করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা, কিন্তু হেরে যাননি। বুকে সাহস নিয়ে লড়েছেন, ভুগেছেন। তবু শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে তাদেরই। করোনার বিপক্ষে যুদ্ধজয়ের এই গল্পগুলো হয়তো আপনাদের সাহস যোগাবে। তাই আমাদের নিয়মিত আয়োজন- সেপনিল প্রেজেন্টস করোনাজয়ী'র গল্প।

লকডাউন শুরু হবার পর থেকে আমরা সবাই বাসাতেই ছিলাম, কিভাবে কি হলো বলতে পারবো না, তবে গ্রোসারি ও ফার্মেসী থেকে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, এটাই বলতে পারি যে আল্লাহর হুকুম ছিলো। বাসায় আমরা ছয়জন সদস্য, সবাই আক্রান্ত হয়েছিলাম করোনায়। ২২ মে আমার ছোট ভাই, ২৪ মে সকালে বাবা, রাতে আমি, ২৫ মে আমার মেঝ ভাই, ২৭ মে সকালে আমার মা, রাতে ছোটবোন- এভাবে ছয়দিনে সবার উপসর্গ দেখা দিলো।

উপসর্গ দেখা দেয়ার শুরুতেই আমরা হোম আইসোলেশন নিশ্চিত করেছি। আমাদের বাসায় টোটাল ৫ টা রুম আছে। তবে আমরা যেহেতু ৬ জন এবং আক্রান্ত হওয়ার সময়টা এবং রিকভার করার সময়টা ভিন্ন তাই আমাদেরকে বারবার আইসোলেশন প্যাটার্ন চেঞ্জ করতে হয়েছে। চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ইয়েলো কর্নারে স্যাম্পল জমা দিয়েছিলাম আমরা। বলে রাখি, আমরা সবাই টেস্ট করিনি, আমার এবং বাবার শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়াতে আমি আর বাবা টেস্ট করাই, যেহেতু বাসার সবারই তখন সিম্পটমস চলে এসেছিলো, ডক্টর বলেছিলেন দুইজন অন্তত পরীক্ষা করলে বাকিদেরটা ওখান থেকে এন্টিসিপেইট করা যাবে। তারপর পজেটিভ রিপোর্ট এলো। এখান থেকেই কনফার্ম হলাম যে এটাই করোনাই।

সাথে রাখুন সেপনিল হ্যান্ড স্যানিটাইজার

পজিটিভ রেজাল্ট আসার পর আবার আইসোলেশন চেন্জ করা শুরু হলো, একটু একটু করে যখন সিম্পটমস রিসলভ হওয়া শুরু করে তখন সুস্থদের অসুস্থ দের থেকে দূরে রাখাই নতুন প্যাটার্নের গুরুত্ব। একদম শেষ জনের ১৫ দিন পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত আমরা আইসোলেটেড ছিলাম। গুরুত্ব একটাই, ভাইরাল লোড কমানো, আমার ভাইরাস আমার ক্ষতি করার চেয়ে আমার পাশের মানুষটার বেশি ক্ষতি যাতে করতে না পারে।

উপসর্গের মধ্যে ছিল, প্রথমে জ্বর, গলা ব্যাথা, কাশি কারো বেশি কারো কম, ডায়রিয়া, বডি পেইন (ব্যাক এন্ড চেস্ট স্পেশালি), মাথা ব্যাথা প্রচন্ড, শ্বাসকষ্ট, নাক বন্ধ হয়ে যাওয়া, স্বাদ হারানো, স্মেল না পাওয়া, এবং মোস্ট পেইনফুল সাইনোসাইসটিস। 

জ্বর ছিল প্রথমে একটানা, ৪৮ ঘন্টা জ্বর ছিলোই, কারো কারো ক্ষেত্রে ৭২ ঘন্টা পর্যন্ত টানা জ্বর ছিলো। এরপরের দিনগুলোতে দেখা যেত রাতে আসতো জ্বর, কিন্ত দিনে তেমন থাকতো না।  ৭ দিনের পর বাকিদের আর জ্বর উঠেনি,  তবে আমার ১১-১৪ তম দিন পর্যন্ত আবার রাতে জ্বর আসতো, আমার ছোট বোনেরও একই সমস্যা হয়েছে।

গলা ব্যাথাটাও ভুগিয়েছে। মাইল্ড এবং মডারেট দুইরকমই ছিল। রিমেডি একটাই ছিলো- কুসুম গরম পানিতে লেবু দিয়ে খাওয়া। খেতে একটু ইরিটেইটিং বাট ইট ওয়ার্কস। দিনে একবার করে খেয়েছি গরম পানি। কাশি প্রথমে শুকনো পরে প্রোডাক্টিভ ছিলো, এটার জন্য একমাত্র ঔষধ ছিলো গড়গড়া, উইথ স্পেশাল ওয়াটার। পানিতে এলাচি, দারচিনি, লবঙ্গ, আদা দিয়ে ফুটাতাম ৭-৮ মিনিট, এরপর একটা স্টিলের মগে অল্প নিয়ে ৫-৬ মিনিট স্টিম নিতাম মাথা একটা টাওয়েল দিয়ে, নাক দিয়ে শ্বাস নেবেন, মুখ দিয়ে পাত্রের বাইরে ফেলবেন অবশ্যই, এরপর সেটা একটু হালকা গরম থাকা অবস্থায় গরগর করে নিবেন, সাথে থাকলে একটু কালিজিরার তেলও মিশানো যায়। ঔষধ খেয়েছি শরীরের অবস্থা বুঝে, ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী। 

ডায়রিয়ার জন্য শুধু মাত্র খাবার স্যালাইন, যতবার হয়েছে ততবার বের হয়ে স্যালাইন খেয়েছি। সিভিয়ার চেস্ট পেইন ছিলো, আর ব্যাক পেইন। যে কোনো ভাইরাল ইনফেকশনে চেস্ট  পেইন, বডি পেইন কমন, চেস্ট পেইন ডেভলপ করে ৩-৪ দিন পর- প্রায় ১৮ তম দিনে গিয়ে রিসলভ হয়। ব্যাকপেইন ছিলো আম্মুর অনেক। বড় নরম তোষকে বসলে একটু আরাম বোধ করতেন। পরবর্তীতে এটা কেটে যায়।

এবার আসি মোস্ট পেইনফুল সাইনোসাইটিস- এ। এটা খুব বেশি কষ্ট দিয়েছে। এটার ফিলিংস ছিলো যে প্লেইন জায়গায়, মাথা রাখার পরও মনে হচ্ছিলো অমসৃণ কোথাও মাথা রেখেছি। থার্মোমিটারে একটা ঝাঁকুনি দিলেন বুঝবেন ভিতরে কিছু একটা নড়ে গেছে,  নিচে ঝুঁকলে খুব খারাপ লাগবে, নাক দিয়ে মগজ বেরিয়ে আসবে মতো একটা অনুভূতি হবে! সাইনোসাইসিস এর ঔষধ হিসেবে কাজ করেছে ওই স্টিমই, সাথে মেডিকেশন ছিলো। রিসলভ হতে হতে ১৬ দিনের মতো লাগে, ১০ম দিনের পর শুধু মাথাব্যথাটাই ছিলো।

শেষে শ্বাসকষ্ট। যদি বলি চারপাশে আগুন লেগে আছে, অথচ আপনি বাতাসটা পাচ্ছেন না- এমন একটা অনুভূতি। বিশেষ করে শুতে গেলে এটা হতো, কয়েকবার খুব বেশি খারাপ লেগেছে শ্বাসকষ্টের জন্য। এর জন্য ব্রিদিং এক্সারসাইজ করতাম, স্টিম আর ইনহেলার নিয়েছিলাম।

কিছু পরামর্শ, আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে- সামান্য জ্বর স্ট্রেসের কারণে এসেছে, এসব ভাবার এখন সময় নেই। যেকোন সিম্পটমই আপনার গাফেলতি আপনার পরিবারে জেষ্ঠ্য সদস্য দের জন্য হুমকি হতে পারে। দ্রুত আইসোলেটেড হয়ে যান সবাই। প্রোপার মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজিং চালু রাখবেন। খাবারের মধ্যে ডিম, দুধ, ভিটামিন সি, নিয়মিত খাবার ঠিকঠাক খাবেন। গলাব্যাথা না থাকলে কাশি না থাকলে গড়গড়া তেমন একটা প্রয়োজন হয় না। বাসায় পালস অক্সিমিটার, গ্লুকোমিটার, বিপি মেশিন কিনে রাখুন। শোকেস ভর্তি জিনিস না কিনে দরকারী এই জিনিসগুলো হাতের কাছে রাখা উচিত। 

সিদ্ধান্ত নিতে একদমই দেরী করবেন না, টেনশন হবে, করবেন ঠিক আছে, তবে সবকিছু ম্যানেজ করে! বয়স্ক যারা আছেন তারা রুটিন মেনে যেসব ঔষধ বা নিয়মকানুন মেনে চলেন সেটা অবশ্যই পালন করুন। এখনো যারা আক্রান্ত হননি, দ্রুতই জেনে নেয়ার চেষ্টা করুন আপনার কোমরবিডিটি কন্ট্রোলড আছে কিনা। এটা কন্ট্রোলড থাকলে ইনশাআল্লাহ ইউ ক্যান সারভাইভ...

লেখিকা- ফায়িজা তাসনিম মিশকাত 
ফাইনাল ইয়ার শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (ডেন্টাল ইউনিট)

আরও করোনাজয়ীর গল্প পড়ুন- 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা