করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন তারা, কিন্তু হেরে যাননি। বুকে সাহস নিয়ে লড়েছেন, ভুগেছেন। তবু শেষ পর্যন্ত জয় হয়েছে তাদেরই। করোনার বিপক্ষে যুদ্ধজয়ের এই গল্পগুলো হয়তো আপনাদের সাহস যোগাবে। তাই আমাদের নিয়মিত আয়োজন- সেপনিল প্রেজেন্টস করোনাজয়ী'র গল্প।

আমিনা ফাতেমা ইকবাল লিজ: বাসায় ছোট দুটো বাচ্চা থাকার কারণে আমার ভাই ভাবী শুরু থেকেই প্রচন্ড সাবধান ছিল করোনার ব্যাপারে। ফুল প্রটেকশন নিয়ে ভাইয়া সপ্তাহে একদিন করে বের হয়েছিল বাসার জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য। সেই ভাইয়া যখন বলছে গলা ব্যথা, গা গরম তখন প্রাথমিক ভাবে মাথাতেই আসেনি এটা কোভিডের উপসর্গ হতে পারে। মে মাসের ১৭ তারিখে ভাইয়ার রিপোর্ট পজিটিভ আসে, তখন আমি ২/৩ সেট কাপড়, ব্রাশ আর ফোনের চার্জার নিয়ে ভাইয়ার বাসায় শিফট হই। আম্মা প্রচন্ড ভয় পাচ্ছিল আমাকে নিয়ে, কিন্ত আমি ভয়ের তোয়াক্কা করিনি৷ 

ভাইয়ার পজিটিভ রিপোর্ট আসার  একদিন পরে ভাতিজির জ্বর, তার একদিন পরেই ভাবী। ভাইয়ার লক্ষন ছিল প্রচন্ড জর, কাশি গলা ব্যাথা গা ব্যাথা, ভাতিজি কমপ্লেইন করছে ফুপু গা ব্যথা খুব, গলায় খুব ব্যথা। ভাবীরও একই অবস্থা।ভাইয়ার জ্বর একবার উঠলে আর কমতে চায় না, ভাবি, ভাতিজির জ্বর উঠানামা করতো। আমি ২০ তারিখ রাতে প্রথম বুঝি গা ব্যথা, সাথে গলায় অস্বস্তি। আমার ২১ তারিখে প্রথম জর আসে আর সেই সময় থেকে নেক্সট দশ দিন ঠিক সন্ধায় জ্বর এসেছে। গলার কাছে কি যেন একটা আটকে থাকার অনুভূতি। আমি কোন ঘ্রাণ পাই না খাবারের, সাথে মুখে কোন স্বাদ নেই।

সাথে রাখুন সেপনিল হ্যান্ড স্যানিটাইজার

কুর্মিটোলা হাসপাতাল এর ডাক্তার এর ক্লজ অবজার্ভেশনে আমরা চারজন ছিলাম। আমাদের বয়স ভিন্ন, মেডিসিনও ভিন্ন। ডাক্তারের কথার বাইরে আমরা কেউ একটা ঔষধ খাইনি। ভাইয়া পজিটিভ হবার সাথে সাথে অক্সিমিটার কিনে নিয়ে এসেছিলাম আমি। যেহেতু ভাইয়াকে নিয়ে প্রচন্ড ভয়ে ছিলাম তাই বাসায় অক্সিজেন সিলিন্ডারও রেডি ছিল। যে এন্টিবায়োটিক খেয়ে ভাইয়ার জ্বর কমে গেছে, ভাবীর জ্বর নেমে গেছে, আমি ও আশাবাদী হয়ে উঠছিলাম আমারও কমে যাবে। কিন্ত তার কিছুই হলো না। 

আমি ৭ দিনের জায়গায় ১০দিন এন্টিবায়োটিক খেয়ে বহু কষ্টে জ্বরকে নিজের নাগালে নিয়ে এসেছি। খেতে পারতাম না, সবকিছু তিতকুটে আর লবনাক্ত লাগতো। আমি গরম পানি দিয়ে কুলি করতে গেলে বমি করে ফেলতাম, তাই গরম পানি খেয়ে নেয়া বেশি প্রেফার করেছি। মশলা চা (আদা তেজপাতা লং ফোটানো পানিতে চা দিয়ে খেতাম বেশি করে)। আমার কিটো ডায়েটের অভ্যাস ছিল আর সেই জন্য আপেল সাইডার ভিনেগার খেয়ে গেছি প্রতিদিন। ভিটামিন সি (লেবু, মাল্টা- রেগুলার খেয়ে গেছি)
আম্মা চাররকম মশলা বেটে একটা আচার এর মত বানিয়ে দিয়েছিল, ওটা কাশির সময় খুব আরাম দিয়েছে। 

এখন পর্যন্ত আমি যা যা লিখেছি তার সবকিছুই আমরা জানি মোটামুটি। এখন সেগুলোই লিখছি যা আমাদের অনেকের অজানা। ভাইয়া কোভিড পজিটিভ শোনার পর থেকে ভাইয়ার বাসার প্রতিবেশীদের দ্বারা আমরা প্রচন্ড ভাবে হেনস্থার শিকার হয়েছি। পুলিশ এসে বাসায় লাল পতাকা আটকে দিয়ে গেছে সাথে যাচ্ছেতাই ব্যাবহার, প্রতিবেশীদের কন্টিনিয়াস ফোন। আমাদের বাসার জিনিসপত্র, বাজার, ঔষধ দিয়ে যাবার জন্য ড্রাইভারকে বাসার সিড়িতে আসার অনুমতি পর্যন্ত দেয়া হয়নি। আমার ধারণা, আমরা যদি আর একটু দুর্বল সামাজিক অবস্থানের মানুষ হতাম আমাদের হয়তো বাসা ছাড়ার নোটিশ পেয়ে বসতাম!

বাসার সবাই আমরা কোভিড পজিটিভ ছিলাম, কিন্ত এর মানে কিন্ত এই না যে আমরা বাসায় যে যার মত চলাফেরা করেছি। ভাবী তার ছেলেকে ফিডিং করানোর সময়ও মাস্ক পরে থেকেছে। লিখতে ভুলে গেছি, আমার ভাতিজার আড়াই বছর বয়স, সেও তার আম্মু আর আপুর সাথে কোভিড পজিটিভ ছিল।ভাইয়া ভাতিজার পজিটিভ আসা সাথে সাথে চাইল্ড স্পেশালিষ্ট এর সাথে যোগাযোগ করেছিল। ভাতিজার জ্বর-কাশি টাইপ কোন সিম্পটম না থাকায় ওকে নিয়ে ভয় পেতে না করেছিলেন ডাক্তার। 

ভাতিজার কষ্ট সবচেয়ে বেশি ছিল আপুকে পাচ্ছে না খেলার সময়, আব্বু কাছে আসেনা। বোনের রুমের দরজায়, আব্বুর রুমের দরজায় গিয়ে ডাকাডাকি করতো, কাঁদতো। একদিন চাবি নিয়ে বোনের রুমে চলে গেছে, রুমের লক খুলে ভিতরে যাবে বলে। ভাইয়া তার রুমে বদ্ধ সেই মে মাসের ১৭ তারিখ থেকে। দুই সপ্তাহ পরে (৩০/৫/২০) সে প্রথম তার রুমের বাইরে এসেছে, বাচ্চাদের কোলে নিয়েছে। রুমের সামনে রাখা চেয়ারে আমি খাবার পানি সবকিছু দিয়ে আসতাম। ভাইয়ার তিন বেলার খাবার ডিস্পোজেবল বক্সে ভরে দিতাম, আর রুমে ইলেকট্রিক কেটলি, পানির ফ্লাস্ক রাখা ছিল। 

কোভিড ভাইরাস একেকজনের উপর এক এক রকম ইম্প্যাক্ট ফেলবে। আমি আর ভাইয়া জ্বরে ভুগেছি, ভাতিজি বা ভাবী জ্বরে এতটা সাফার করেনি। ভাইয়া আর আমি কাশি নিয়ে কষ্ট পেয়েছি, আমি সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি গা জ্বালাপোড়া নিয়ে, শ্বাসকষ্ট নিয়ে। অনেকে এই সময়টায় পেটের পীড়ায় ভুগেছেন বলে শুনেছি, আমাদের পেটের ট্রাবল হয়নি আলহামদুলিল্লাহ। 

আপনার লক্ষন নেই মানেই যে আপনি স্বাধীন এবং গায়ে হাওয়া লাগিয়ে ঘুরে বেড়াবেন- এটা একটা মারাত্মক ভুল ধারণা। আপনি নিজেও জানবেন না কখন আপনি আরেকজনকে ভাইরাস দিয়ে বসছেন। নিজের শরীরকে বুঝুন, ফিল করুন। কোন রকম অস্বস্তি বা পরিবর্তন অনুভব করার সাথে সাথে আলাদা করে নিন নিজেকে। কোভিডকে হেলাফেলা করার মত ভুল করবেন না। ওজন কমানোর প্রসেসে ছিলাম জানুয়ারি মাস থেকে, সেজন্য বলব আমার রক্তে সুগার এর পরিমান ছিল নিয়ন্ত্রণে। ডায়েট এর সাথে আমার এক্সারসাইজের প্র‍্যাক্টিস ছিল। আমি গত জানুয়ারি থেকে খুব কম দিন ছিল যেদিন ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ স্কিপ করেছি। ব্রিদিং প্র‍্যাক্টিস চালিয়ে গেছি নিয়মিত। 

সুগার যদি আগে থেকে কমিয়ে না রাখতাম আর ওজন যদি কমিয়ে নিয়ে না আসতাম কোভিড জার্নিটা জিতে যাওয়া ডিফিকাল্ট হত আমার জন্য, হয়তো ধুঁকে ধুঁকে কষ্ট পেতাম আরো বেশি, মরে যাওয়াও অস্বাভাবিক হতো না। টানা লম্বা সময় এক পাশ ফিরে ঘুমাতাম না, লম্বা সময় ধরে পানি না খেয়ে থাকলে খেয়াল করতাম গলা ব্যথা করছে, কাশি উঠে যাচ্ছে। এই ক্ষেত্রে আমার ছোট্ট একটা সাজেশন হলো- মাথা কিছুটা উঁচু রেখে ঘুমানো বা রেস্ট করবেন। দম আটকে আসার অনুভূতি হবে না, হাতের কাছে পানি/জুস/স্যুপ যা পাবেন তাই রাখবেন, গলা কোন অবস্থায় ড্রাই হতে দেয়া যাবে না। 

কোভিড পজেটিভ এর স্ট্রেস যতটা না শারীরিক, তার চাইতে অনেক বেশি মানসিক। আমি প্রচন্ড জ্বরে ছটফট করেছি, কিন্ত আমার পাশে কেউ নেই (প্র‍্যাক্টিক্যালি)। ঈদের দিন সকালে উঠে মনে হলো, আল্লাহ যদি আমাকে এরকম কঠিন একটা দিন দেখাতে পারেন, তাহলে সেই পরীক্ষায় পাশ করার দায়িত্ব আমার নিজের, আমি হার মানব না। কেঁদেকেটে একাকার করে গরম পানি প্লাস্টিকের বড় মগে নিয়ে বসে জোরে জোরে শ্বাস নিয়ে নিজের মধ্যে টেনে নিয়েছি। আমি আম্মার ন্যাওটা প্রচন্ড রকম, যখন বুঝতে পারছি কথা আটকে যাচ্ছে আমার, তখন কথা বলাও কমিয়ে দিয়েছি।

আমি আমার লেখার মাধ্যমে সবাইকে সচেতন করতে চাই এই বলে, খুব সাবধানে থাকুন,কিভাবে ইনফেক্টেড হলেন এইটা নিয়ে কূল-কিনারা খুঁজে সময় নষ্টের দরকার নেই, লুক ফরোয়ার্ড। নিজেকে সেভ করুন, ফ্যামিলির বাকি সবার টেক কেয়ার করুন, হাত ধোয়া, স্যানিটাইজ করা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতার কোন বিকল্প নেই। গরম পানি খান সারাদিনে গোটা দশেকবার, এটা একটা রেগুলার ফ্যামিলি ইভেন্ট ক্রিয়েট করুন, সবাই একসাথে বসে গরম পানি খান। আমি এই জীবনে আর কখনো ঠান্ডা পানি ছুঁয়ে দেখব না বলে শপথ করেছি। গরম পানি ভালো না লাগলে মধু অ্যাড করেন, আদা কুচি অ্যাড করেন। 

আমি ফার্মেসী অনুষদের একজন ছাত্রী। আমি কোনভাবেই আমার মেডিসিন এর নাম শেয়ার করব না, কারন বয়স এবং সিম্পটম অনুসারে মেডিসিন চেঞ্জ হয়েছে।  তবে হ্যাঁ, একটা কথা- আমাদের ডাক্তার সবসময় জিংক ট্যাবলেট নিতে বলেছেন আমরা সবাই জিংক সাপ্লিমেন্ট খেয়ে গেছি। ভিটামিন সি ট্যাবলেট পছন্দ ছিল না আমার কোন কালে। আমি গোটা লেবু গোটা মাল্টা চিপে খেয়ে নিয়েছি বারবার করে। শরীরের টেম্পারেচার মনিটরিং করেছি রেগুলার কারন আমার সিম্পটম ছিল গা হাত পা বরফ এর মত ঠান্ডা কিন্ত জ্বর ১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট। জ্বর যখন কমে আসত তখন তাপমাত্রা ৯৪/৯৬ ডিগ্রি হয়ে যেত।

আমি সর্বোপরি শোকরগুজার করি আল্লাহতালার, কারন আমি এরকম একটা অসুখে ভুগব, এটা নিশ্চয়ই তার প্ল্যানের অংশ ছিল। এবং আমি সব অবস্থায় আলহামদুলিল্লাহ বলার সাহস রাখি৷ এই যুদ্ধ জয়ে অনেকের সাহায্য পেয়েছি, অনেকের বাজে চেহারাটাও দেখে নিয়েছি। কারো প্র‍তি আমাদের ক্ষোভ বা অভিমান নেই। শুধু বলব, করোনারোগীর সাথে এমন কোন ব্যবহার আপনারা করবেন না, যেন মনুষ্যত্বের ওপর থেকেই তার ভরসা উঠে যায়। 

আমার এত বড় পোস্ট পড়ে জদি আপনার এতটুকু উপকার হয় তাহলে নিজেকে ভাগ্যবতী মনে করব। সবার কাছে অনুরোধ, যদি অসুস্থ হয়ে পড়েন তাহলে ডাক্তারের সাথে কথা বলেন দেরি না করে, ভয়-লজ্জা, কি করব, কি হবে- এসব কিছু মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে দিন। আপনার প্রতিবেশী আত্মীয়-স্বজন কেউ করোনায় আক্রান্ত হলে তাদের পাশে দাঁড়ান, হেল্প করেন, খাবার রান্না করে পাঠান, জিজ্ঞেস করেন কোন ভাবে তাদের কোন সাহায্য করতে পারেন কিনা। আমরা এমন অনেকেরই সাহায্য পেয়েছি, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি সবার প্রতি। 

আমাদের রিপোর্ট নেগেটিভ হওয়া থেকে ১৪দিন পর আমরা প্লাজমা ডোনেট এর জন্য এলিজেবল হবো। তাই এন্টিবডি টেস্ট এর পরে আমি এবং ভাইয়া অবশ্যই প্লাজমা ডোনেট করব ইনশাআল্লাহ। আমাদের দুই ভাইবোনের ব্লাড গ্রুপ খুব সহজলভ্য না। আমার জন্য আপনারা দোয়া করবেন, যেন হাই পাওয়ার এন্টিবায়োটিক এর ধকল আমি কাটিয়ে উঠতে পারি, আগের মত সুস্থ সবল হয়ে চলা ফেরা করতে পারি। 

একবার আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে যাওয়াই মানেই সবকিছু শেষ না, আমি আগের থেকে আরো ক্রিটিক্যাল ভাবে ভাইরাসের ক্যারিয়ার হিসেবে কাজ করতে পারি। সো স্টে কেয়ারফুল। হেলাফেলার সুযোগ নেই একদম! করোনা রেজাল্ট নেগেটিভ আসার পরেও আমি সর্বোচ্চ সতর্ক থেকেছি। আমি ভাইরাস ক্যারিয়ার হিসেবে আম্মাকে ইনফেক্টেড করতে পারি ভেবে সুস্থ হবার পর ১৪ দিন পার না হলে নিজের বাসাতেও ফিরে যাইনি। 

লাস্ট একটা মেসেজ। আমি সহ আমার পুরা ফ্যামিলির জন্য আপনারা যারা দোয়া করেছেন, মেন্টাল সাপোর্ট দিয়েছেন, আপনাদের এই প্রার্থনাটুকু, ভরসাটুকু অনেক দরকারী ছিল। এগুলো আমাদের জন্য মনোবল বাড়ানোর কাজ করেছে। করোনারোগীর জন্য মানসিক শক্তিটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, এটার যোগান দিয়েছেন আপনারা। টাকা পয়সা দিয়ে আপনি সবকিছু কিনে নিতে পারবেন, কিন্ত মানুষ এর মমতা আর ভালোবাসা তো টাকা দিয়ে কেনা যায় না...

আরও পড়ুন-


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা