করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা, কিন্তু হেরে যাননি। বুকে সাহস নিয়ে লড়েছেন, ভুগেছেন। তবু শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে তাদেরই। করোনার বিপক্ষে যুদ্ধজয়ের এই গল্পগুলো হয়তো আপনাদের সাহস যোগাবে। তাই আমাদের নিয়মিত আয়োজন- সেপনিল প্রেজেন্টস করোনাজয়ী'র গল্প।

ফাতেমা জোহরা

যেভাবে শুরু হলো

এপ্রিলের ৩০ তারিখ রাত থেকে লিমন (আমার হাজব্যান্ড) হঠাৎ গলায় হালকা ব্যথা অনুভব করলো। ও ভাবলো দুপুরে বৃষ্টিতে ভেজার কারণে হয়তো এমন হচ্ছে। তবুও সেদিন রাতেই ও আলাদা ঘরে চলে গেলো। পরদিন, অর্থাৎ ১লা মে সকাল থেকে শুরু হলো জ্বর। ১০০ থেকে ১০২ ডিগ্রীর মতো উঠানামা করছে জ্বর। রোজা ছিল সারাদিন। ইফতারের পর থেকে শরীর আরো খারাপের দিকে যেতে লাগলো। স্বাস্থ্য বাতায়নে কল করলে তাঁরা কিছু ঔষধের নাম বলেন। সেই অনুযায়ী ঔষধ খায়, কিন্তু জ্বর কিছুতেই কমে না। গলাব্যথা তখন খুবই কম। কাশি ছিল না। সারারাতই জ্বর ১০০-১০২ এর মধ্যে উঠানামা করতে থাকে।

অবস্থা খারাপ দেখে ২ তারিখ সকালে বাবুকে আব্বুর কাছে পাঠিয়ে দেই। এদিকে লিমন বেশ দুর্বল হয়ে যায়। অরুচি চলে আসে খাওয়া দাওয়াতে। এরপরেও জোর করে একটু গরম দুধ, স্যুপ, জাউ ভাত, মুরগির ঝোল (একেবারে ঝাল ছাড়া), আদা চা- এসব খাবার দিতে থাকি। সাথে মালটা, লেবু তো আছেই। ২ তারিখ রাত থেকে ওর জ্বর বেশ কমে যায়, কিন্তু গলা ব্যথা বাড়তে থাকে। কী করবো দিশেহারা লাগছিলো! জীবনের অন্যতম একটা দুশ্চিন্তাময় দিন ছিল সেটা।

এদিকে সেদিন রাত থেকেই আমার ঘাড়ে বেশি ব্যথা অনুভব করি৷ ভেবেছিলাম টেনশনে হয়তো এমন হচ্ছে। পরদিন লিমনের জ্বর একেবারেই কমে যায়, কিন্তু অনেক দুর্বল হয়ে যায়। ৩ তারিখ রাত থেকে শুরু হয় আমার জ্বর। তবে আমার জ্বর ১০০'র মতোই ছিলো। মাঝে কিছুক্ষণের জন্য ১০১ হয়েছিল। তবে শরীরে অসহ্য ব্যথা ছিল। বিশেষ করে সিজারের সময়ে এনেস্থিসিয়া যেখানে দিয়েছিল, সেখানে আর তার আশেপাশে। পা অবশ হয়ে আসছিলো। রাতে স্বাস্থ্য বাতায়নে কল করলে তাঁরা একই ঔষধ সাজেস্ট করেন। ৪ তারিখ বিকেলের মধ্যে আমার জ্বর আর শরীরের ব্যথা কমে যায়। তবে হালকা কাশি শুরু হয়।

সাথে রাখুন সেপনিল হ্যান্ড স্যানিটাইজার

আমাদের দুজনেরই জ্বর কমে যায় কিন্তু খুব দুর্বল হয়ে যাই৷ হাত পা নাড়াতেও যেন খুব ক্লান্ত লাগতো! এভাবেই কাটে পরবর্তী ৫ দিন। যেহেতু দুর্বলতা ছাড়া আমাদের আর কোন লক্ষণ ছিল না, তাই আমরা ভাবি যে, এটা ভাইরাল ফিভার ছিল হয়তো। তাই তখনও টেস্ট করানোর কথা চিন্তাই করিনি।

কিন্তু সন্দেহ জাগে আমার লক্ষণ প্রকাশের ৭ম দিনে, অর্থাৎ ৯ই মে'তে। সেদিন থেকে আমি কোনো স্বাদ-ঘ্রাণ পাচ্ছিলাম না। এমনকি পঁচা ডিমের গন্ধও পাচ্ছিলাম না! লিমনও বলছিলো যে, ও খাবারের স্বাদ খুব একটা পাচ্ছে না। তাই আর দেরি না করে টেস্টের সিদ্ধান্ত নিলাম।

প্রথমে কিছু সহযোগিতার কথা বলি

টেস্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়ে আমরা IEDCR এর হটলাইনে কল দেই। তাঁরা আমাদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাম্বার দেয়। আমরা সেই নাম্বারে যোগাযোগ করলে, আমাদের নাম, ঠিকানা, বয়স এসব লিখে তাঁদের নাম্বারে এসএমএস করতে বলে এবং জানায় যে খুব দ্রুত তাঁরা বাসায় এসে স্যাম্পল নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু যেহেতু আমরা ভাড়া বাসায় থাকি, তাই কিছু অসুবিধার কারণে আমরা বলি যে, আমরা হেঁটে বাসার বাইরে এসে স্যাম্পল দিবো। তাঁরা আমাদের সমস্যা বিবেচনা করে এবং আমরা বাসার কাছেই এক জায়গায় দাঁড়াই। উনারা এসে সেখান থেকেই যথাযথ নিয়ম মেনেই আমাদের স্যাম্পল নেয় ১১ই মে এবং বলে যে কল করে রিপোর্ট জানিয়ে দেয়া হবে।

এরমধ্যে স্বাদ-ঘ্রাণ না পেলেও, আমরা বেশ সুস্থ অনুভব করি। তবে দুজনেরই হালকা কাশি ছিল, যেটা ঘুমাতে গেলে হতো। তো স্যাম্পল দেওয়ার দুদিন পার হয়ে যায়। কিন্তু রিপোর্ট না আসায় ভাবি যে, বোধহয় কিছুই হয়নি। কারণ তাঁরা এও বলেছিল যে, দুদিনের মধ্যে কিছু না জানালে রিপোর্ট নেগেটিভ ধরে নিতে হবে।

তাই ১৪ তারিখ সকালে বাবুকে বাসায় নিয়ে আসার প্রস্তুতি নেই। বলা বাহুল্য যে, আমি বাবুকে ছাড়া প্রায় পাগলের মতো হয়ে যাচ্ছিলাম। তাই একটু তাড়াই ছিল ওকে আনার। কিন্তু সৃষ্টিকর্তার রহমতে, আব্বু বাবুকে দিয়ে যাবার ১০ মিনিট আগে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে কল দিয়ে জানায় যে, আমার রিপোর্ট 'পজিটিভ'! তবে লিমনের ব্যাপারে কিছুই জানায়নি! আকাশ ভেঙে পড়লো মাথায়।

শারীরিক অসুস্থতায় যা না কাবু হলাম, মানসিক অসুস্থতায় কাবু হলাম বেশি। নির্ঘুম রাত কাটে বাবুকে আম্মুর কাছে পাঠানোর দিন থেকেই। রিপোর্ট পেয়ে আরো হতাশ হয়ে যাই। তবে স্বাস্থ্য বাতায়নের সেবা সেই হতাশা থেকে বেশ রিলিফ দিয়েছিল। আমি ৫ বারের মতো তাঁদের সাথে কথা বলেছি। তাঁরা অনেক হেল্পফুল ছিল। রিপোর্ট পজিটিভ জেনে সাথে সাথে প্রেস্ক্রিপশন মেসেজ করেছে। যতটুকু পেরেছে কথা বলে সাহায্য করেছে।

কিছু অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি

রিপোর্ট পাওয়ার পরদিন রাত প্রায় পৌনে এগারোটায় সদর থানা থেকে কল দিয়ে বাসার ঠিকানা, বাড়িওয়ালার ফোন নাম্বার চাওয়া হয়। তো অত রাতে পুলিশের কল পেয়ে আমরা চিন্তায় পড়ে যাই আর বাড়িওয়ালার নাম্বারও দেইনি। উনারা বাসায় থাকার পরামর্শ দিয়ে জানায় যে, লোকাল থানা থেকে কল দিলে যেন এই তথ্যগুলো দিয়ে দেই।

পরদিন আর কেউ কল দেয়নি। কিন্তু এই চিন্তায় আমি বেশ অসুস্থ বোধ করতে থাকি৷ কারণ পুলিশ এসে বাসা লকডাউন করে গেলে বাড়িওয়ালা, আশেপাশের লোকজন খুবই নির্দয় আচরণ করে বলে জেনেছি, সেইসাথে পুরো বিল্ডিংয়ের বাসিন্দাদেরও ভোগান্তি হয়। পুলিশ লকডাউন করে চলে যাবার পর কিছু অতি উৎসাহী জনতা 'লাল পতাকা' দ্বারা বাড়িটিকে চিহ্নিত করে নানান নোংরামি করে থাকে।

সদর থানা থেকে কল দেবার ২ দিন পর রাত প্রায় দশটায় লোকাল থানার এস আই কল দিয়ে ঠিকানা আর বাড়িওয়ালার ফোন নাম্বার চায়। লিমন তখন তাঁকে বুঝিয়ে বলে যে, আমরা বাসার বাইরে কোথাও যাচ্ছি না আর যাবোও না। যদি উনারা এখানে আসে, তবে সামাজিকভাবে আমাদের বিপর্যস্ত করা হতে পারে। এস আই সাহেব ব্যাপারটা বুঝে, আমাদের বাসায় থাকার পরামর্শ দিয়ে সেই যাত্রায় মাফ করে এবং আমরা কিছুটা চিন্তামুক্ত হই!

মূল ভোগান্তির শুরু

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আমাদের বলা হয়েছিলো যে, ১ম স্যাম্পল দেবার ১৪/১৫ দিন পর এসে তাঁরা ২য় স্যাম্পল নিবেন, আমরা যেন কোথায় বের না হই। আমরা অপেক্ষা করতে থাকি।সেইসাথে আমি অধৈর্য্যের চুড়ান্ত পর্যায়ে চলে যাই। বাবুকে ছেড়ে ওভাবে থাকা প্রচন্ড কষ্ট দিতে থাকে। রাতে ঘুম আসে না। ওদিকে ঈদ চলে আসে, ১৪,১৫,১৬....দিন চলে যায় ১ম স্যাম্পল দেবার, কিন্তু উপজেলা থেকে কারো আসার খবর নাই।

কল দিলে জানায় ২৪ তারিখ আসবে। কিন্তু আসে না। শারীরিকভাবে সুস্থ হলেও মানসিক বিপর্যস্ততা বাড়তে থাকে। এরপরে আর অপেক্ষা না করে, ২৮ শে মে ভোরে চলে যাই স্থানীয় একটি টেস্ট বুথে। সাড়ে পাঁচ ঘন্টা লাইনে থেকে যখন স্বাস্থ্যকর্মীরা কিট নিয়ে আসেন, তখন দেখি- লাইন বলতে আর কিচ্ছু নাই। লাইনে দাঁড়িয়ে ছিল প্রায় ২০০ মানুষ, কিন্তু কিট আনা হয়েছিল ৪৫ টা!

তবে এরমধ্যেই পুলিশ আর 'নেতার মামাতো- খালতো- পাড়াতো' ভাই ছিল ৩৫ এর বেশি, যারা লাইন না ধরেই ফর্ম নিয়ে যাচ্ছিলো। লোকজন গায়ের উপরে উঠে যাচ্ছিলো প্রায়। এমন অবস্থা ছিল যে, সুস্থরাও হয়তো আক্রান্ত হয়ে ফিরেছেন! যা হোক, আমি লাইনের শুরুতেই দাঁড়িয়েছিলাম, তাই বহু ধাক্কাধাক্কি আর রিকোয়েস্ট করে ২য় স্যাম্পল দেবার সুযোগ পাই!

এরপরে তো রিপোর্ট এর অপেক্ষা। যে জিনিস সর্বোচ্চ ৩/৪ দিনের মধ্যে জানাবার কথা, সেটা এক সপ্তাহের মধ্যেও জানায়নি।এখনো জানায়নি! আমি আর ধৈর্য্য রাখতে পারি না।

প্রাইভেট হসপিটালে খোঁজ নেই। এক জায়গায় ১১ ই জুন পর্যন্ত সব বুকড! ভাগ্যক্রমে ইউনাইটেড হসপিটালে ৮ই জুনের সিরিয়াল পাই! টেস্ট করাই এবং ১০ই জুন সেই অতি কাঙ্ক্ষিত রিপোর্টটা (করোনা নেগেটিভ) পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি!

কিছু উল্লেখযোগ্য বিষয়

  • করোনা থেকে মুক্তি পাবার মূল ঔষধ ছিল- সঠিকভাবে খাওয়াদাওয়া করা। প্রতিদিন এক গ্লাস দুধ, ২ টা ডিম, প্রচুর লেবু, মালটা, পুষ্টিকর খাবার খেয়েছি। যা আগে কখনো এতো গুরুত্ব দিয়ে করিনি।
  • অনেককে দেখছি অভিনব সব উপায়ে গরম পানির ভাপ নিচ্ছেন। জানি না এটা কেমন উপকারী! কারণ আমি এই দীর্ঘ ৩৭ দিনে মাত্র ২ বার বাধ্য হয়ে ভাপ নিয়েছিলাম, তাও মাত্র ১০ মিনিটের মতো।
  • অনেক অনেক গরম মশলা, সরিষা... ইত্যাদি নানান জিনিস দিয়ে চায়ের রেসিপি পেয়েছিলাম। কিন্তু অত মশলা না, শুধু আদা দিয়ে কিছুদিন চা খেয়েছিলাম, যেটা আমার কাশি আর হালকা গলাব্যথায় আরাম দিয়েছে।
  • কোনো আহামরি মেডিসিন লাগেনি। নাপা এক্সটেন্ড, মিরাকফ, ফিক্সো১২০ আর ডক্সিন ১০০ খেয়েছিলাম, সাথে কিছু ভিটামিন সি আর ডি ট্যাবলেট এবং এগুলো সব ডাক্তারের পরামর্শেই।
  • মানসিক দুশ্চিন্তা এই রোগকে আরো প্রকট করে। তাই দ্রুত সুস্থ হতে চাইলে চিন্তামুক্ত থাকাই শ্রেয়।

উপসর্গহীন করোনা

আমি মনে করি, আমার যে উপসর্গগুলো ছিল, সেগুলো ভাইরাল ফিভারের মতোই। আহামরি গলাব্যথা, কাশি ছিল না। যা ছিল, তা খুবই হালকা। জ্বর ছিল দেড় দিনের মতো। শরীরে খুব ব্যথা ছিল একদিন। তবে দুর্বলতা বেশি ছিল, আর ৪/৫ দিন স্বাদ-ঘ্রাণ পাইনি। আর এখন যেসব মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে, অনেকেরই আমার মতো অবস্থা। তাই টেস্টের বিড়ম্বনার কথা ভেবে অনেকেই টেস্ট করায় না। সেখানেই বিপত্তিটা ঘটে! বয়স্ক এবং নানান জটিল রোগাক্রান্তরা করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুমুখে চলে যায়।

তাই সবাইকে অনুরোধ করছি, হালকা এসব উপসর্গগুলোকে অবহেলা না করে টেস্ট করুন। না করতে পারলে কোনো উপসর্গ টের পেলেই নিজে থেকেই আলাদা থাকুন অন্তত ১৪ দিন। সামান্য অসচেতনতায় মৃত্যুর মিছিল আর দীর্ঘায়িত হতে দিবেন না প্লিজ!

উল্লেখ্য, আমাদের লক্ষণ প্রকাশ পাওয়া মাত্রই নিজেরা আলাদা ঘরে আইসোলেটেড হয়েছি। বাইরে তো যাই-ই নি! যদিও আমরা আক্রান্ত হবার আগেও খুব প্রয়োজন না হলে বাইরে যেতাম না। কিন্তু এরপরেও শেষ রক্ষা হয়নি!

সবার জন্য শুভকামনা রইলো। সুন্দর, স্নিগ্ধ ভোর আসবেই। শুধু আমাদের আর কিছুদিন ধৈর্য্য রাখতে হবে, সচেতন থাকতে হবে!

*

আমাদের 'করোনাজয়ীর গল্প' সিরিজের বাকি লেখাগুলো পড়তে পারেন এই লিংকে ক্লিক করে

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা