠে, আমি শুরুতেই বলব, যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনায় ছোট বা বড় বলে কিছু নেই। যিনি জানবেন, যার কাছে এভিডেন্স রয়েছে, তথ্য-উপাত্ত রয়েছে তিনি তাঁর আর্গুমেন্ট করবেন। 

আমিও জানতে চাই মাওলানার ভক্তদের কাছে যে, যেই ব্যাক্তি রাজাকারদের বিচার বন্ধে এতবড় ভূমিকা রেখেছিলো ৭২ সালে এবং যিনি বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারীদের সরাসরি সমর্থন দিয়েছিলেন, সেই ব্যাক্তি কেন শ্রদ্ধেয় বা কেন আমাদের ইতিহাসে গৌরবময় ভূমিকায় থেকে যাবেন?