পঞ্চাশ-ষাটের দশকে একজন নারীকে ফটোগ্রাফার হিসেবে মানতেই পারেনি কেউ। লোকে হাজারটা কথা বলেছে, সাইদা সেসবের জবাব না দিয়ে একমনে নিজের কাজটা করে গেছেন, ক্যামেরার শাটার কথা বলেছে তার হয়ে, জবাব দিয়েছে তার তোলা ছবি...

বড় বড় ক্যামেরা দেখে প্রথমবার মেয়েটা ভয় পেয়েছিল। কখনও কল্পনাতেও ছিল না, এই ক্যামেরা জিনিসটাই তার আজীবন সঙ্গী হয়ে যাবে, ক্যামেরা হাতে তিনি লিখবেন ইতিহাস, নারী জাগরণের নতুন এক অধ্যায়। বারো বছর বয়সে বাসার ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা শুরু করার সময় পরিবারের সদস্যরাও ভাবতে পারেনি, ছবি তোলার ভূতটা চিরস্থায়ী সাথী হয়ে থাকবে তাদের মেয়ের, এই শখ কখনও নামবে না মাথা থেকে। সাইদা খানম, পাবনায় জন্ম নেয়া এলোকেশি এক তরুণী পঞ্চাশের দশকে তৎকালীন সমাজ-সংসারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন ফটোগ্রাফার হবার। আজ যখন তিরাশি বছর বয়সে সেই মানুষটা অন্য ভূবনে পাড়ি জমালেন, পেছনে রেখে গেলেন কর্মময় এক জীবন, নিজের হাতে তোলা হাজার তিনেক ছবি, আর সব বাধা ভেঙে এগিয়ে চলার অবিশ্বাস্য এক গল্প।

সাইদা খানমের জন্ম ১৯৩৭ সালে, পাবনা জেলায়। বড় হয়েছেন ঢাকায়, পরিবারে পড়াশোনার আবহ ছিল, মেয়ে বলে পড়ালেখা না করিয়ে ঘরে বসিয়ে রাখার পরিবেশ ছিল না। সাইদা নিজেও ছিলেন মেধাবী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স করেছেন, তারপর আলাদা দুটো বিষয়ের ওপর মাস্টার্স ডিগ্রি নিয়েছেন দুইবার। তবে পড়াশোনার আগে তার প্রথম ভালোবাসা ছিল ফটোগ্রাফি, প্রেমটা হয়েছিল ক্যামেরার সঙ্গে।

১৯৪৯ সালের কথা, সাইদার বয়স তখন ১২ বছর। বাসায় থাকা পোলারয়েড ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলার হাতেখড়ি। তবে ফিল্ম রিলের অভাবে চাইলেই ছবি তুলতে পারতেন না, গুণে গুণে ছবি তোলা লাগতো। বাসার কাছেই ছিল জায়েদী স্টুডিও, সেখানে নিজের তোলা ছবি প্রিন্ট করতে যেতেন সাইদা। কিশোরী সাইদার ছবি তোলার ধরন দেখে চমৎকৃত হলেন স্টুডিওর মালিক জায়েদী। তিনি ভাবলেন, একে ঠিকঠাক গড়ে তুলতে পারলে এই মেয়ে অনেকদূর যাবে। জায়েদী সাহেব সাইদাকে ছবি তোলার নানা টেকনিক সম্বন্ধে ধারণা দিতে শুরু করলেন। দিলেন ফটো কম্পোজিশন সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা। শেখালেন অ্যাপারচার এবং এক্সপোজার কীভাবে কাজ করে। পড়তে দিলেন নিজের সংগ্রহের বিদেশি আলোকচিত্রের বই-সাময়িকী।

সাইদা খানম

১৯৫১ সালে বন্ধ হয়ে গেল জায়েদী স্টুডিও। তবে ছবি তোলার প্রতি সাইদার আগ্রহে ভাটা পড়লো না তাতে। জায়েদী সাহেব জহুরী টাইপের মানুষ ছিলেন, রত্ন চিনতে তার ভুল হয়নি মোটেও। যে কিশোরী মেয়েটাকে তিনি ক্যামেরার প্রাথমিক পাঠ দিয়েছিলেন, মাত্র ১৯ বছর বয়সে সেই মেয়ে প্রফেশনাল ফটোগ্রাফার হিসেবে নিজের ক্যারিয়ার শুরু করেছিলেন 'বেগম' পত্রিকায়! পত্রিকাটির সম্পাদক নুরজাহান বেগম নিজে সাইদার তোলা ছবি দেখে মুগ্ধ হয়ে তার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন। 

তবে ফটোগ্রাফার হওয়াটা সহজ কিছু ছিল না সাইদার জন্য, তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থায় একটা মেয়েকে ফটোগ্রাফার হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না কেউই। সাইদার পরিবার অবশ্য খুব বেশি বাধা দেয়নি, কারণ খালা, বড় বোন- এরা সবাই পাশে দাঁড়িয়েছিলেন ছায়ার মতো। সাইদার এগিয়ে যাওয়ার পেছনে তার খালা মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, বড়বোন অধ্যক্ষা হামিদা খানম ও মহসিনা আলীর অবদান ছিল অনস্বীকার্য। 

বেগম পত্রিকার জন্য ১৯৫৬ সালে গ্রামের এক কিশোরী মেয়ের ছবি তুলেছিলেন সাইদা, সেই ছবি প্রকাশিত হতেই সমালোচনা শুরু হলো। ছবির বিষয়বস্তু নারী, যিনি ছবি তুলেছেন তিনিও নারী- দুইয়ে মিলিয়ে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী প্রতিবাদে মুখর হলো। কিন্ত সাইদা ঘাবড়াননি একটুও, তিনি জানতেন, পিছিয়ে গেলে এই সমান বদলাবে না, যে পথে তিনি নেমেছেন, এখানে পিছু হঠার কোন উপায় নেই। রাস্তা একটাই- সামনে এগিয়ে যেতে হবে সাহসের সঙ্গে। গোটা জীবন ধরে সাইদা খানম সেই কাজটাই করেছেন। তার সামনে-পেছনে লোকে হাজারটা কথা বলেছে, তিনি সেসবের জবাব না দিয়ে একমনে নিজের কাজটা করে গেছেন, ক্যামেরার শাটার কথা বলেছে তার হয়ে, জবাব দিয়েছে তার তোলা ছবি। 

ক্যামেরা হাতে সাইদা খানম

প্রেস ফটোগ্রাফার হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন, আন্তর্জাতিক প্রদর্শনীতে অংশ নিয়ে পুরস্কৃত হয়েছেন, তার তোলা ছবি পেয়েছে আন্তর্কাতিক স্বীকৃতি। দেশের প্রায় সব পত্রিকাতেই তার ছবি ঠাঁই পেয়েছে, তারপর আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমও তার ছবি ব্যবহার করেছে। ১৯৬০ সালে ‘অল পাকিস্তান ফটো প্রতিযোগিতা'য় প্রথম হয়েছিল তার ছবি। তখনও বাংলাদেশের জন্ম হয়নি। পাকিস্তানের মতো মৌলবাদী একটা দেশে ষাটের দশকের গোড়ার দিকে একজন নারী ফটোগ্রাফারের তোলা ছবি সেরার পুরস্কার পাচ্ছে- ব্যাপারটা মোটামুটি অবিশ্বাস্যই ছিল! সেই অবিশ্বাস্য গল্পটা লিখেছেন সাইদা, নিজের হাতে। 

বিখ্যাত সব ব্যক্তিদের ছবি তুলেছেন তিনি, সেই তালিকায় কে নেই! কাজী নজরুল ইসলাম থেকে শুরু করে রানী এলিজাবেথ, মাদার তেরেসা থেকে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন, ইন্দিরা গান্ধী, শেখ মুজিবুর রহমান, জিয়াউর রহমান, মওলানা ভাসানী, বেগম সুফিয়া কামাল, মৈত্রেয়ী দেবী, মাহমুদা খাতুন সিদ্দিকা, আশাপূর্ণা দেবী, উত্তম কুমার, সুচিত্রা সেন, মার্শাল টিটো, অড্রে হেপবার্ন, চন্দ্রবিজয়ী নীল আর্মস্ট্রং, এডউইন অলড্রিনস, মাইকেল কলিন্স- এদের সবাইকেই ক্যামেরাবন্দী করেছিলেন সাইদা খানম! বাংলাদেশের আর কোন ফটোগ্রাফারের ক্যারিয়ার এতটা সমৃদ্ধ নয়! 

তবে সাইদার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অর্জন সত্যজিত রায়ের সঙ্গে কাজ করাটা। পত্রিকার জন্যেই সত্যজিত রায়ের ছবি তুলেছিলেন সাইদা। তার তোলা ছবি বিখ্যাত এই লেখক-পরিচালকের এতই পছন্দ হয়েছিল যে, একটি নয়, দুটি নয়, তিন তিনটি সিনেমায় তিনি চিত্রগ্রাহক হিসেবে সাইদাকে নিয়েছিলেন! সাইদার তোলা ছবির এঙ্গেল, লাইট, কনট্র‍্যাস্ট- এসবের প্রশংসা সত্যজিত রায় অন্যদের সামনেও করেছেন। ঢাকার এক তরুণী নিজের প্রতিভা দিয়ে এভাবেই মুগ্ধ করেছিলেন সত্যজিতকে। সত্যজিতের ‘মহানগর’, ‘চারুলতা’ এবং ‘কাপুরুষ ও মহাপুরুষ’- এই তিনটি ছবির শুটিংয়ে ছবি তোলার সুযোগ পেয়েছিলেন সাইদা খানম।

সাইদা খানমের তোলা মুক্তিযুদ্ধের ছবি

দীর্ঘ এই ক্যারিয়ারে সাইদার আক্ষেপ ছিল একটাই, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় মূহুর্তে ক্যামেরা হাতে উপস্থিত থাকতে পারেননি তিনি, রেসকোর্সে পাকিস্তানী বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্যটা বন্দী হয়নি তার ক্যামেরায়। সেদিন দুপুরে পাকিস্তানী বাহিনীর গোলাগুলির মুখে প্রাণ নিয়ে ফিরতে হয়েছিল তাকে। মুক্তিযুদ্ধের সময়টায় নারী হবার কারণে বাইরে বের হতে পারতেন না সেভাবে, একারণে খুব। বেশি ছবি তোলা হয়নি ওই নয় মাস। তবে মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন কলেজের ছাত্রীদের প্রতিরোধ যুদ্ধের প্রস্তুতির ছবি তুলেছিলেন তিনি, সেই ছবি আজও ব্যবহার হয় নানা জায়গায়।

বর্ণাঢ্য এক জীবন কাটিয়ে সাইদা খানম চলে গেলেন আজ সকালে, রেখে গেলেন অজস্র স্মৃতি, নিজের হাতে তোলা ছবির ভাণ্ডার, যে ছবিগুলো বাংলাদেশের ইতিহাস আর পরিবর্তনের অংশ হয়ে আছে। পঞ্চাশের দশকে সাইদা খাতুন অসীম সাহসের পরিচয় দিয়ে শৃঙ্খল ভেঙে এগিয়ে না গেলে আজ সাংবাদিকতায় নারীদের উপস্থিতিটা এত সহজ হতো না। স্রোতের বিপরীতে তার এগিয়ে চলার গল্পটা নারী জাগরণের পথিকৃৎ হয়ে থাকবে আজীবন। সাইদা খানম তো শুধু বাংলাদেশের প্রথম নারী ফটোগ্রাফারের নাম নয়, একটা বিপ্লবেরও নাম- সে কথা অস্বীকারের কোন উপায় তো নেই...

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা