করোনাভাইরাস পজিটিভ থাকার পরও ভুয়া নেগেটিভ সনদ দেখিয়ে লণ্ডনগামী বাংলাদেশ বিমানের ফ্লাইটে উঠতে গিয়ে বিমানবন্দরে ধরা পড়েছেন ঐশী খান নামের এক যাত্রী, যিনি আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক নৌ-পরিবহণ মন্ত্রী শাজাহান খানের মেয়ে। তার সনদের হার্ডকপিতে নেগেটিভ থাকলেও, অনলাইনে করোনাভাইরাস পজিটিভ দেখে তাকে বিমানে উঠতে দেয়নি বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ।

ইতোমধ্যেই এই সংবাদটি নিয়ে বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমগুলোতে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। তবে মজার ব্যাপার হলো, অধিকাংশ গণমাধ্যমই একটি বিষয়কে তাদের প্রতিবেদনে উহ্য রেখেছে কিংবা তেমন গুরুত্বের সাথে উপস্থাপন করেনি। সেটি হলো, ঘটনাটি রবিবার (২৬ জুলাই) সকালবেলা ঘটলেও, গণমাধ্যমে প্রথম সেটি এসেছে বিকেলে। অনেক বিশ্বাসযোগ্য গণমাধ্যমে সংবাদটি আসতে আসতে আবার সন্ধ্যাও পেরিয়ে গেছে। যেমন: বাংলাদেশ প্রতিদিনের অনলাইনে সংবাদটি প্রকাশিত হয়েছে বিকেল ৫টা ১৪-তে। কিন্তু প্রথম আলোতে সংবাদটি প্রথম এসেছে সন্ধ্যা ৬টা ৫৩-তে। বিডিনিউজ২৪-এ এসেছে আরো পরে, রাত ১০টা ৩২-এ।

খুব স্বাভাবিকভাবেই মনে প্রশ্ন জাগে, সকালবেলা ঘটা ঘটনা মূলধারার অনলাইন গণমাধ্যমে আসতে এত বিলম্ব কেন? এই প্রশ্নের সদুত্তর বেশিরভাগ গণমাধ্যমেই পাওয়া যায় না। কিন্তু সোমবার (২৭ জুলাই) ভোরের কাগজের মুদ্রিত সংস্করণে এর ব্যাখ্যা খানিকটা হলেও পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে, "যাত্রীর পরিচয় জানার পর বিষয়টি গোপনে সমাধানের চেষ্টা করা হয়। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা না নিয়েই তাকে ফেরত পাঠানো হয়।"

ভোরের কাগজের প্রকাশিত এই দুইটি বাক্যকে কিন্তু নেহাতই উড়িয়ে দেয়া যায় না। কেননা একদম প্রথম দিকে বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত সংবাদটিতে আমরা দেখতে পাই, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের উপ-মহাব্যবস্থাপক (জনসংযোগ) তাহেরা খন্দকারের কাছে ইমিগ্রেশনে করোনা পজিটিভ ধরা পড়া নারীটি একজন সাবেক মন্ত্রীর মেয়ে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, "তার পরিচয় কী, সেটা আমরা জানি না।"

ইতোমধ্যেই যেখানে ভুয়া করোনা পজিটিভ সনদ নিয়ে বাংলাদেশিরা বিদেশের মাটিতে পা রাখার বিষয়টি ধরা পড়ার পর বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, সেখানে নতুন করে আরো একজন একই অভিযোগে ধরা পড়ার পরও তার পরিচয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের কাছেই গোপন করে যাওয়াটা খুবই সন্দেহজনক বিষয়। যে কেউ ধরে নিতেই পারেন যে, সাবেক মন্ত্রীর মেয়ের ধরা পড়ার বিষয়টি গোপন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করা হয়েছে, ফলে যে বিমানে চড়ে তার যাওয়ার কথা ছিল তাদের কাছেও তার নাম প্রকাশ করা হয়নি, এবং তার বিরুদ্ধে কোনো আইনানুগ ব্যবস্থাও নেয়া হয়নি।

এবার আসা যাক আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে। কোথা থেকে করোনা নেগেটিভের সনদ পেলেন শাজাহান খানের মেয়ে? এ প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে বাংলা ট্রিবিউন। তারা জানাচ্ছে, ঐশী খানের পজিটিভ ও নেগেটিভ সনদের স্বাক্ষরকারী একই প্রতিষ্ঠানেরই ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তি। পজিটিভ রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন অ্যান্ড রেফারাল সেন্টারের পরিচালক এবং প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল খায়ের মোহাম্মদ শামসুজ্জামান এবং নেগেটিভ রিপোর্টে স্বাক্ষর করেছেন একই প্রতিষ্ঠানের আবাসিক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (আরএমও) বায়েজিদ বিন মনির।

অর্থাৎ, যদি কেউ এমনটিও ভেবে থাকেন যে আসলে ঐশী খান করোনা নেগেটিভ হলেও (যেমনটি তার কাছে থাকা হার্ডকপিতে দেখা যাচ্ছে), অনলাইনে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে করোনা পজিটিভ দেখাচ্ছে, তা আসলে সত্যি নয়। সম্পূর্ণ আলাদা দুইজন ব্যক্তিই তার নেগেটিভ ও পজিটিভ সনদে স্বাক্ষর করেছেন, ফলে এক্ষেত্রে যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ভুলবশত নেগেটিভ রিপোর্ট পজিটিভ হয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমারজেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ও স্বাস্থ্য অধিদফতরের মুখপাত্র ডা. আয়েশা আক্তার বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, "স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে সংশ্লিষ্ট ল্যাবের পরিচালকের সঙ্গে কথা বলে রিপোর্ট যাচাই করা হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন ওই রেজাল্ট পজিটিভ। আমাদের তরফ থেকে রেজাল্ট ঠিকই পজিটিভ আছে। উনি এই নেগেটিভ সার্টিফিকেট কোথা থেকে পেয়েছেন সেটা আমাদের জানা নেই।"

ওয়েবসাইটে যাচাই করতে গিয়ে ঐশী খানের করোনাভাইরাস পজিটিভ সনদ পেয়েছে ইমিগ্রেশন বিভাগ

সঙ্গত কারণেই নেগেটিভ সনদে স্বাক্ষর করা বায়েজিদ বিন মনিরের বক্তব্যও জানা দরকার। পূর্ব পশ্চিমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে তিনি বলেছেন, "আমি ঘটনাটি শুনেছি। সোমবার (২৭ জুলাই) সকালে বিস্তারিত জেনে বলতে পারবো।" এছাড়া বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেছেন, অফিস সময় শেষে তিনি ঘটনা শুনেছেন। আজ (সোমবার) সকালের আগে তিনি কিছু জানাতে পারবেন না। অর্থাৎ, পজিটিভকে নেগেটিভ বানিয়ে দেয়া ব্যক্তি নিজেই ঘটনার বিস্তারিত জানেন না।

সব মিলিয়ে কী যে হচ্ছে, আর কীভাবে হচ্ছে, বোঝা বড় মুশকিল। এ ব্যাপারে একমত স্বয়ং শাজাহান খানও। তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে বলছেন, "কীভাবে এগুলো হচ্ছে বুঝতে পারছি না। একটা হয়রানির মধ্যে পড়লাম।"

এই হয়রানিতে নিশ্চয়ই তার মুখের হাসি কিছুটা হলেও ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে। আমরা আশা করি, খুব শীঘ্রই তার মুখে সেই চিরাচরিত হাসি ফিরে আসবে, যে হাসি হেসে তিনি আলোচনার জন্ম দিয়েছিলেন দুই বছর আগে এই জুলাই মাসেরই শেষ সপ্তাহে, জাবালে নূর পরিবহনের দুই বাসের চালকের রেষারেষির জেরে রাজধানীতে বিমানবন্দর সড়কে রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার পর।

(তথ্যসূত্র- বাংলাদেশ প্রতিদিন, প্রথম আলো, বাংলা ট্রিবিউন, ভোরের কাগজ)


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা