আমাদের অতিকায় ফ্রেন্ড লিস্টে যারা থাকেন, তাদের হয়তো ১০%-কে আমরা ব্যক্তিগতভাবে চিনি; বাকি ৯০%-কে আমরা চিনি না, দেখিনি, দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এই ৯০%-কে কেন আমরা আমাদের অতি-ব্যক্তিগত ছবি দেখাব, এ নিয়ে কিঞ্চিৎ ভাবা দরকার।

আখতারুজ্জামান আজাদজনাব জাকারবার্গ আমাদেরকে অসীম ক্ষমতা দিয়েছেন। তার উদ্ভাবিত ফেসবুকে যখন-যা-ইচ্ছে লেখা সম্ভব, যাচ্ছেতাই ছবি আপলোড করা সম্ভব। কিন্তু ছবি আপলোডের সময়ে অনেকেই চিন্তা করেন না এই ছবির উদ্দিষ্ট দর্শক কারা, দর্শক এই ছবি দেখতে চাচ্ছেন কি না, এই ছবি দেখে দর্শক বিরক্ত হচ্ছেন কি না, দর্শককে এই ছবি দেখতে বাধ্য করার অধিকার আমাদের আছে কি না। আমাদের অতিকায় ফ্রেন্ড লিস্টে যারা থাকেন, তাদের হয়তো ১০%-কে আমরা ব্যক্তিগতভাবে চিনি; বাকি ৯০%-কে আমরা চিনি না, দেখিনি, দেখা হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। এই ৯০%-কে কেন আমরা আমাদের অতি-ব্যক্তিগত ছবি দেখাব, এ নিয়ে কিঞ্চিৎ ভাবা দরকার। খাওয়ার ও খাবারের ছবি আপলোড এখন নৈমিত্তিক ব্যাপারে পরিণত হয়েছে। আজকাল সপ্তাহে অন্তত দু-একবার রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া অনেকেরই হয় এবং এই খাওয়াদাওয়ার ছবির তাণ্ডবে এখন ফেসবুকের নিউজফিডে পাঠযোগ্য কলাম-কবিতা-ছড়া আর খুঁজেই পাওয়া যায় না, চারিদিকে কেবল উদরপূর্তির উদ্বাহু-উৎকট উটকো-উদ্ভট ছবি। রেস্তোরাঁয় বসে কেউ-কেউ দিয়ে থাকেন খাওয়ার চার স্তরবিশিষ্ট ছবি— প্রথমে সদলবলে খেতে বসার ছবি, দ্বিতীয় স্তরে খাবার সামনে রেখে খাবারপূজা করার ছবি, পরে খাবারগ্রহণের ছবি, শেষে খাবারগ্রহণ-পরবর্তী ঢেকুর তোলার ছবি। কোনো-কোনো নাদান খাবারের মেনুর ছবি, ভেনুর ছবিও দিয়ে থাকেন; এমনকি চামচ-চেয়ার পেয়ালা-পিরিচ পর্যন্ত এই ছবিগর্দভদের ছবিনির্যাতন থেকে রেহাই পায় না।

খাদকদের ছবি কিছুটা সহ্য করা যায়, এরা আজকাল খাবারেরও তিনপর্বের ছবি আপলোড করে থাকেন। এরা প্রথমে তোলেন অক্ষত খাবারের ছবি, পরে আধ-খাওয়া খাবারের ছবি, শেষে থালায় পরিত্যক্ত ঝুটার ছবি! একেক আইটেমের ছবি একটি করে আপলোড করলেও চলে, কিন্তু এই ছবিখোরের দল একই পোজের এক ডজন ছবি আপলোড করে বসে, যেসব ছবির মধ্যে একটার সাথে আরেকটার দৃশ্যমান কোনো পার্থক্যই নেই। হাজার-হাজার মানুষকে যে ছবি আমরা দেখাব, সে ছবিতে ন্যূনতম একটা শিল্পমান থাকাটা জরুরি; সেই ছবিটা একটু গোছালো হতে হয়, আলোর উপস্থিতি ঠিকঠাক থাকতে হয়, ছবিতে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের শারীরিক অভিব্যক্তি একটু মার্জিত-পরিশীলিত হতে হয়। কিন্তু আলোচ্য ছবিয়ালদের আপলোডকৃত ছবির অধিকাংশই আবছা-ঝাপসা। আলো ঠিক নেই। একজনের পা দেখা যাচ্ছে, তো আরেকজনের হাত দেখা যাচ্ছে না; একজনের শারীরিক আকার এসেছে হাতির মতো, তো আরেকজনেরটা এসেছে ইঁদুরের মতো! ছবিতে উপস্থিতদের শারীরিক আকারে যে সামঞ্জস্যটুকু থাকা দরকার, সেই ছবি ছবির জাতভুক্ত হতে পারে না। রেস্তোরাঁয় খেতে গিয়ে আনন্দবশত দু-একটা ছবি আপলোড করা যেতেই পারে। অবশ্যই তা মানুষের ছবি; খাবারেরও না, চেয়ার-টেবিল-চামচেরও না, টাওয়েল-টিশু-টয়লেটেরও না। খাওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যে খাবারটা গুয়ে পরিণত হয়ে যায়; সেই খাবারের ছবি আপলোডের মাঝে কোনো বীরত্ব নেই, আছে একরাশ বিরক্তি। রেস্তোরাঁগুলো আজকাল মাগনা ওয়াইফাইয়ের ব্যবস্থা করেছে। মাগনা পেলে আমরা আলকাতরাও লুঙ্গি পেতে নিই। এই মাগনা ওয়াইফাই দিয়ে মাগনা ছবি আপলোড করে চেকইন মেরে এই খাদকরা যে তলে-তলে রেস্তোরাঁগুলোর মাগনা বিজ্ঞাপন করে দিচ্ছেন, খাদকরা তা জানেনই না।

Courtesy: vectorstock

কেবল রেস্তোরাঁ না, ভ্রমণে বা বিয়েবাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রেও ছবিতে-ছবিতে ফেসবুক সয়লাব করেন অনেকে। এমনও কেউ-কেউ আছেন— যারা ভ্রমণে যাওয়ার সময়ে বাসের ছবি, বাসের টিকেটের ছবি, লাগেজের ছবি আপলোড করেন; সিটে বসে সেলফি আপলোড করেন, যাত্রাপথের বিরতিতে রেস্তোরাঁয় নাশতা খাওয়ার ছবি থেকেও এই অসহায় ফেসবুকটা মাফ পায় না! ভ্রমণস্থলে পৌঁছার আগেই এই দশা; পৌঁছার পরে ছবির কী ডায়রিয়াটা নিউজ ফিডের ওপর দিয়ে বয়ে যায়, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। বিয়েবাড়িতে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে কত স্তরের ছবি আপলোড হয়, তা হিসাবের ঊর্ধ্বে। বিয়েতে কনে যত ছবি আপলোড করেন, এর চেয়ে বেশি করেন কনের সখিরা। সখি প্রথম ছবিটি আপলোড করেন পার্লারে গিয়ে, দ্বিতীয়টি পার্লার থেকে কমিউনিটি সেন্টারে যাওয়ার পথে, তৃতীয়টি সেন্টারে পৌঁছার পরে। এর পর কনের সাথে এবং বিয়েবাড়িতে উপস্থিত অন্যদের সাথে তোলা সখির ছবিতে ফেসবুকে আট মাত্রার ভূমিকম্প ঘটে।

রেস্তোরাঁয়, ভ্রমণে, বিয়েবাড়িতে কিংবা অন্য কোনো ব্যক্তিগত অনুষ্ঠানাদিতে যারা উপস্থিত থাকেন; সেখানে তোলা ছবিগুলো ইনবক্সে আলাদা একটি গ্রুপ খুলে বা শুধু তারা দেখতে পাবেন এমন প্রাইভেসি দিয়ে আপলোড করাটাই প্রত্যাশিত। এসব অতি-ব্যক্তিগত ছবি প্রাইভেসি সীমিত না করে আপলোড যদি করতেই হয়, তা হলে আপলোডকারীর উচিত ব্যক্তিজীবনে অপরিচিত কাউকে ফ্রেন্ড লিস্টে যুক্ত না করা। যাদের ন্যূনতম কাণ্ডজ্ঞান আছে; তারা রেস্তোরাঁর খাবারের ছবি, ভ্রমণের টিকেটের ছবি, বিয়ের মেকআপের ছবি, জুতা-ফিতা-ছাতার ছবি, নাক-কান-গলার ছবি, ক্ষেতে জন্মানো ফুলকপি-বাধাকপি-বেগুনের ছবি, ধূমপানের ছবি, বাড়ি-গাড়ি-শাড়ির ছবি ফেসবুকে কোনোভাবেই আপলোড করেন না। ফেসবুক এখন সৃষ্টিশীলতা প্রদর্শনের সহজতম ও জনপ্রিয়তম মাধ্যম। সমাজসংস্কার, এমনকি রাজনৈতিক পালাবদলও আজকাল এই ফেসবুকে ঘটে থাকে। মানুষ এখন উল্লিখিত উটকো ছবি দেখার জন্য ফেসবুকে আসে না; আসে বিশ্লেষণধর্মী লেখা পড়তে, খবরের আড়ালের খবর পড়তে, আলোকচিত্রীদের মার্জিত-সম্পাদিত-দৃষ্টিনন্দন ছবি দেখতে। কারো মচকানো-ভচকানো-কুঁচকানো, আবছা-ঝাপসা-অন্ধকারাচ্ছন্ন, আগামোটা-গোড়াচিকন ছবি দেখতে এখন আর কেউ ফেসবুকে আসে না। এসব ছবি নিজেদের মধ্যে আদানপ্রদানের জন্য ইনবক্সে-হোয়াটসঅ্যাপে-ভাইবারে আলাদা ব্যবস্থা আছে। ছবি আপলোডকালে চিন্তা করা উচিত ছবিটা ফ্রেন্ড লিস্টের প্রত্যেককে দেখানোর যোগ্য কি না।

প্রকাশ্যে দেখানোর মতো কিছু যাদের নেই, তারা খাওয়ার-যাওয়ার-নাওয়ার-শোয়ার ছবি আপলোড করে এক ধরনের পরিতৃপ্তি লাভের চেষ্টা করেন। এমনও অনেকে আছেন; যারা রেস্তোরাঁয় যান খেয়ে ক্ষুধা নিবারণের জন্য না, খাওয়ার দৃশ্যের ছবি তুলে প্রচার করতে। এদের কাছে খাওয়াটাই কৃতিত্ব, খাওয়ার ছবিপ্রচারই বীরত্ব। আমাদের প্রত্যেকেরই এই চরিত্রের বন্ধুবান্ধব আছেন; আমাদের উচিত এদের মানসিক সুস্থতা ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করা, সেলফি-রোগের টিকা দেওয়া। এদেরকে বোঝানো উচিত— ফেসবুকে দিনে দুটি ছবির বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা