সিনেমা হলের গলি

আজ রবিবার - স্মৃতি হাতড়ে খোঁজা আমাদের এক নস্টালজিয়া

'অধিক কথা বলার স্বার্থকতা নাই। মতি মিয়া অধিক কথা পছন্দ করে না।' - সংলাপটি মনে পড়ে? আজ রবিবার নাটকে মতি মিয়া চরিত্রের মুখের এই সংলাপ আজও অমলিন। অধিক কথা মতি মিয়া পছন্দ না করলেও মতি মিয়াকে ঠিকই পছন্দ করে ফেলেছিল আপামর জনসাধারণ। সেই ভালো লাগা আজও কেটে যায় নি, যেমন ভাললাগা এখনো কাটে নি আজ রবিবারের নাটকটার প্রতি৷

নব্বুই দশকের কর্মব্যস্ত দিনগুলো, মানুষ ঘরে ফেরে। ঘরে একটা টেলিভিশনের সেট। বোকাবাক্সটাকে মধ্যমণি করে লোকে পরিবার সহ আয়োজন করে বসে পড়ে টিভির সামনে। সন্ধ্যাগুলোতে তারা একসাথে সময় কাটায়, টিভির পর্দায় নাট্যকারের চরিত্ররা হাসে, আর এপাশে এক ঘর ভর্তি হয় গোটা পরিবারের ঝলমলে খুশিতে। নাট্যকার কাঁদায় গল্পের নাটকীয়তায়, লোকে অকারণে চোখের জল ফেলে। সে এক অদ্ভুত সময়।

এই সময়টায় বিটিভি স্বর্ণালী সময় পার করেছে। করবে না-ই বা কেন? বাংলা কথাসাহিত্যের রাজপুত্র হুমায়ূন আহমেদ যে সেইদিনগুলোতে টেলিভিশনেও নিজের জাদুর হাতের পরশ ছোঁয়াতে শুরু করেছিলেন। নির্মল সুস্থ বিনোদনের চাহিদা তো মানুষের আজন্ম আকাঙ্খা। একাত্তর পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের অবিসংবাদিত সম্রাট হুমায়ূনের হাত ধরে সেই সুস্থ বিনোদনের অভাব ঘুচে যেতে শুরু করেছে। একের পর এক ধারাবাহিক নাটক দিয়ে টিভি মাত করছেন রাজপুত্র।


১৯৯৬ সাল এমনই এক সময়, যখন বিটিভির পর্দায় এসেছে নতুন এক ধারাবাহিক 'আজ রবিবার'। হুমায়ূন আহমেদের নতুন নাটক মানেই সাজ সাজ রব পড়ে যেত, শোরগোল জমে যেত চারদিকে। মানুষ সেই সময় অলরেডি হুমায়ূন আহমেদের নাটক দেখে রাস্তায় নেমেছে৷ বাকের ভাইয়ের ফাঁসি ঠেকাতে আন্দোলন করেছে। বুঝতেই পারছেন, কি রকম হাইপ তৈরি হতো তখন নাটককে ঘিরে।

আর ততদিনে বোধহয় হুমায়ূন আহমেদের কিছু সমালোচক জুটে গিয়েছিল যারা তাকে 'বাজারি লেখক', 'স্বস্তা লেখক', 'যার লেখা জীবনবোধ নেই' ইত্যাদি টাইপ কথা দিয়ে তাচ্ছিল্যে খারিজ করে দিতে চাইতো৷ আমার ধারণা হয়ত সেকারণে এই নাটকটার ইন্ট্রোটাতে হুমায়ূন আহমেদ একটু খোঁচা দিয়েছিলেন। কি খোঁচা সেটা বলছি একটু পরেই।

এই নাটকটি যদি আগে কেউ না দেখে থাকেন তাহলে বলি, এই নাটকটিতে অভিনয় করেছিলেন হুমায়ূন আহমেদ কন্যা শীলাও। কঙ্কা চরিত্রে অভিনয় করেন তিনি। যদি শীলার অভিনয় দেখার অভিজ্ঞতা কারো এখনো না হয়ে থাকে, তাহলে বলি শীলার মতো সাবলীল অভিনেত্রী খুব কমই পেয়েছে বাংলাদেশ (ব্যক্তিগত মতামত)। শীলা পরে কেন অভিনয়টা আর কন্টিনিউ করলেন না, তা এক আশ্চর্য বটে, বিশেষত যখন ইউটিউবে পুরানো নাটকে শীলার অভিনয় দেখা হয়, তখন খুব রাগ এবং আফসোস হয়, তিনি আরো কিছু নাটকে যদি কাজ করে যেতেন...


আজ রবিবার নাটকটার শুরুই হয় শীলার কণ্ঠে পরিচয়পর্ব দিয়ে। শীলা উপস্থাপকের মতো করে ইন্ট্রো শুরু করেছেন এভাবে, "কিছুক্ষণের মধ্যে আমাদের ধারাবাহিক নাটক আজ রবিবার শুরু হতে যাচ্ছে। সাধারণত নাটকে অনেক শিক্ষামূলক ব্যাপার থাকে। এ নাটক হুমায়ূন আহমেদের লেখা বলে এখানে এসব কিছু নেই। আমি নাটকের পাত্রপাত্রীদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিচ্ছি..."। ধরতে পেরেছেন, হুমায়ূন আহমেদ ন্যাশনাল টেলিভিশনে কি অপূর্ব মহিমায় 'হেটার'দের একটা সূক্ষ্ম খোঁচা দিয়েছেন!

'আজ রবিবার' নাটকের সবচেয়ে দুর্দান্ত দিক হলো, সংলাপ, চরিত্র নির্মাণ। হুমায়ূন আহমেদ প্রত্যেকটি চরিত্রকে এতোটা স্বতন্ত্র গুণাবলি দিয়ে চরিত্রায়ন করেছেন যে, আলাদা করে আপনি প্রত্যেকটা চরিত্রকে বুঝতে পারবেন, গল্পের সাথে সাথে আপনিও প্রবেশ করবেন চরিত্রের গভীরে, মিশে যাবেন তাদের জগতে।

এই যেমন এই নাটকে আমার প্রিয় চরিত্র মতি মিয়া। মতি মিয়া বাড়ির গৃহকর্মী ফুলীর সাথে প্রেম করে বেড়ায় কিন্তু আবার হুট হাট রুপ বদলিয়ে ফেলে। নাটকের শুরুর দিকে মতি ফুলীকে বলছে,

-ফুলি আইজ তো তোমারে বড়ই সৌন্দর্য লাগতেসে।
-এক কথা রোজ কন ( ফুলী হেসে বলে)
-সত্য কথা দিনের মধ্যে চৌদ্দ বার বলা যায়। সত্য কথার এই হইলো নিয়ম..

সেই মতি মিয়া আবার কলতলায় ফুলীর সাথে রাগ দেখিয়ে বলে,

'তোর কাছে বহনের আমার ঠেকা পড়সে'
এই তুই তুকারি করেন ক্যান?


মতি মিয়া তখন জবাব দেয়, আমার ইচ্ছা, মতি মিয়া নিজের ইচ্ছায় চলে, অন্যের ইচ্ছায় চলে না। এই মতি মিয়া চরিত্রে অভিনয় করেন হুমায়ূন আহমেদের এক মারাত্মক আবিষ্কার ফারুক আহমেদ।

আজ রবিবার নাটকের আরেকটি চরিত্র আনিস, মোটা চশমা ছাড়া যার পৃথিবী অচল। একটু বাচ্চা বাচ্চা স্বরে কথা বলে সে। সারাক্ষণ ডাকাডাকি করে তিতলি ভাইয়া, তিতলি ভাইয়া বলে। ডুবে থাকে বইয়ে মধ্যে। ভারী ভারী থিউরি তার কাছে ইন্টেরেস্টিং মনে হয়। আনিসের একটা সংলাপ শুনে বেশ মজা লেগেছে নাটকে। তিতলিকে সে চশমা ছাড়া চিনতে পারছে না। তিতলি অনুযোগ করে বলে, আমার কন্ঠও কি আপনি চিনেন না? নার্ড আনিস বলে, আমার কাছে তো সব মেয়ের কণ্ঠই একরকম লাগে। চিকন কণ্ঠ। এই কথা শুনে তিতলি রাগ করে চলে যায়। বোকা আনিস ধরতে পারে না, কেন তিতলি চলে গেল৷ সে তখন বলে, "আশ্চর্য, মেয়েটা এতো রেগে গেল কেন?"

আনিস চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন জাহিদ হাসান। মাঝে মধ্যে মনে হয়, জাহিদ হাসানের অভিনয় দক্ষতাকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোধহয় হুমায়ূন আহমেদই ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। আর তিতলি চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন গুণী অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওন। এই নাটকটিকে নিজের ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট ভাবেন মেহের আফরোজ শাওন, এই নাটকই যে বদলে দিয়েছিল তাকে।


দীপু নাম্বার টু'র সেই ক্লাস টিচারের কথা মনে আছে না? তার আসল নাম আবুল খায়ের। তিনিই ১৯৭১ এ বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ভিডিও রেকর্ড করেন, যার জন্যে আমরা আজও সেই অমর ভাষণ শুনতে পাই। এই মানুষটা এক জাত অভিনেতা, যিনি 'আজ রবিবার' নাটকে দাদা চরিত্রে অভিনয় করেন। নাটকে দেখানো একান্নবর্তী পরিবারের যিনি হেড। দাদা চরিত্রটির কাজই হলো উপদেশ দিয়ে বেড়ানো। কেন জানি না, অভিনেয়া আবুল খায়েরকে পর্দায় দেখলেই আমার মন ভাল হয়ে যায়। তার বাচনভঙ্গি, অভিনয় কোনোবারই আমাকে নিরাশ করে না।

আজ রবিবার নাটক দেখার একটা বিপদ আছে। এই নাটক দেখার পরে দীর্ঘশ্বাস কেবলই দীর্ঘ হয়। আজকাল কমেডি নাটকের নামে কাতুকাতু দিয়ে হাসানোর চেষ্টা চলে, এক নাটকের অসংখ্য সিকুয়েল করে তেতো বানিয়ে ফেলা হয়, দর্শক হাঁসফাঁস করতে থাকে এসব দেখে। অথচ, নাটক মানে কি, কিভাবে মানুষকে হিউমার দিয়ে হাসাতে হয়, কিভাবে চরিত্র নির্মাণ করতে হয়, কিভাবে গল্প বলতে হয় তা 'আজ রবিবার' দেখলে বোঝা যায়। এখনকার টেলিভিশনের সাইজ বড় হয়েছে ইঞ্চিতে, চ্যানেল বেড়েছে সংখ্যায় কিন্তু নাটকের কোয়ালিটি বাড়ে নি সেভাবে। তাই 'আজ রবিবার' দেখার পর এখনকার নাটক দেখলে কেবলই হাহাকার জাগে।

আজ রবিবারে যেমন আলী জাকের যিনি আসগর চরিত্রটিতে অভিনয় করেন, তার অভিনয়ও অনেকদিন চোখে লেগে থাকবে। পিউর হিউমার বলতে যা বোঝায় তা এই নাটকে তিনি এতো নিপুনতায় দেখিয়েছেন, আহা! উদ্ভট সব কাজকারবার ছিল তার। নাটকে তিনি বড় চাচা। তার কাজকর্মের দিকে মতি মিয়ার ঝোঁক থাকত। মতি মিয়া উঁকি ঝুঁকি মারার চেষ্টা করতো বড় চাচার ঘরে। তখন আলী জাকের মতি মিয়াকে হাতেনাতে ধরে যা করতেন সেও এক মনে রাখার মতো ইতিহাস।


এই নাটকটার প্রত্যেকটা চরিত্র নিয়েই আলাদা আলাদা করে লেখা যায় একেকটা আর্টিক্যাল। একটা নাটক এতো পরিপূর্ণ কিভাবে হয়, তা ভাবতে গেলে খুব নস্টালজিক হয়ে পড়ি। আমি একান্নবর্তী পরিবারে বেড়ে ওঠা মানুষ। মানুষে গমগম করত আমাদের বাড়ি। তাই এই নাটক যতবারই দেখি অনেক পেছনে চলে যাই স্মৃতির গাড়ি চড়ে। আহারে সেইসব সোনাঝরা দিন, নানান রঙে রাঙানো দিনগুলো...

এই নাটকে আরেকটি লক্ষ্যণীয় দিক হলো, গানের ব্যবহার। হাসন রাজার বেশ কিছু গান এই নাটকে শুনানো হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদ কোনো এক জায়গায় বলেছিলেন, এই নাটকটি তৈরির পেছনে অন্যতম উদ্দেশ্য হলো হাসন রাজার গান মানুষকে শোনানো। ১৯৯৬ সালে হাসন রাজাকে চিনত বা তার গান শুনতো নিয়মিত এমন হয়ত খুব বেশি পাওয়া যাবে না।

আজ রবিবার খুব দীর্ঘ কলেবরের ধারাবাহিক নয়। এই দৈর্ঘ্যের নাটক এখন প্রতি ঈদে টিভি চ্যানেল ঘুরে। ৫/৭ পর্বের এসব নাটকের গল্পে গল্প খুঁজে পেতে কষ্ট হয়। আঞ্চলিক ভাষার নামে জগাখিচুড়ি পাকাতে দেখি৷ অভিনেতাদের গলায় সংলাপ শুনে মনে হয়, নাট্যকারের সংলাপ না তারা ক্যামেরার সামনে নিজেরা নিজেদের সংলাপ বানান, সংলাপে হিউমার নেই, মুগ্ধতা নেই, কি যেন অভাব। কেমন যেন আগ্রহ ধরে রাখা মুশকিল হয়ে যায়।

আজকের দিনে অবশ্য অপশনও অনেক। বিদেশী টানটান গল্পের টিভি সিরিজ বের হয়, আমাদের কাছে ইউটিউব নামক ফ্রি কন্টেন্টের এক বিশাল দুনিয়া আছে। নেটফ্লিক্স আছে। তবুও কখনো কখনো নিজের রুটে ফিরে যেতে ইচ্ছে হয়। শিকড়ের সন্ধ্যান করে মন। তখন কিছুই আর ভালো লাগে না, ফিরে যাই 'আজ রবিবার' ধরণের নাটকে। স্মৃতি হাতড়াই, ভাবি আহারে জীবনটা কি অদ্ভুত রকমের সুন্দর ছিল, নাহ!

এখন আর একান্নবর্তী পরিবার তেমন নেই৷ ভাঙ্গছে পৃথিবী, ভাঙ্গছে ঘর, ভাঙ্গছে মন। মানুষ অনেক প্রাইভেসি বোঝে, আবার একাকীত্ব ভোগাটাও এখনকার রোজকার অভ্যাস। এমন দিনে হয়ত ঘরময় খিলখিল করে গোটা পরিবারশুদ্ধ কেউ হাসবে না, একসাথে ভাসবে না আনন্দে। সন্ধ্যাগুলো হয়ে উঠবে আরো ব্যক্তিগত। তবুও কিছু দিন বা কিছু রোববারে মনে পড়বে, 'আজ রবিবার' হ্যা আজ রবিবার!