মনের অন্দরমহল

একজন অজয় রায় ও এক বুক হতাশার হাহাকার!

ডঃ অভিজিৎ রায়কে পৈশাচিকভাবে মেরে ফেলার পর থেকেই মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়েছিলেন বাবা ডঃ অজয় রায়। কিন্তু তবুও হাল ছাড়েননি, সন্তান হত্যার বিচার চেয়ে গেছেন দিনের পর দিন। কিন্তু নানা অসুখ তাকে ভালো থাকতে দিলো না। আগে থেকেই ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত ছিলেন। একইসঙ্গে তিনি ফুসফুসের সমস্যাজনিত রোগেও ভুগছিলেন অনেক দিন থেকেই। তার ব্রংকাইটিস, সিওপিডি ছিল। জ্বর আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে ২৫ তারিখ বারডেমে ভর্তি হন তিনি, নিউমোনিয়ার সমস্যাও খুঁজে পেয়েছেন ডাক্তারেরা। আইসিইউতে আপাতত কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাসে রাখা হয়েছে তাকে। 

এই মানুষটা আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পদার্থবিজ্ঞানী ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির উপদেষ্টা। মুক্তিযুদ্ধের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত অজয় রায় কুমিল্লার সোনামুড়া বর্ডারে যুদ্ধের ট্রেনিং গ্রহণ করেন এবং একাধিক অপারেশনে অংশগ্রহণ করেন। তিনি পরবর্তীকালে আগরতলা হয়ে কলকাতায় গমন করেন । সেখানে তিনি মুজিবনগর সরকারের পরিকল্পনা সেলের সাম্মানিক সদস্য হিসবে নিয়োজিত ছিলেন। 

ব্যাক্তিজীবনে অসম্ভব সৎ ও নির্বিরোধী মানুষটার জীবনটা এলোমেলো হয়ে যায় ২০১৫ সালের ২৬শে ফেব্রুয়ারি। অভিশপ্ত ওই দিনটায় মানুষটা হারান তার সন্তানকে, যে সন্তান চাইলেই বিদেশের মাটিতে নিরাপদে থাকতে পারতেন, কোন আশংকা ছাড়াই। তবুও অভিজিৎ উগ্র ধর্মান্ধ জঙ্গীদের শত হুমকি আর ভয় উপেক্ষা করে অমার্জনীয় দুঃসাহসে দেশে ফিরেছিলেন একুশের বইমেলায় অংশ নেবার জন্য। স্বজন হারানোর ব্যাথায় আজ যে সিদ্ধান্তকে আমাদের মনে হয় নিদারুণ ভুল, কেন ফিরে আসলো মানুষটা, না আসলেই তো বেঁচে থাকতো, দুনিয়ার যেপ্রান্তেই থাকতো, ভালো থাকতো! তবে মানুষটা যে ছিলেন তার বাবার মতই অসমসাহসী, জন্মভূমিকে ভালোবাসার মাশুল দিতে গিয়ে হারিয়ে গেলেন চিরতরে! এই উগ্র ধর্মান্ধ কাপুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ তাকে উপহার দিলো সন্তান হারাবার এক বুক হতাশ হাহাকার। 

আর তার প্রিয় বাবাকে রেখে গেলেন জীবন্মৃত করে! অভিজিৎ'দার মৃত্যুর পর থেকেই যতবার সন্তান হারাবার শোকে তিলে তিলে শেষ হয়ে  যেতে থাকা অজয় রায়কে দেখেছি, ততবার প্রবল এক অপরাধবোধ আর অন্তহীন বেদনা একনিমিষে শূন্য করে দিয়েছে ভেতরটা। অভিজিৎকে হারিয়ে আমরা হয়তো আলো হাতে চলতে থাকা আধারের এক যাত্রীকে হারিয়েছি, কুসংকার ও ধর্মান্ধতার নির্মূল করে বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ তৈরির বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। 

কিন্তু সন্তান হারানো অজয় রায়ের চওড়া বুক জুড়ে থাকা অকল্পনীয় হাহাকারের কাছে তা যে কিছুই নয়! এই মানুষটার দিকে তাকালে আমার বাবাকে দেখি। অজয় রায়ের জায়গায় থাকতে পারতেন তিনিও, এমনকি এখনো পারেন... হুট করে কোন একদিন!  সন্তানকে আচমকা হারিয়ে ফেলার পর বিশাল এক শূন্যতায় ডুবে যাওয়া এলোমেলো জীবন্মৃত এক মানুষ, ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছেন একটু একটু করে! 

ফিরে আসুন অজয় রায়, যে প্রবল সাহসে এতোদিন লড়ে গেলেন দাঁতে দাঁত চেপে, সেই প্রবলতম মানসিক জোরে আর সাহসে ভর দিয়ে আমাদের অনুপ্রেরণা হয়ে আরেকবার ফিরে আসুন। অভিজিৎদা'র হত্যার বিচার শুরু হয়েছে, যেকোন মুল্যে বিচারটা পেতে হবে, ন্যায়বিচার না নিয়ে আমরা ফিরছি না। এই নিকষ কালো অন্ধকার পথে সংখ্যাগরিষ্ঠ উগ্র ধর্মান্ধ শকুনদের ভিড়ে আলো হাতে আমাদের যুদ্ধের যে এখনো অনেকটাই বাকি...

ছবি কৃতজ্ঞতা- Asm Shariful Hassan