করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা, কিন্তু হেরে যাননি। বুকে সাহস নিয়ে লড়েছেন, ভুগেছেন। তবু শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে তাদেরই। করোনার বিপক্ষে যুদ্ধজয়ের এই গল্পগুলো হয়তো আপনাদের সাহস যোগাবে। তাই আমাদের নিয়মিত আয়োজন- সেপনিল প্রেজেন্টস করোনাজয়ী'র গল্প।

নীলিমা নার্গিস নীতু, মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত আছেন ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। ফ্রন্টলাইন ওয়ারিয়র হিসেবে তাকে করোনা রোগীর সংস্পর্শে আসতে হয়েছে, আক্রান্ত হয়েছেন তিনি। করোনা তাকে মানসিকভাবে দুর্বল করতে না পারলেও, শারীরিকভাবে ভুগিয়েছে বেশ। তবে এই লড়াইয়ে জিতে ফিরে এসেছেন নীলিমা নার্গিস, আবারও যোগ দিয়েছেন কর্মক্ষেত্রে, করোনার বিরুদ্ধে লড়ছেন আরও একবার...

নীলিমা নার্গিস নীতু: এপ্রিলের শেষ সপ্তাহের ঘটনা, আমার নাইট ডিউটি ছিল বিএসএমএমইউ'র পেডিয়াট্রিক্স নেফ্রলজি ওয়ার্ডে। গিয়েই জানলাম নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা রোগী। রিপোর্ট আসবে। রাত ১০টায় রিপোর্ট পেলাম, কোভিড-১৯ পজিটিভ। সবাই কে ফোন দিলাম। অন্য রোগীদের সরায় নিলাম। ওই রোগীকে মুগদায় রেফার করলাম। সারারাত ধরে অন্য রোগী দের ডিসচার্জ  লিখতে লাগলাম। এই করে  সকাল ৮টা।

চাইলেই আমি পারতাম রোগী ফেলে আমার ডিউটি টাইমে চলে যেতে। না, পারি নি। আমার রোগীর জন্য আমার ভালবাসা আমাকে বাধা দিয়েছে। বাসায় বলে রাখা ছিল আইসোলেশনের রুম রেডি রাখতে।

সাথে রাখুন সেপনিল হ্যান্ড স্যানিটাইজার

সেদিন থেকে শুরু। পাশের রুমে মেয়ে দাদীর কাছে থাকছে। প্রথম রাত টা খুব কষ্টে কাটিয়েছি। আমি খুব কম কাঁদি। সেদিন রাতে মেয়েটার জন্য চোখের জল থামাতেই পারছিলাম না। ওকে আমি যে গান গেয়ে শোনাই সেটা মনে করতেই বুক ফেটে যাচ্ছিল। ধীরে ধীরে শক্ত হলাম। আমাকে দুরে থাকতেই হবে। আমার হাসব্যান্ড ডা. বায়েজীদুর রহমান (অ্যাসিস্টেন্ট রেজিস্ট্রার, নিউরোসার্জারী এন্ড নিউরোস্পাইন, ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ নিউরোসায়েন্স) আমাকে বলতো, কিচ্ছু হবে না। এপ্রিলের ২৮ তারিখ স্যাম্পল দিলাম। রিপোর্ট দিলো ২৯ তারিখ। কোভিড-১৯ পজিটিভ। আমাকে রিপোর্ট পুরোপুরি জানায়নি। বলল close contact + inconclusive রিপোর্ট। ভেবেছে মেন্টালি দুর্বল হয়ে যাব। আমি আমার জীবন কঠিন সময় পার করেছি নিজ হাতে রায়াকে অপারেশন টেবিলে রেখে (open heart surgery for ASD) এসে। ওই দিন থেকে আমি পাথর হয়ে গেছি। সবচেয়ে বড় পরীক্ষায় আমাকে আল্লাহ জয়ী করেছেন। আর করোনাকে কিসের ভয়!

যারা বলেন করোনা কিছু না, তারা ভুল বলেন। আপনি বুঝতেও পারবেন না। ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ চলে আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার। তার পরবর্তী শুরু হয় আপনার বিভিন্ন লক্ষণ। আমার লক্ষণ গুলো অনেক দেরিতে শুরু হয়। আমার বুকে ব্যথা, কাশি,ডায়রিয়া, অতিরিক্ত দুর্বলতা, হাত-পা ব্যথা, অরুচি, মাংসপেশিতে তীব্র ব্যথা শুরু হলো। আমার সাথে রক্তশূন্যতাও ছিল। সব মিলিয়ে দিন দিন খারাপ হতে থাকলাম। 

এর মধ্যে একটা কথা আমার অবস্থা খারাপ হচ্ছে তা কাউকে  বুঝতে দেই নি।সবার সাথে ভাল করে মাস্ক  পরেই কথা বলতাম। শেষের দিকে ডায়রিয়া, অ্যানেমিয়া, অরুচি, সাথে আমার ব্লাড প্রেসার কমতে শুরু করল। আমি দিনে ৬/৭ টা ওরস্যালাইন, সাথে ডাবের পানি খাচ্ছিলাম। এরমধ্যে আমার মনে হচ্ছিল আমি আমার দৈনিক কাজ করতে পারছি না। নামাজ দাঁড়িয়ে পড়তে পারছি না। পালস রেট অনেক বেড়ে যাচ্ছিল। প্রেসার কমে ৭০/৪০ হয়ে যাচ্ছে। 

বুঝতে পারলাম, অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। মুখে খেয়েও বাড়াতে পারছি না। হাসপাতালে ভর্তি দরকার। কয়েকজনের সাথে কথা হল। সবাই বলল ভর্তি হও। দুদিন পর দেখলাম প্রেসার কম হয়ে আমি কেমন যেন ড্রাওসি ফিল করছি। সাথে আমার আউটপুট কমল। আর না পেরে হাসব্যান্ড কে বললাম ক্যানুলা করা লাগবে। ও খোঁজ নিল পজিটিভ রোগী কেউ করবে না। অবাক হলাম আমি বাচ্চাদের ক্যানুলা নিজের হতে কত করছি। আজ আমি ডক্টর হয়ে Covid এর কাছে অসহায়! 

এরপর আমার স্বামীই পিপিই পরে ক্যানুলা করল। রানিং ফ্লুইড  দিল। এর মধ্যেই ব্লক হল। আমি দেখলাম কারেকশন না হলে শক এর দিকে যাব। বাটারফ্লাই দিয়ে নিজের হাতে নিজে দিলাম ফ্লুইড। ওই দিন ছিলো আমাদের ৭ম ম্যারেজ অ্যানিভার্সারী। দুজনের জন্য স্মৃতি হয়ে থাকল। এভাবে কয়েক লিটার ফ্লুইড যাওয়ার পর আমি কিছু টা ভালো অনুভব করলাম।আমার hypokalemia  ছিলো। ঠিক হল। এরকম ১৩/১৪ দিন আমার এমন অবস্থা ছিল। আমি কথা বলতেও পারতাম না। দিনে ১৪/১৫ ঘন্টা ঘুমাতাম।

সপরিবারে ডা. নীলিমা নার্গিস

 

মেডিসিনের মধ্যে জিংক, ভিটামিন, এবং ক্যালসিয়াম ট্যাবলেট খেয়েছি। অ্যাজমার সমস্যা থাকায় আলাদা ঔষধও খেতে হয়েছে। যে কোন মেডিসিন গ্রহণের আগে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নেবেন, কারণ একই মেডিসিন সবার জন্য কার্যকরী হবে না। খাবার আগে যা খেয়েছি তার দিগুণ পরিমাণ খাওয়ার চেষ্টা করেছি। দুইটা ডিম, মাছ, সবজি, ফল আর প্রচুর পানি। যে জিনিসটা অবশ্যই দরকার তা হল মানসিক শক্তি,মনোবল,আত্মবিশ্বাস আর আপনার দোয়া। আমার কাছে মনে হয়েছে, নামাজ হচ্ছে সবচেয়ে বড় মেডিটেশন। দাঁড়িয়ে পড়তে না পারলে বসে, শুয়েও পড়েছি। কোরান পড়েছি। ব্রিদিং এক্সারসাইজ করেছি। Prone হয়ে  থেকেছি।

সময় কাটানোর জন্য নাটক দেখেছি। মন ভাল রাখতে যা করতে হয় করেছি। হাসিখুশি থেকেছি। মেয়ে দরজার নিচ দিয়ে চিঠি লিখত। পড়তাম। জবাব দিতাম মেসেঞ্জারের মাধ্যমে। বারান্দায় গিয়ে ওকে দেখতাম। ভিডিও কলে আম্মু, আব্বু, অনেকের সাথে কথা বলতাম। এমনও হয়েছে, হাতে ক্যানুলা নিয়ে আমি হাসতে হাসতে কথা বলেছি। করোনা আমাকে মানসিকভাবে দুর্বল না করতে পারলে ও শারিরিকভাবে এমন নাজেহাল করেছে যা আমি কখনো হইনি। এই অবস্হা পুরো রিকভার করতে সময় লাগছে।

মনোবলটা তখন আরও বেশি হতো, যখন জানতাম, কেউ বলছে, 'ইফতারের পর তোমার জন্য দোয়া করলাম, ইয়াসিন সূরা পরে, নফল নামাজ পরে।' কি পরিমাণ মানুষ আমাকে ভালবাসে, আদর করে, আমি তার যোগ্য কিনা আল্লাহ বলতে পারবেন। আমি সব সময় দোয়া করতাম,  'আমাকে যা দিয়েছো, আর কাউকে এই কষ্ট দিও না আল্লাহ।' এটা এমন এক রোগ, আপনার প্রিয় মানুষগুলো আপনার পাশে আসতে পারবে না। আপনার অবস্থা খারাপ হলেও বলতে কষ্ট হবে, অজানা ভয়ে- রোগটা যদি ওদের মধ্যেও ছড়িয়ে যায়!

এযাত্রায় প্রাণে বেঁচে গেলাম। মনে থাকবে স্মৃতিগুলো। দীর্ঘ একটা মাস বন্দী জীবন কাটিয়েছি। কষ্ট হলেও হাসিমুখে সহ্য করেছি, কাউকে বুঝতে দেইনি। আমি সারাজীবন সবার ভালবাসা পেয়েছি, এই কঠিন সময়েও অনেকের দোয়া আর ভালবাসায় সিক্ত হয়েছি। সবাই কে জড়িয়ে ধরে বলতে চাই, তোমরা আমাকে এত ভালবাসো বলেই তো ফিরে এলাম। 

আপনারা চাইলেই ঘরে থাকতে পারেন। আমরা পারি না। আবার যেতে হচ্ছে যুদ্ধক্ষেত্রে, যাব। আমার কাজই তো এটা। করোনা আমাকে আবারও আক্রমণ করতে পারে। আমাদের পরিবার আবার রিস্কি হবে। কেউ হারিয়ে যাবে। আপনারা বুঝবেন না হয়তো আমাদের কষ্ট, আমাদের চ্যালেঞ্জটা। যাই হোক, সবাইকে অনেক ধন্যবাদ, আমাকে এত ভালবাসা দেয়ার জন্য। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, স্যার, কলিগ, বড় আপু, ভাইয়া, আমার প্রিয় ইন্টার্নস। সবার দোয়া ও আল্লাহর রহমতে আমি ফিরেছি। যদি পারি অবশ্যই প্লাজমা দেব। সবাই সাবধানে থাকুন। বাসায় থাকুন। নিরাপদে রাখুন পরিবারকে। আমরা আবার জয়ী হব ইনশাল্লাহ।

আরও পড়ুন-


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা