ছোটবেলা থেকেই কোনোকিছুকে বিদ্রুপ করতে বলা হতো 'মেড ইন ধোলাইখাল।' সেই ধোলাইখাল আর জিনজিরাতে এখন তৈরী হচ্ছে বিশ্বমানের পণ্য। বিদেশ থেকে মানুষ এসে অবাক হচ্ছে এখানকার শ্রমিকদের কর্মনৈপুণ্য দেখে। কী এমন হলো যে রাতারাতি বদলে গেলো এলাকা দুটি?

বাজার থেকে কোনো পণ্য কেনার কয়েকদিন পরেই সে পণ্য বিকল হয়ে গেলে, মনে মনে পণ্যটিকে 'মেড ইন ধোলাইখাল' বলে শাপশাপান্ত করা ছিলো আমাদের জীবনে খুব স্বাভাবিক একটি ঘটনা। অথবা কারো মোবাইল, ল্যাপটপ, গাড়ি অথবা বাইক চুরি হলেই আমরা ধরে নিতাম, এবার ধোলাইখালে বা জিনজিরায় গিয়ে পার্টসগুলো খুলে খুলে চোরাই মার্কেটে বিক্রি করা হবে। এভাবেই নানা কাজে, নানা বিশেষণে, সময়ের ব্যবধানে বুড়িগঙ্গার দুই পাশের দুই এলাকা নিয়ে আমাদের মাঝে তৈরী হয়েছে ঋণাত্মক কিছু ধারনা। এসব এলাকায় যা পাওয়া যায় বা যা তৈরী হয়, তা সবই সস্তা, এখানের কোনোকিছুই খুব বেশিদিন টেকে না, এখানের সবকিছুই চোরাই মাল... আমাদের একটা ভয়ানক 'মিথ'ও তৈরী হয়ে গিয়েছিলো এই এলাকা দুটিকে নিয়ে। কিন্তু এখন কী অবস্থা এলাকাদুটির? কেমন আছে সেখানকার ব্যবসা-শিল্প?

সাতচল্লিশের ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর, অবাঙ্গালী কিছু ব্যবসায়ীর মাধ্যমে হালকা প্রকৌশলশিল্পের যাত্রা শুরু হয়েছিলো এই দুই এলাকার। একাত্তরের পরে অবাঙ্গালীরা দেশ ছেড়ে যাওয়ার পরে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা হাল ধরেন এই ব্যবসার। তবে প্রথম দিকে তারা খুব একটা 'কোয়ালিটি প্রোডাক্ট' বানাতে পারতেন না। যা বানাতেন, তা অনেকটাই নকল আর সস্তা হয়ে যেতো। তখনই 'ধোলাইখাল' আর 'জিনজিরা'র পন্যের অ-স্থায়ীত্ব নিয়ে চটুল রসিকতা তৈরী হয়েছিলো। এলাকা দুটির নামের সাথেই যেন দীর্ঘস্থায়ীভাবে গেড়ে বসেছিলো এই রসিকতাগুলো।

তবে কালের পরিক্রমায় চেপে এই সময়ে এসে আমরা দেখি বিশাল পরিবর্তন। কী না বানানো হয় এখানে? কৃষিপণ্য, তৈরি পোশাক থেকে শুরু করে গাড়ি, লোহালক্কড় এর জিনিসপত্রও তৈরী হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় নানা সামগ্রিও তৈরী হয় এখানে। বাসে হকাররা উঠে ব্রাশ, পিঠ চুলকানোর লাঠি, টুথপিক, খেলনা... যেসব জিনিস বিক্রি করেন, তার অধিকাংশই তৈরী হয় এই দুই এলাকায়। তাছাড়া বিভিন্ন মেশিনের জন্যে আগে যে বিদেশমুখিতা ছিলো, সেটাও কমিয়ে এনেছেন এখানের কারিগরেরা। পুরানের দেবতা বিশ্বকর্মার মতন  নিজেরাই বানাচ্ছেন প্রয়োজনীয় সব উপকরণ, যন্ত্র, মেশিন৷ নিজেদের প্রয়োজনমত মেশিন বানানোর পাশাপাশি ফরমায়েশ মত নানা মেশিন বানিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছেন তারা দেশের আনাচেকানাচেও। এখানের কারিগরেরা এমন সব পণ্য বানাচ্ছেন, যেসব পণ্য সম্পর্কে জানার জন্যে বিদেশ থেকেও মানুষ আসেন সময়ে-অসময়ে। যে মেশিন বিদেশ থেকে আনতে আট-নয় লাখ টাকা খরচ হয়, সে মেশিন তারা দেশেই এক দেড় লাখ টাকায় বানিয়ে দিচ্ছেন চোখের পলকেই। তাছাড়া জাপান- চীন থেকে যেসব মেশিন আনা দরকার, সেগুলোও তারা একেবারে ন্যূনতম মূল্যে বানিয়ে দিচ্ছেন দেশে বসে। এভাবে দেশের টাকা দেশেই রাখার ব্যবস্থা করছেন তারা। এভাবে তারা সাশ্রয়ও করছেন দেশের টাকা।

ধোলাইখালে ঢুকলে এই দোকানগুলো আপনার প্রথমেই চোখে পড়বে! 

এটুকু পড়ে হয়তো অনেকেই ভাবছেন, এখানের শ্রমিকেরা হয়তো অনেক দক্ষ। অনেক শিক্ষিত। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, মোটেও তা না। এখানের অধিকাংশ শ্রমিকই অশিক্ষিত। তবে তাদেরকে কোনো একটা মডেল দেখালে, হুবহু সেই মডেল বানাতে সক্ষম তারা। দেখে দেখে অনেক কিছুই শিখে নিয়েছেন তারা। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা হয়তো নেই। তবে কারিগরি-জ্ঞান পেয়েছেন তারা কাজ করতে করতেই। যে কারনেই কোনো কিছু তাদের আর অসাধ্য না এখন। তারা বানাতে পারছেন সব। বিদেশিরা যখন জিনজিরা আর ধোলাইখাল ঘুরতে আসে, অল্প সময়ে বড় বড় জাহাজ বানাতে দেখে তারা পুরোপুরি চমকে যায়। বিশ্বাসই করতে পারে না, এত অল্প পুঁজিতে এত ভালো কাজও সম্ভব!

বুড়িগঙ্গার তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে অজস্র কলকারখানা! 

তবে এখানের মানুষের কিছু আক্ষেপও আছে। সরকার এখানের হালকা প্রকৌশলশিল্পের পেছনে অতটা ব্যাকআপ দিচ্ছেন না এখনও। আশির দশকে একবার বিসিক (বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন) এখানের মানুষের জন্যে কিছু প্রকল্প নিয়েছিলো। সেসময়ে বেশ উন্নয়নও হয়েছিলো এই দুই এলাকার। এরপর আর কোনো পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি এই দুই স্থানের প্রকৌশলশিল্প নিয়ে। যেটা এখন খুবই দরকারি বলে মনে করছেন, এই এলাকা দুটির শ্রমিক, ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীরা। তবে আশার ব্যাপার হচ্ছে, বিশ্বব্যাংক কাজ শুরু করেছে জিনজিরা- ধোলাইখাল এর বানিজ্য সম্ভাবনা নিয়ে। এই দুই এলাকায় পর্যাপ্ত অর্থসহায়তা ও সাথে একটা বিজনেস মডেল তৈরী করে ফেললে, কী যে সম্ভাবনাময় এক খাত হবে এই এলাকা দুটি, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। জিনজিরা ও ধোলাইখালকে ঠিকঠাক নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে এই দুই এলাকা 'হীরের খনি'র মতই এক বিগ্রহ লাভ করতে পারে সময়ের ব্যবধানে। বিশেষজ্ঞরা সেটাই জানাচ্ছেন।

আর যেভাবে এই দুই এলাকা এগোচ্ছে, খুব তাড়াতাড়ির মধ্যে যে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে যাবে তারা, তা বলাই বাহুল্য। একসময়ের নিন্দিত দুই এলাকার 'নন্দিত' হতে খুব বেশি দেরি নেই বোধহয়!

সে সময়ের অপেক্ষায়...

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা