করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা, কিন্তু হেরে যাননি। বুকে সাহস নিয়ে লড়েছেন, ভুগেছেন। তবু শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে তাদেরই। করোনার বিপক্ষে যুদ্ধজয়ের এই গল্পগুলো হয়তো আপনাদের সাহস যোগাবে। তাই আমাদের নিয়মিত আয়োজন- সেপনিল প্রেজেন্টস করোনাজয়ী'র গল্প।

এটা আমার মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা। আপনার গল্পটা অন্যরকমও হতে পারে। এই গল্পটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে করোনাযুদ্ধের একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়া। যা আপনার জন্য জানা ভীষণ জরুরি!

জীবনে কিছু কিছু মুহূর্ত উপহার দেয়, যা ভয়ানক। তীব্র সেই সময়গুলো কখনো কখনো মৃত্যুর চাইতেও ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যেই করোনাভাইরাসের মরণ ছোবলের অনেক ঘটনা জেনেছেন আপনারা। এখন যে ঘটনাটি বলবো, সেট হয়তো অনেকের সাহস সঞ্চার করবে। করোনাযুদ্ধে যে জয়ী হওয়া যাবে না, এই ধারণা ভুল। যদি যুদ্ধটা চালিয়ে যেতে পারেন, ভয়ের পরেই জয়। 

আজকের গল্পটা আমার জন্মদাত্রীর, যে মানুষটা মাধ্যমেই এই ধরণীর আলো জলে বেড়ে ওঠা আমার। কীভাবে তিনি বিশ্বব্যাপী ত্রাস সৃষ্টিকারী করোনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সুস্থ হয়ে উঠলেন, সে গল্পটাই করবো আজকে আপনাদের সাথে।

জীবনে ৬৩টা বসন্ত ফেলে আসা আমার মায়ের জন্য করোনাযুদ্ধটা একটু বেশিই কঠিন ছিলো। একে তো বয়স, তার ওপর ব্লাড প্রেশার, এর আগে বেশ কয়েকটা মেজর সার্জারিও হয়েছে উনার। সব মিলিয়ে বেঁচে ফেরাটা মিরাকেলের মতোই।

পুরো জার্নিটার একটা ফটোস্টোরি তৈরি করেছি আমি, যা অন্যদের অনুপ্রেরণা যোগাবে। অনেকে ভুক্তভোগী আছেন, যারা জানেন না কখন কী করতে হবে। এই গল্পের ধাপগুলো তাদের জন্য গাইডলাইন হিসেবেও সাহায্য করবে। এই ভাইরাসের সাথে যুদ্ধ করতে হলে, প্রথমেই একে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। আশেপাশে অনেক ভুলভাল তথ্য আছে। নিজ অভিজ্ঞতা থেকে সঠিক তথ্যগুলো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

সাথে রাখুন সেপনিল হ্যান্ড স্যানিটাইজার

দিন ১ থেকে ৪

মায়ের দিনটা শুরু হয়েছে মাথাব্যাথা দিয়ে। সাথে ছিলো হাই ব্লাড প্রেশার। যদিও অসুস্থ অবস্থায় থাকার কারণে এগুলোকে স্বাভাবিক মনে হচ্ছিলো। নিয়মিত মেডিসিন চলছিলো উনার।

দিন ৫

পঞ্চম দিন থেকে মা দুর্বল বোধ করা শুরু করলো। দিনের বেলাতেই শুয়ে থাকা শুরু করলো।

দিন ৬

মা একদম বিছানায় পড়ে গেলো। গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে, এগুলো কোভিড-১৯ এর লক্ষণ না। যেমনটা আমরা ভেবেছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছি আমাদের ধারণা কতটা ভুল ছিলো। বয়স্ক মানুষদের জন্য ব্যাপারটি আলাদা। বয়স্ক মানুষেরা কোভিড-১৯ এর চাইতে হাইপক্সিয়াতে বেশি মারা যায়। এক্ষেত্রে সাইলেন্ট হাইপক্সিয়া বলা যেতে পারে।

করোনাভাইরাস মূলত ফুসফুসকে দুর্বল করে দেয়, যে কারণে পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন ফুসফুস নিতে পারে না। সাধারণ অবস্থায় এটা হলে হাঁপিয়ে ওঠার কথা। কিন্তু করোনা আক্রান্ত হলে, ফুসফুস অক্সিজেন নেয়ার পরিমাণ এমনভাবে কমিয়ে দেয়, যেন মনে হয় ব্রেন থেকে তাকে এভাবেই কাজ করতে বলা হচ্ছে। তাই প্রাথমিকভাবে হাঁপিয়ে উঠতে দেখা যায় না। আস্তে আস্তে যখন শরীরটা দুর্বল হয়ে ওঠে, তখনই মূল শ্বাসকষ্টটা শুরু হয়। ততক্ষণে বড্ড দেরি হয়ে যায়।  

দিন ৭

শুষ্ক কাশি দেখা দেয়। উনি এয়ারকন্ডিশনে থাকাতে, কোভিড-১৯ এর সন্দেহটা তখনো পুরোপুরো জেঁকে বসেনি।

সেই নির্ঘুম রাত। আমার মায়ের সেবার বোনটাও করোনা পজিটিভ হয়ে গেছিলো। এখন সে সুস্থের পথে।

দিন ৮

কাশিটা তীব্র হতে থাকে, শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে।

এখানে লক্ষণীয় যে, কাশিটা ঠান্ডার জন্য হয় না। এটা হয় মূলত দুর্বল ফুসফুসের জন্য যা পর্যাপ্ত অক্সিজেন নিতে পারেনা। ফলে কাশির উদ্রেক করে। সমস্যাটা হচ্ছে, এই সময়ে ভাইরাসটা ফুসফুসে অক্সিজেন প্রবেশে বাঁধা দেয়, এবং একই সাথে মস্তিস্ককে বোকা বানিয়ে রাখে। যতক্ষণে মস্তিস্ক সেটা বুঝতে পারে, বড্ড বেশি দেরি হয়ে যায়।

শরীর যখন আরো অক্সিজেনের তাগিদ দেয়, ফুসফুস সেটা আর করতে পারে না। এভাবেই একটা ওভার প্রেশার তৈরি হয় যার কারণে অর্গান ফেইলিয়র হয়। ঠিক এ সময়টাতে ভাইরাসটার কিছু করা লাগে না, শরীর নিজেই একটা প্রেশার তৈরি করে রাখে যেটা আক্রান্ত মানুষটা আর সহ্য করতে পারে না। শরীর নিজ তাগিদে ফুসফুসকে ধ্বংস করে দিতে থাকে।

আমার মা

দিন ৯

ভেবে দেখলাম, আমার মায়ের যদি শ্বাসকষ্ট বাড়তে থাকে তবে যেকোনো সময়ে তার অর্গান ফেইল করতে পারে। তাই আমরা একটা অক্সিজেন সিলিন্ডার কিনি। এবং সেটার সাহায্যে তাকে অক্সিজেন দেয়া শুরু করি। এখানে সবচেয়ে গুরত্বপূর্ণ যে পরামর্শটি দিতে চাই, সেটার সবচেয়ে বেশি দরকার ভুক্তভোগীর জন্য। অক্সিজেন স্যাচুরেশন ( SpO2) লেভেল ৯৭-৯৮ শতাংশ রাখতে হবে। এটা একদম মাস্ট। কোনোভাবেই এর নড়চড় করা যাবে না। সিলিন্ডারের সাথে অবশ্যই অক্সিজেন মাস্ক ব্যবহার করতে হবে।  

এতে করে শরীর তার জন্য পর্যাপ্ত অক্সিজেনের সন্ধান পায়। এবং ফুসফুসকে অক্সিজেনের জন্য তাগিদ দেয়া কমিয়ে দেয়। ফলে ফুসফুস আরাম করতে পারে। শরীর তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরত আসে। এই কাজটা যদি ঠিকঠাক মতো করতে পারেন, তবে যুদ্ধা এখানেই অর্ধেক জেতা হয়ে যায়।

আমার বাবা

দিন ১০

আমরা একটা লোকাল হাসপাতালের রুম ভাড়া নিই। সেখানে আমি আর আমার বোন নিজেকে আবদ্ধ করে রাখি মায়ের সাথে, যাতে অন্য কেউ সংক্রমিত হতে না পারে। এসময় এক ডাক্তার বন্ধুর পরামর্শে কিছু মেডিসিন খাওয়ানো শুরু করি।

  • Hydroxychloroquine Sulphate (Tablet: Reconil) যেটা ম্যালেরিয়ার মেডিসিন, সকালে একটা এবং রাতে একটা।

  • Azithromycin 500 (Tablet: Azyth) এন্টিবায়োটিক, সকালে একটা এবং রাতে একটা।

  • Montelukast Sodium (Tablet: Montair) এজমার মেডিসিন, প্রতিদিন একটা করে।

  • Rivaroxaban 10 (Tablet: Rivarox) এন্টিকোগুলেন্ট মেডিসিন যা রক্তজমাট বাঁধতে বাধা দেয়, সকালে একটা এবং রাতে একটা।

  • Favipiravir 200 (Favipira)  ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাসের ড্রাগ, প্রথমদিন .৮ ট্যাবলেটের বুস্টার, পরের দিন থেকে সকালে ৩টা এবং রাতে ৩টা।

  • Methyl Prednisolone 16 (Tablet: Methipred) শ্বাসকষ্ট ছাড়াও এটি কিছু প্রতিবন্ধকতার জন্য কাজ করে।

  • Xinc 20 (Tablet: Xinc) জিঙ্ক সাপ্লিমেন্ট, সকালে একটা এবং রাতে একটা।

  • Vitamin D (Tablet: Osteo D) ভিটামিন ডি, সকালে একটা এবং রাতে একটা।

  • Moxifloxacin Hydrochloride (Tablet: Optimox) সাইনোসাইটিস এর মেডিসিন, সকালে একটা এবং রাতে একটা।  

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, রোগীকে সবসময় অবশ্যই সাপ্লিমেন্টারি অক্সিজেন নিতে হবে মাস্ক ও সিলিন্ডার দিয়ে, এবং আঙুলের সাহায্যে একটা অক্সিমিটার কানেক্টেড থাকবে যেটা দিয়ে মনিটর করে অক্সিজেন স্যাচুরেশন ( SpO2) লেভেল ৯৭-৯৮ শতাংশ রাখতে হবে।

এটার মাধ্যমে রোগীর ফুসফুস চাপমুক্ত থাকে, যাতে করে মূল চিকিৎসা চালিয়ে নেয়া যায় নির্বিঘ্নে। এই মেডিসিনগুলো বেশ কাজ দিয়েছে। বিশেষ করে Reconil, Azyth, Favipira এগুলো ভাইরাস আক্রান্তের সাইড এফেক্ট কমাতে সাহায্য করেছে। শরীরের ইমিউন সিস্টেমই যখন ভাইরাস আক্রান্ত হয়ে যায় রক্ত জমাট বাঁধতে শুরু করে, সেটা থেকে মুক্ত থাকতে সাহায্য করেছে Rivarox, Methipred শ্বাসকষ্ট ছাড়াও অন্যান্য জটিলতায় সাহায্য করেছে। জিঙ্ক আর ভিটামিন ডি ইমিউন সিস্টেমকে শক্তিশালী করতে সাহায্য করেছে।

কোনো এক বিষন্ন মুহূর্তে

দিন ১১

অক্সিজেনের স্যাচুরেশন লেভেল ঠিক রেখে এবং ভাইরাসের সাইড ইফেক্টের জন মেডিসিনগুলো চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম ইমিউন সিস্টেমকে বুস্ট করানোর। যাতে করে ভাইরাস শরীর থেকে বিতাড়িত হয়ে যায়।

  • ইমিউন সিস্টেম শক্তিশালী করার প্রথম উপায় হচ্ছে যথেস্ট পরিমাণে খাবার, ঘুম এবং বিশ্রাম।

  • লোহিত রক্ত কণিকার গিমোগ্লোবিনে অক্সিজেন থাকে, যা শরীরে বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন সরবরাহ করে। একইসাথে আইরন, জিংকের মত মিনারেল শরীরে শক্তি যোগায়।

  • আমরা মাকে ডিম, রুটি খাইয়েছি সকালে। ভাত, মাংস, সবজি খাইয়েছি দুপুরে এবং রাতে।   

  • খাবারের মাঝেও উনাকে চিকেন ব্রথ খাওয়ানো হয়েছে, এটা প্রচুর শক্তি যুগিয়েছে।

দিন ১২-১৭

যখনই মা সজাগ থাকতেন, আমরা তাকে স্টিম দেয়াচ্ছিলাম। গরম পানিতে আদা, লবঙ্গ, দারচিনি, এলাচি, পুদিনা পাতা দিয়ে সেটার বাস্পতে শ্বাস নেয়াচ্ছিলাম। ইউটিউব দেখে “chest percussion therapy” শিখেছিলাম, যা পাশাপাশি এপ্লাই করছিলাম। এতে করে তিনি কেশে কেশে কফ বের করছিলেন। যাতে বোঝা যাচ্ছিলো যে থেরাপিতে কাজ হচ্ছে।

এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, মেডিসিনের পাশাপাশি এই স্টিম এবং থেরাপি দুটোই দারুণ কাজে দিয়েছে। ইউটিউব দেখে এই “chest percussion therapy” শেখা উচিত ভুক্তভোগীদের, এবং সাথে  "Proning" পদ্ধতিও ভালোভাবে বুঝে নেয়া উচিত। এটা অনেক বেশি সাহায্য করেছে। এবং রোগীকে যত বেশি সম্ভব ঘুম পাড়িয়ে রাখতে হবে। এতে ইমিউন সিস্টেম বেশি শক্তি সঞ্চার করতে পারে।

ডায়াবেটস- রোগীর ডায়াবেটিস থেকে থাকলে সেটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে বেশি জরুরী। এটা নিয়ন্ত্রণ ছাড়া হয়ে গেলে খুব তাড়াতাড়ি বড় কোনো অঘটন ঘটতে পারে। আমি একটা ডায়াবেটিস টেস্টের চার্ট তৈরি করেছিলাম। খাবার আগে এবং দুই ঘন্টা পর টেস্ট করতাম। তারপর সেটা চার্টে টুকে রাখতাম। সুগারকাউন্টের দিকে বিশেষভাবে নজর দিতে হবে।

যাতে এটা মাঝামাঝি থাকে। হাই সুগার ইমিউন সিস্টেমকে অলস করে দেয়। আবার সুগার লো হয়ে গেলে সেটা ডায়েবেটিক কোমা কিংবা মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। করোনা আক্রান্ত ব্যাক্তিটি যদি ডায়াবেটিক হয় তবে সেটা ব্যালেন্স করে রাখা খুব জরুরি, নয়তো করোনার আগে ডায়বেটিসই রোগীকে মেরে ফেলবে। অবশ্যই অবশ্যই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। একদম সঠিক নিয়ন্ত্রণে। 

এক্সরে এবং সিটি স্ক্যান- এগুলো অবশ্যই করতে হবে, যতদ্রুত সম্ভব। এতে বোঝা যাবে ফুসফুস কী অবস্থায় আছে। "ground glass lesions" বলতে একটা টার্ম আছে। এটার মাধ্যমে রিপোর্টে বোঝা যায় রোগী করোনায় আক্রান্ত আছেন কিনা।

ব্লাড টেস্ট- প্রতি পাঁচ দিনে এই টেস্ট করাতে হবে। CBC, CRP, FERRITIN TEST.

CBC- Complete Blood Count including electrolytes । ইলেক্ট্রোলাইট হচ্ছে শরীরে পোটাশিয়াম, ক্যালসিয়ামের মতো মিনারেলের পরিমাণ। lymphocites  হচ্ছে শ্বেত রক্ত কণিকার পরিমাণ। এগুলো একটু বাড়তি থাকা স্বাভাবিক, যখন শরীর কোনো ইনফেকশনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, এমনটা হয়। এই রিপোর্ট দেখলে বোঝা যায় শরীরে কোন ধরণের খাবার দরকার। যেমন কলায় রয়েছে আয়রন, লবণে সোডিয়াম। শরীরে electrolyte কমে গেলে এই খাবার বাড়িয়ে দিতে হবে।

CRP - C-reactive protein শরীরে inflammations খুঁজে বের করে। করোনা পজিটিভ থাকলে এটার রেজাল্ট হাই আসবে। আস্তে আস্তে কমবে।

Ferritin test - To check the level of Iron in the body, শরীরের অক্সিজেন পরিবহনের ক্যাপাসিটি নির্ধারণ করে আয়রন। এটা চেক করা এবং নিয়ন্ত্রণে রাখা খুব দরকার।

দিন ১৮

আমরা মাঝে মাঝে অক্সিজেন মাস্ক খুলে চেক করতাম। নিজে থেকে শ্বাস নিতে পারছে কিনা। এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া প্রথম এক ঘন্টায় অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল নেমে আসতো ৯৩% এ। আবার পাঁচ ঘন্টার জন্য অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে দিতাম। আবার দুই ঘন্টার জন্য খুলে রাখতাম।

খোলা অবস্থায় ৯৩-৯৪% অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল থাকতো। তবে রাতের বেলায় ঘুমানোর সময় অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে রাখতাম। কারণ ঘুমের সময় শরীরের ইমিউন সিস্টেম বেশি কাজ করে, সেসময় পর্যাপ্ত পরিমাণ অক্সিজেন দরকার। আস্তে আস্তে দিনের বেলায় ছয় ঘন্টা মাস্ক ছাড়া রাখার চেষ্টা করলাম। এসময় ৯৪-৯৫% থাকতো অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল।

দিন ১৯-২১

এই পুরোটা দিন মাকে অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া রেখেছিলাম। স্যাচুরেশন লেভেল ৯৫-৯৬% এ ছিলো।

দিন ২২

তিনি যখন তিন দিন অক্সিজেন মাস্ক ছাড়া শ্বাস নিতে পেরেছেন, তখন আমরা তাকে বাসায় নিয়ে আসলাম। স্যাচুরেশন লেভেল ৯৫-৯৬% এ ছিলো। তবে অক্সিজেন সিলিন্ডার সবসময় পাশেই থাকতো। এবং রাতে সেটা ব্যবহার করতাম। তবে আস্তে আস্তে তিনি নিজ থেকেই পর্যাপ্ত অক্সিজেন গ্রহণ করা শিখলেন। আস্তে আস্তে অক্সিজেন স্যাচুরেশন লেভেল মাস্ক ছাড়া ৯৭-৯৮% তে উঠলো।

পরিশেষে কিছু কথা বলতে চাই। 

কিছু ব্যাপার আপনাকে একদম পরিস্কার বুঝতে হবে। রোগের চিকিৎসা করার আগে আপনাকে রোগটাকে বুঝতে হবে, এটা কিভাবে ক্ষতি করে সেটা খুঁজে বের করতে হবে। এটা আমার মায়ের সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা। আপনার গল্পটা অন্যরকম হতে পারে। ডায়াবেটিস বা ব্লাড প্রেশার নাও থাকতে পারে। একদম স্পেসিফিক শারীরিক অবস্থার জন্য স্পেসিফিক রিসার্চ করতে হবে আপনাকে।

এই গল্পটা বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে করোনাযুদ্ধের একটা প্রাথমিক ধারণা দেয়া। আমার নিজের সাথে ঘটে যাওয়া অভিজ্ঞতা শেয়ার করা। আশেপাশে বহু বানানো গল্প এবং গুজব ঘুরছে, সেসব থেকে সাবধান থাকবেন। মনে রাখবেন, করোনাযুদ্ধের আগে আপনাকে হাইপক্সিয়াকে হারাতে হবে। সেখান থেকে যুদ্ধটা শুরু হবে।  

শুধু হাসপাতালের দায়িত্বে ছেড়ে দিলে হবে না। নিজেকে উদ্যোগ নিয়ে অনেক কিছু জানতে এবং বুঝতে হবে। আপনি আপনার প্রিয়জনের জীবন না জেনে বুঝে বিলিয়ে দিতে পারেন না, নিজের জন্য হলেও জানার যুদ্ধটাও চালিয়ে যেতে হবে। আমি একটা ক্যালকুলেটেড রিক্স নিয়েছিলাম। আমার কাছে মনে হয়েছে হাসপাতালে ধুঁকে ধুঁকে মরা চাইতে, বাসাতেই পুরো চেষ্টাটা চালাই আমরা। এবং সব সময় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়েছি।

করোনা বিজয়ের হাসি 

কখনো ভাবিনি গল্পটা এভাবে লিখতে পারবো। শেষটা সুন্দর হবে। সৃষ্টিকর্তার দয়ায়, আমার মা এখন বাসায় আছেন। এই কয়টা দিন আমি আমার পরিবারকে যা বলেছি, সেটা আপনাদেরকেও বলতে চাই। শক্ত থাকুন, কঠোর হোন, নিজের পুরোটা দিন, এবং সবচেয়ে জরুরি যেটা, সেটা হচ্ছে বিশ্বাস রাখুন! 

আরও পড়ুন-


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা