চর এলাকার বাতিঘর নামে পরিচিত এই স্কুল হারিয়ে যাবার পর এই ছেলে মেয়েগুলোর কী হবে এখন? তারা কোথায় পাবে আরেকটা সাজানো গোছানো স্কুল?

পুরো ভবন নদীর বুকে বিলীন হয়ে যেতে ত্রিশ সেকেন্ড সময়ও লাগল না। এমনিই পদ্মার পানি বেড়ে যাওয়ায় কয়েক ফুট ডুবে গিয়েছিল স্কুলটি। হঠাৎ করেই দেখা গেল ভবন উল্টো দিকে হাঁটু ভাঁজ করে পড়ে যাবার মতো করে হেলে যাচ্ছে। পদ্মার পানিতে "শপ" করে যেন অসহায় আর্তনাদের ঢেউ তুলল তিনতলা রঙিন প্রাণহীন কাঠামো। তারপর তলিয়ে গেল মুহুর্তেই।

ছবির মতো সুন্দর বলতে যা বোঝায়, এই ভবনটি ছিল ঠিক এমনই। বিল্ডিং এখনো নতুন, রঙ মলিন হয়নি একটুও। অর্থের মূল্যে হয়তো দাম নির্ধারন করা যাবে, বলা যাবে কয়েক সেকেন্ডে কত কোটি টাকা জলে ভেসে গেল। টাকার অঙ্কে এই ক্ষতিকে পূরণ করা খুবই সম্ভব। কিন্তু ক্ষতি কি কেবল অর্থ মূল্যে হয়? টাকা দিয়ে আরেকটা রঙিন তিনতলা ভবন দাঁড় করানো খুবই সম্ভব। কিন্তু যে আবেগ ও আর অনুভূতি জড়িয়ে থাকে একটা স্কুল ঘিরে, সেটাকে আবার দাঁড় করানোর সাধ্য আছে কারো?

যারা গ্রাজুয়েশন করেছেন বা করছেন সবাইকে যদি একটা কমন প্রশ্ন করা হয়, ছাত্র জীবনে আপনি যে ৩/৪/৫ টি প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করেছেন এর মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় প্রতিষ্ঠান কোনটি...আমার ধারণা বেশিরভাগ মানুষের উত্তরে বলবেন, হাইস্কুল। কোন প্রতিষ্ঠানের সহপাঠীদের সবচেয়ে অকৃত্রিম মনে হয়েছে? এর জবাবে আরো বেশি করে আসবে হাইস্কুলের কথা।

নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে এস ই এস ডি পি মডেল উচ্চবিদ্যালয়

প্রাইমারি নিতান্তই বাল্যকাল, সময়ের সাথে অনেক স্মৃতি বিস্তৃত হয়ে যায়। ইন্টারমিডিয়েট সময়কাল খুব সংক্ষিপ্ত। এর মধ্যে তাড়া থাকে অনেক। রয়াসন খুব একটা জমে না। গ্রাজুয়েশনের সময়টা আবার বেশ বিচিত্র। গ্রাজুয়েশনের প্রকারভেদে কেউ কেউ পূর্ণিমা-অমাবস্যায় ক্যাম্পাসে পা ফেলে, কেউ কেউ চুটিয়ে উপভোগ করে ক্যাম্পাস জীবন। যে ক্যাম্পাসে গেলই না তার হিসেব তো বাদ। যারা চুটিয়ে উপভোগ করে তারাই বা কি বিশাল কলেবরের ক্যাম্পাসকে একদম নিজের মনে করতে পারে?

মনে হয় না। তাছাড়া বয়স বাড়ার সাথে সাথে চিরন্তন স্বার্থপরতা ও জাগতিক চিন্তা ঢুকে পড়ে মাথায়। অনেক ঘনিষ্টজনকেও তখন বিশ্বাস করা যায় না আসলে।

হ্যাঁ, হাই স্কুলের কথা বলছিলাম। এই একটামাত্র প্রতিষ্ঠান থাকে যেখানে কৃত্রিমতা থাকে সর্বনিম্ন। ক্যাম্পাস-বন্ধু-বান্ধব-শিক্ষক সবাইকে আপন লাগে। এই আপন লাগা অনুভূতি কখনোই বিস্তৃত হয় না।

যতবার স্কুলটার ভেঙে পড়া ছবি বা ভিডিও দেখছিলাম ততবার কেঁপে উঠছিল বুক। যে ছেলেমেয়েগুলো এই স্কুল, এই ক্যাম্পাস, এই ভবন দাপিয়ে বেড়িয়েছে তাদের কাছে এই দৃশ্যটা কতটা ভয়াবহ ছিল? এই ভবনের ইট-কাঠের মধ্যে থেকে যে ছেলেটা  নিজের বয়োঃসন্ধি জীবন পার করেছে তার কাছে কতই না প্রিয় ছিল এই স্কুল! যে মেয়েটা এখান থেকেই প্রজাপতি হয়েছে তার কাছে ভবনটা কতই না আবেগের জায়গা ছিল!

এখানেই হয়তো কেউ ফার্স্ট হওয়ার আনন্দে উদ্বেল হয়েছে, কেউ ফেল করার দুঃখে কান্না করেছে। দুষ্টমি, খুনসুটি, দলবেঁধে দুরন্তপনা, শিক্ষকের বকা-মার...যার সবটাই এক সময় সুখ স্মৃতি হয় সেগুলোর কতটা অস্তিত্ব থাকবে স্কুল ঘরকে পদ্মায় বিলীন রেখে?

এই রঙিন ভবনটাতেই হয়তো কলম দেয়ার বাহানায় কোনো কিশোর জীবনে প্রথম আঙুল ছুঁয়েছিল কোনো কাংঙ্ক্ষিত কিশোরীর। সেই অবিস্মরণীয় ঘোরলাগা স্মৃতির সাক্ষী স্কুল ঘরটা বিলীন হয়ে গেল। এখানকার একেকটা রুমে বসে কেউ হতে চেয়েছিল ডাক্তার, কেউ ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বা হতে চেয়েছিল এমন কিছু  যেটা সে নিজেও জানে না ভালোভাবে। যখন স্কুলের জায়গা দাঁড়িয়ে গিয়ে দেখবে সাগরসম নদী, কতটা পুড়াবে তাদের?

একেকটা মাধ্যমিক স্কুল মানে স্মৃতির যাদুঘর। কী চমৎকার সুখ স্মৃতির মেলা বসে আমাদের স্কুল জীবন ঘিরে। মাদারিপুরের শিবচরের এসইএসডিপি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছাত্রীরা না জানি কেমন মানবিক টানা পোড়নের মধ্যে দিন কাটাবে আজীবন। যেখানে গড়ে উঠেছে জীবনের ভিত্তি সেটাকে স্রেফ বিলীন হতে দেখা স্বজন হারানোর চেয়ে কম কিছু না।

শিবচরের এই স্কুলটিকে ডাকা হতো চরাঞ্চলের বাতিঘর নামে

শিবচরের ছেলে মেয়েগুলো কেমন থাকবে জানি না, তবে তাদের জায়গায় আমি থাকলে বেশ বড়ো রকমের ট্রমায় থাকতাম। পুরো জীবন ভর ঢেউয়ের মতো আলোড়ন তুলত কয়েক সেকেন্ডের ভিডিওটা। চরাঞ্চলের মানুষদের মন শক্ত থাকে জানি, তারপরও কিছু আবেগকে কি অস্বীকার করার ক্ষমতা আছে মানুষের?

আবেগের জায়গা বাদ দিলেও বাস্তবিক কিছু ব্যাপার সামনে এসে দাঁড়ায়। এই স্কুলে এই মুহুর্তে নিশ্চয়ই কয়েক শ ছাত্র ছাত্রী পড়ালেখা করছিল। চর এলাকার বাতিঘর নামে পরিচিত এই স্কুল হারিয়ে যাবার পর এই ছেলে মেয়েগুলোর কী হবে এখন? ভবিষ্যৎ স্মৃতি যতই পোড়াক না কেন, সেটা প্রত্যক্ষ কোনো ক্ষতি করবে না। কিন্তু এই মুহুর্তে পড়ালেখারত ছেলেমেয়েগুলো তো প্রত্যক্ষ ক্ষতির মুখে পড়ে গেল। এদের কী হবে এখন? তারা কোথায় পাবে আরেকটা সাজানো গোছানো স্কুল?

করোনা, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদী ভাঙন একের পর এক আঘাত আসছে দেশে। আমরা ভেঙে পড়ার পর আবার ভাঙছি, তারপর ভাঙছি আবারও। মৃত্যু ও ধ্বংসের এজেন্ডা নিয়ে যেন এসেছে ২০২০ সাল। করোনায় হাসপাতালে হাসফাস করা মানুষ, বন্যায় ডুবে যাওয়া ঘর বাড়ি আর নদীর গহ্বরে বিলীন হওয়া বসত ভিটা-স্কুল-কলেজ-মসজিদ-মন্দির...আমাদের সীমিত অশ্রু আমরা কোথায় ঢালব?

এই অসহ্য সময় আর ভালো লাগে না। এভাবে হারানোর তালিকা দীর্ঘ হতে দেখতে একদম ইচ্ছে করে না। খুব দুঃখ লাগে।

এত দুঃখ রাখব কোথায়?

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা