স্বপ্ন দেখা এবং এর কারণ ও মানে খোঁজা নিয়ে মানুষের অপরিসীম আগ্রহ। 'কেন স্বপ্ন দেখি' তার ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা করছে মানুষ বহু আগে থেকেই। কিন্তু চূড়ান্ত কোন সমাধানে কেউ যেতে পেরেছে কি?

বাংলাদেশের প্রায় ঘরেই 'সোলেমানী খাবনামা' (খোয়াব বা খাব মানে স্বপ্ন) জাতীয় বই একটা করে থাকে, অন্তত মফস্বলে তো থাকেই! আর রাস্তায় 'কি স্বপ্ন দেখিলে কি হয়' জাতীয় বই ১০ টাকায় কেনার লোকের অভাব নেই! 'খোয়াবনামা' নামে একটা বিখ্যাত উপন্যাসও আছে, যাকে অনেক সাহিত্য সমঝদার লোকে মনে করেন বাংলা ভাষায় লেখা অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস! কাজেই বোঝা যাচ্ছে স্বপ্ন দেখা এবং এর কারণ ও মানে খোঁজা নিয়ে মানুষের অপরিসীম আগ্রহ।

কিন্তু জানেন কি, মানুষের এই আগ্রহ কতটা পুরোনো? বলা যায় সভ্যতার সমান বয়স তার! যীশু খ্রীস্টের জন্মের প্রায় তিন হাজার বছর, অর্থাৎ এখন থেকে প্রায় ৫ হাজার বছর আগেই মেসোপটেমিয়ায় (বর্তমান ইরাক) ছিল এক উন্নত সভ্যতা (তখনকার কন্টেক্সটে)। সেখানকার রাজারা প্রথম শুরু করেন এক প্রথা– স্বপ্নকে লিখে রাখা। আর লেখার উপকরন মানেই পাথর। তারা পাথরের চওড়া পাতে তাদের স্বপ্নের কথা খোদাই করে লিখে রাখতেন।

এর প্রায় হাজার বছর পর মিশরীয়রা প্রথম শুরু করে স্বপ্নের বই লেখার কাজ যেখানে স্বপ্ন ও ব্যাখ্যা তালিকাভুক্ত থাকত। নবী যোসেফ অর্থাৎ, হযরত ইউসুফ(আ) এর স্বপ্নের ব্যাখ্যা আর মিশরের রাজা হওয়ার কাহিনী নিশ্চয়ই জানেন। সেই সময়কার কথাই বলছি। সেই থেকে শুরু, আজ পর্যন্ত থামেনি 'কেন স্বপ্ন দেখি' তার ব্যাখ্যা খোঁজার চেষ্টা।

কিন্তু একক ফাইনাল কোন সমাধানে কেউ যেতে পেরেছে কি? এমনকি আধুনিক যুগের বিজ্ঞানের অসাধারণ উন্নতির পরেও কেউ আজ পর্যন্ত কোন নির্দিষ্ট উত্তর দেয়নি। তবে আমরা পেয়েছি কিছু ইন্টারেস্টিং থিওরী!

স্বপ্ন দেখা হলো- ইচ্ছেপূরণ

গত শতাব্দীর শুরুর দিকে, বিশ্ববিখ্যাত মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েড থিওরী দেন, আমরা যেসব স্বপ্ন ও দুঃস্বপ্ন দেখি তা আসলে আমাদের সারাদিনের সচেতন মনে সংগৃহীত হওয়া ছবির সমাহার। সেগুলোর প্রতীকী অর্থও আছে, যেগুলো আমাদের অবচেতন মনের ইচ্ছেগুলোর সাথে সম্পর্কিত। ফ্রয়েড বলেন যে ঘুম থেকে উঠে আমাদের যেসব স্বপ্নের কথা মনে পড়ে তা আসলে আমাদের অবচেতন মনের তাগিদ, ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষার প্রতীকী উপস্থাপন। আমরা প্রতিনিয়ত যেসব আবেগ অনুভুতি দমন করি সেগুলোর প্রকাশের একটি মাধ্যম হলো স্বপ্ন।

স্বপ্ন আমাদের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়

কিছু কিছু মানসিক ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য ঘুম খুব ভাল, কিন্তু ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখা আরো ভালো! এক রিসার্চে দেখা গেছে যারা কোন একটা জিনিস নিয়ে শুধু ভেবেছে, তাদের চেয়ে যারা কোন কিছু স্বপ্নে দেখেছে তারা ব্যাপারটা ভাল বুঝতে পারে। যেকোন জিনিস ঘুমের ভেতর স্বপ্নে জটিল গোলকধাঁধার মধ্য দিয়ে উপস্থাপিত হলে ভালোভাবে উপলব্ধি করা যায়। গবেষকরা দেখেছেন যে মানুষের মস্তিষ্কে কিছু কিছু স্মরণ প্রক্রিয়া স্বপ্ন দেখার মাধ্যমে ঘটে। তার মানে স্বপ্ন দেখা হচ্ছে সেই সময় মাথায় সেই প্রক্রিয়াটা ঘটছে।

আমরা ভুলে যেতে স্বপ্ন দেখি

মানুষের মাথায় ১০ হাজার ট্রিলিয়ন (১ ট্রিলিয়ন=১০০ বিলিয়ন) নিউরনসংযোগ আছে। সেগুলো তৈরি হয়েছে মানুষের সব কাজ ও চিন্তার ফলাফল হিসেবে। ১৯৮৩ সালের এক নিউরো-বায়োজলিক্যাল থিওরী বলে যে স্বপ্ন দেখা হল “রিভার্স লারনিং”। এই থিওরী বলে যে গভীর ঘুমের সময় মানুষের মস্তিষ্ক নিউরাল সংযোগ গুলোকে রিভিউ করে এবং অদরকারীগুলোকে বাদ দিয়ে দেয়। মানুষের যে স্বপ্নদেখা তা এই প্রক্রিয়ার ফলাফল। এই প্রক্রিয়া ছাড়া মস্তিষ্ক অদরকারী জিনিসের চাপে ভরে যাবে এবং ক্ষতিকর চিন্তা দরকারী চিন্তাকে খেয়ে ফেলবে।

আমরা প্রতিনিয়ত যেসব আবেগ অনুভুতি দমন করি, সেগুলোর প্রকাশের একটি মাধ্যম হলো স্বপ্ন

স্বপ্ন দেখা মস্তিষ্ককে সচল রাখে

মানুষের মস্তিষ্ককে ঠিকমত সচল রাখতে প্রয়োজন নিয়মিত দীর্ঘমেয়াদী স্মৃতি তৈরি করা আর সেগুলোকে রক্ষা করা। তাই যখন বাইরের প্রভাব কমে যায়, অর্থাৎ গভীর ঘুমের সময়, তখন মানুষের মস্তিষ্কের জমানো ডাটাগুলো নিয়ে নাড়াচাড়া শুরু করে, যা আমাদের কাছে চিন্তা ও অনুভূতি হিসেবে ধরা দেয়। আর এই প্রক্রিয়ার ফলে আমরা স্বপ্ন দেখি। অনেকটা কম্পিউটারের স্ক্রিনসেভারের মতো যাতে সবসময় কোনো না কোনো ছবি চলতে থাকে যেন মস্তিষ্ক কখনো পুরোপুরি বন্ধ না হয়।

অনুশীলন থিওরী

স্বপ্নে অনেক বিপদজনক বা ভয় জাগানিয়া দৃশ্য দেখা যায়। এটা সব মানুষের ক্ষেত্রেই কমন। “প্রিমিটিভ ইন্সটিঙ্কট রিহার্সাল থিওরী অনুযায়ী এই ধরণের স্বপ্ন, যেগুলোতে আমরা নানান প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হই সেগুলো আসলে আমাদের সেই আদিম “ফাইটিং স্পিরিট” এর অনুশীলন মাত্র। যাতে আমরা এই স্পিরিট ধরে রাখতে পারি এবং বাস্তব জীবনে যখন প্রয়োজন, তখন কাজে লাগাতে পারি। যেমন বলা যায়, কোন সুন্দরী নারীকে নিয়ে স্বপ্ন দেখা আমাদের প্রজননক্ষমতার একরকম অনুশীলন।

স্বপ্নের নিরাময় ক্ষমতা

গভীর ঘুমের সময় মস্তিষ্কের “স্ট্রেস নিউরোট্রান্সমিটার” খুব কম এক্টিভ থাকে, এমনকি দুঃস্বপ্নের সময়ও। কিছু গবেষকের মতে স্বপ্নের একটি অন্যতম কাজ যন্ত্রণাকর অভিজ্ঞতার মুক্তি, এর মাধ্যমে স্বপ্ন দেখা শারীরিক নিরাময়ও ঘটায়। স্বপ্নে দেখা বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতাগুলোর পর্যালোচনা আরো পরিষ্কার  দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে সাহায্য করে,যার ফলে আমরা নতুন এবং আরো ভাল পথে আমাদের সমস্যাগুলোকে ডিল করতে পারি। কিছু গবেষকের মতে স্বপ্ন দেখার ঘাটতি মানুষের কিছু কিছু মানসিক সমস্যা যেমন মুড ডিসর্ডার বা PTSD ইত্যাদির কারণ হতে পারে।

স্বপ্নের মাধ্যমে সমস্যা সমাধান

স্বপ্নের জগত যুক্তির বাইরে, জাগতিক নিয়ম স্বপ্নকে আটকাতে পারে না। তাই আমরা স্বপ্নে আমাদের কিছু কিছু সমস্যার এমন কিছু সমাধান দেখতে পাই যা হয়ত আমরা বাস্তব জীবনে কখনোই আমলে নিতাম না। বিখ্যাত সাহিত্যিক জন স্টেইনবেক স্বপ্ন দেখাকে  তাই বলতেন “কমিটি অফ স্লিপ”। আর স্বপ্নের মাধ্যমে বেনজিন এর গঠন বা সেলাই মেশিনের আবিষ্কার এর কথা তো আমরা সবাই জানি। তাই মাঝে মাঝে চিন্তা ভাবনা ছেড়ে দিয়ে একটু ঘুমিয়ে নেয়াটাই কিছু সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বেস্ট ওয়ে হিসেবে কাজ করে। ভোটের সময় যেমন বলে “আর মাত্র দুই দিন, চিন্তা ভাবনা ছেড়ে দিন!” ...

উপরেরগুলো স্বপ্ন দেখা নিয়ে অসংখ্য থিওরীর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য থিওরীগুলোর কয়েকটি। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে আমরা মস্তিষ্ককে আরো ভালভাবে বুঝতে পারব, তখন হয়তো স্বপ্ন দেখার নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে বের করতে পারব। ততদিনে হয়তো কেটে যাবে কয়েক যুগ, সেদিন পর্যন্ত আসুন বিনা ভাবনায় স্বপ্ন দেখে যাই। আর উপায় কী!

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা