পরিস্থিতি তাকে বাধ্য করেছিলো সিরিয়ায় যেতে, আইসিস এর সম্মুখসারির জিহাদি হতে। সেখান থেকে তিন সন্তানদের নিয়ে তিনি যেভাবে ফিরলেন, সে গল্প আমাদের ভাবাবে ক্রমশ...

বেশ ক'বছর আগে 'The Reluctant Fundamentalist' সিনেমা দেখেছিলাম। সে সিনেমায় এক পাকিস্তানি যুবকের পরিস্থিতির চাপে 'জঙ্গী' হয়ে ওঠার গল্প ফুটে উঠেছিলো  পর্দায়। এরকম গল্প যে শুধু সিনেমাতেই হয়, এরকমটা না। বাস্তবেও এরকম ঘটনা প্রায়শই ঘটে আমাদের আশেপাশে। প্রায় প্রত্যেক সুস্থ মানুষই হয়তো স্বাভাবিক জীবন চান,  কিন্তু পরিস্থিতি কখনো কখনো উল্টোচাল চেলে দেয়। যেরকমটি আমরা লক্ষ্য করি তানিয়া জয়ার ক্ষেত্রেও। যার জন্ম ইংল্যান্ডে, হতে চেয়েছিলেন পাশ্চাত্য ভাবধারায় উদারমনস্ক এক মানুষ। কিন্তু যাকে সম্পৃক্ত হতে হয়েছিলো আইএস এর সাথে, তাদের জিহাদি সৈন্য হতে হয়েছিলো তাকে।  সিরিয়ার সেই খরস্রোতা সময় থেকে কীভাবে তিনি ফিরলেন, সে গল্পটি ক্রমশ অনিশ্চয়তার, শঙ্কার ও অনুপ্রেরণার।

উত্তর লন্ডনের বাঙ্গালি পরিবারে জন্ম নেওয়া তানিয়া ছোটবেলা থেকেই ছিলেন উদার মানসিকতার। কিন্তু পরিবার আবার একেবারেই উল্টো ঘরানার। পরিবার চাপ দিতেন 'ভালো মুসলিম মেয়ে' হিসেবে বড় হওয়ার জন্যে। বাইরে নামলে পর্দা করা, বন্ধুবান্ধবদের সাথে খুব বেশি মেলামেশা না করার কঠোর সতর্কতা থাকতো সবসময়ে। ক্রমাগত পারিবারিক অনুশাসনের রক্তচক্ষুর সামনে থেকে থেকে তানিয়া ছোটবেলা থেকেই গন্ডির মধ্যে বড় হচ্ছিলেন, সংকোচের দেয়াল গড়ে উঠছিলো সবখানেই। এছাড়াও  খুব কাছের এক প্রিয় আত্মীয় ছিলো তানিয়ার। সেই আত্মীয়ও এক সময়ে এসে কট্টর ইসলামপন্থী হয়ে যায়। এবং তিনি তানিয়াকে খেলাফত, ধর্মীয় বিভিন্ন বিধিনিষেধ নিয়ে প্রচুর পড়াশোনা করান। আস্তে আস্তে তানিয়া নিজেও 'মগজ ধোলাই' এর শিকার হতে থাকেন। ক্রমশ কট্টরপন্থী হয়েও যেতে থাকেন তিনি।

২০০৩ সালের মার্চে লন্ডনে ইরাক যুদ্ধবিরোধী একটি মিছিলে এক মার্কিন জিহাদি তরুণের সাথে তার পরিচয় হয়, যিনি সদ্য ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়েছেন। পরিচয় থেকে প্রেম, এরপর  সেই তরুণের সাথেই তানিয়ার বিয়ে হয়ে যায় একসময়ে এসে। বিয়ের পর তানিয়া স্বামীর সাথে আমেরিকা চলে যান। তানিয়ার স্বামী সারাদিন জিহাদ, সাম্প্রদায়িক বিষয় নিয়ে ব্যস্ত থাকতেন। ওদিকে তানিয়া আমেরিকার মুক্ত পরিবেশ পেয়ে আস্তে আস্তে আবার উদারপন্থী হয়ে উঠছিলেন। এরমধ্যে তানিয়া মা হন। জঙ্গী কার্যক্রম চালানোর সময়ে ধরা পড়ে তানিয়ার স্বামী কারাবন্দী হন। স্বামীর অনুপস্থিতিতে সন্তান নিয়ে তানিয়ার তখন প্রতিকূল সময়ে বেড়ে ওঠার গল্প শুরু।

দেখতে দেখতে তিন বছর কেটে যায়। স্বামী কারামুক্ত হলে আমেরিকা ছাড়েন তারা। মিশরে থাকেন কিছুদিন। এরপর ইস্তাম্বুলে পৌঁছান তারা। তবে তাদের পকেটের অবস্থা তখন খুব একটা ভালো না। ইস্তাম্বুলের ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার সাথে তাল মেলানো কষ্ট হয়ে যাচ্ছিলো। স্বামী প্রস্তাব দিলেন, সিরিয়ায় যাওয়ার। সেখানে কম খরচে থাকা যাবে, সেটাও বলেন তিনি। কিন্তু তানিয়া এ প্রস্তাবে রাজি হন না। তিনি জানতেন তার স্বামীর কাজকর্ম নিয়ে। তাছাড়া সিরিয়ার বিপজ্জনক পরিবেশ নিয়েও তার ধারণা ছিলো। সন্তানদের নিয়ে এরকম পরিবেশে যাওয়ার কোনো ইচ্ছেই তার ছিলোনা। কিন্তু স্বামীর চাপে পড়ে একসময়ে তাকে সম্মতি দিতে হয়।

সিরিয়ায় পৌঁছান তারা৷ সিরিয়ায় জীবনযাপন খুবই কষ্টের ছিলো। যে বাসায় তারা থাকতেন, সে বাসায় পানির ট্যাংক গুলিতে ঝাঁঝরা ছিলো। পানির কষ্ট, খাবারের কষ্টে ক্রমশ অসুস্থ হয়ে যেতে লাগলেন তানিয়া ও সন্তানেরা। এদিকে স্বামীর কোনো হেলদোল নেই। তিনি আইএস এর সাথে সম্পৃক্ত হয়ে একের পর এক অপারেশন করে যাচ্ছেন। পরিবারের অসুখ, কান্নাকাটি গায়েও মাখছেন না। এদিকে তানিয়া 'এফবিআই' এর সাথে যোগাযোগ করে তার দৈন্যদশার কথা জানিয়েছিলেন তাদের।

এটা জানতে পেরে তানিয়ার স্বামী তার উপর ক্ষুব্ধ হন। তানিয়াও এ পর্যায়ে এসে তীব্র প্রতিবাদ করেন। নেকাব ছাড়াই বাইরে নামতেন। এফবিআই এর সাথেও নিয়মিত যোগাযোগ করতেন। তানিয়া বারবার তার জিহাদি স্বামীকে বলছিলেন, যাতে করে তাদেরকে এখান থেকে বের করার ব্যবস্থা করে দেন তিনি। এক পর্যায়ে এসে এক মানবপাচারকারীর সাহায্যে সিরিয়া থেকে বের হওয়ার বন্দোবস্ত করা হয়। সে যাত্রাও তীব্র সংগ্রামের। বন্দুকের ভয়ে ত্রস্ত হয়ে, কাঁটাতার, গুহা পায়ে হেঁটে পার হয়ে, ট্রাকে করে মাইলের পর মাইল যেতে হয়। কিন্তু গল্প সেখানেও শেষ না। সেই মানবপাচারকারী তানিয়া ও তার সন্তানকে পথের মধ্যে ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। শেষমেশ এক ব্যক্তির সহায়তায় তারা গন্তব্যের রাস্তার সন্ধান পেলো।

এরপর আমেরিকায় ফেরেন তানিয়া জয়া৷ এখন পরিবারের সাথেই আছেন তিনি। নতুন বিয়ে করেছেন। সে সংসারে বেশ সুখেই আছেন তিনি। আমেরিকার চরমপন্থাবিরোধী সংস্থা ফেইথ ম্যাটার্সের সাথেও কাজ করছেন তিনি। আস্তে আস্তে কট্টরপন্থী মানসিকতার পরিবর্তন ঘটিয়েছেন। জানতে পেরেছেন, তার প্রাক্তন জিহাদি স্বামীও মারা গিয়েছেন কোনো এক যুদ্ধে। তানিয়া ছোটবেলায় যেরকম পরিবেশে, যেরকম মানসিকতার হতে চেয়েছিলেন, স্রষ্টা তাকে সেই সুযোগটি দিয়েছে। বলতে গেলে দ্বিতীয় একটি জীবনই পেয়েছেন তিনি। কিন্তু লেখার শেষে একটা প্রশ্ন মাথায় চলে আসা স্বাভাবিক, এরকম কত তানিয়া পড়ে আছে সিরিয়াতে, আইএস এর 'ব্রেইন-ওয়াশড' সাদা কাগজ হয়ে? এসব তানিয়ার মুক্তি কোথায়? কেউ কী তাদের কথা ভাবে কখনো? জন্মের পর থেকেই কেউ কী এরকম জিহাদি জীবন চায়? কিন্তু এরকম খেসারতের জীবন কেন মাঝেমধ্যে বেছে নিতে হয় মানুষকে?

এসব থেকে মুক্তি কোথায়?

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা