মধ্যপ্রাচ্যের একটি আরব দেশ, যেখানে নারীদের বাইরে বের হবার স্বাধীনতা পাওয়াটাই বড় ব্যাপার, সেখানে সারাহ আল-আমিরি কিভাবে এত বড় প্রোজেক্টের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হলেন?

বারো বছর বয়সে কৃত্রিম উপগ্রহের মাধ্যমে তোলা এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির একটা ছবি দেখেছিল মেয়েটা, মনের ভেতরে তখনই মহাকাশের অসীম শূন্যতার ওই জগতটার প্রতি যে একটা ভালোলাগা তৈরি হয়ে গেছে, সেটা তার কিশোরী মন বুঝতেও পারেনি। সেই মেয়েটা এখন পরিপূর্ণ নারী, মিশন হোপ নামের প্রকল্পের আওতায় সংযুক্ত আরব আমিরাত মঙ্গলে যে অভিযান চালাচ্ছে, সেই বিজ্ঞানীদের দলের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন তিনি! মানুষ যে কখনও কখনও তার স্বপ্নের চেয়েও বড় হতে পারে, সেটাই যেন প্রমাণ করে দিয়েছেন সারাহ আল-আমিরি। 

আরব আমিরাতের মতো ছোট্ট একটা দেশ মঙ্গলে অভিযান চালাচ্ছে, এটাই বেশ চমকপ্রদ একটা তথ্য। কিন্ত তারচেয়ে বড় চমক হয়ে এসেছে গবেষণা দলের প্রধান হিসেবে সারাহ আল-আমিরির নামটা।মধ্যপ্রাচ্যের একটা আরব দেশ এত বড় মাইলস্টোন সেট করতে চলেছে একজন নারীর নেতৃত্বে- এটা অবাক করার মতোই ব্যাপার।

মঙ্গল গ্রহের আবহাওয়া ও জলবায়ু নিয়ে পরীক্ষা করতে প্রায় পাঁচশ মিলিয়ন কিলোমিটার পথ পাড়ি দেবে 'আল আমাল' নামের মহাকাশযানটি। গত পরশু (২০ জুলাই) এটি জাপানের তানেগাশিমা স্পেস সেন্টার থেকে মঙ্গলের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে এর আগে দুবার প্রস্তুতির পরেও এ মিশনের উৎক্ষেপণ স্থগিত করা হয়েছিলো। মহাকাশযানটি ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে পৌঁছাবে, আরব আমিরাত রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষ্যেই মূলত এই মঙ্গল অভিযানের আয়োজন করেছে দেশটা, বিশ্বকে তারা জানান দিতে চাইছে, জ্ঞান-বিজ্ঞানেও তারা বাকীদের চেয়ে পিছিয়ে নেই মোটেও। 

কিন্ত এই মিশনের সাথে সারাহ আল-আমিরির নামটা যুক্ত হলো কিভাবে? মধ্যপ্রাচ্যের একটি আরব দেশ, যেখানে নারীদের বাইরে বের হবার স্বাধীনতা পাওয়াটাই বড় ব্যাপার, সেখানে আমিরি কিভাবে এত বড় প্রোজেক্টের শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত হলেন? সেটা জানতে হলে এই নারী বিজ্ঞানীর জীবনের অলিগলি থেকে একটু ঢুঁ মেরে আসতে হবে, জানতে হবে একটার পর একটা ধাপ পেরিয়ে তার এগিয়ে চলার গল্পটা। 

সারাহ আল-আমিরি

সারাহ আল-আমিরি ‘হোপ মিশনের’ বৈজ্ঞানিক দলের প্রধান। একই সঙ্গে তিনি আরব আমিরাতের অ্যাডভান্সড সায়েন্স বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী। বিশ্বের ইতিহাসে তিনিই প্রথম মানব, যিনি আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স মিনিস্ট্রিতে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছিলেন। এই নবীন বিজ্ঞানী এরই মধ্যে আরব বিশ্বের নারীদের জন্য এক বড় অনুপ্রেরণা হয়ে উঠেছেন। ‌‘হোপ মিশন’ পৃথিবী ছেড়ে যখন রওনা হতে চলেছে মঙ্গল অভিমুখে, তখন মিশনের সঙ্গে সঙ্গে সবার তীক্ষ্ম নজর পড়ছে তার দিকেও।

১৯৮৭ সালে সংযুক্ত আরব আমিরাতে তার জন্ম। বয়স মাত্র ৩২। কিন্তু মহাকাশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা শুরু করেছিলেন একেবারে ছোটবেলা থেকে। এন্ড্রোমিডা গ্যালাক্সির সেই ঘটনাটা তো শুরুতে বলা হলোই। সারাহ আল-আমিরি পড়াশোনা করেছেন কম্পিউটার সায়েন্সে, আমেরিকান ইউনিভার্সিটি অব শারজাহতে। তার বরাবরই আগ্রহ ছিল এরোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার। কিন্তু তখন সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোন মহাকাশ কর্মসূচীই ছিল না।

পড়াশোনা শেষে তিনি যোগ দেন এমিরেটস ইনস্টিটিউশন ফর এডভান্সড সায়েন্স এন্ড টেকনোলজিতে। সেখানে তিনি কাজ করেছেন দুবাই স্যাট-১ এবং দুবাই স্যাট-২ প্রকল্পে। আরব আমিরাতের পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে যোগ দেন এরপর। ২০১৬ সালে তাকে এমিরেটস সায়েন্স কাউন্সিলের প্রধান করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরাতের মঙ্গল অভিযানের শুরু থেকে এর সঙ্গে জড়িত তিনি। এখন এই মিশনের বৈজ্ঞানিক দলের প্রধান হিসেবে কাজ করছেন। ২০১৭ সালে তাকে একই সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এডভান্সড সায়েন্স বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী করা হয়।

সারাহ আল-আমিরি এবং তার দলের কৃতিত্বটা বড় হয়ে ধরা পড়বে, যখন জানবেন তারা বিদেশী কোন কোম্পানী থেকে স্পেসক্র‍্যাফট না কিনে নিজেরাই সেটা বানিয়ে ফেলেছেন! প্রকল্পের শুরুতেই তাদের জানিয়ে দেয়া হয়েছিল, এখানে যেহেতু দেশের সম্মানের প্রশ্ন জড়িত, তাই নিজেদের বানানো স্পেসক্র‍্যাফটই মঙ্গলে পাঠাতে হবে। প্রায় শূন্য অভিজ্ঞতা নিয়ে এমন প্রকল্পে হাত দেয়াটা ভীষণ ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। 

সারাহ আল আমিরি

সারাহ সেই ঝুঁকিটা নিতে দ্বিধা করেননি। একারণে প্রজেক্ট টিমকে যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পার্টনারশিপে যেতে হয়েছিল প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য। যুক্তরাষ্ট্র এবং আমিরাতের প্রকৌশলীরা এজন্য একসঙ্গে কাজ করেছেন। স্যাটেলাইটটি তৈরির বেশিরভাগ কাজ করা হয়েছে ইউনিভার্সিটি অফ কলোরাডোর ‘ল্যাবরেটরি ফর এটমোসফিয়ারিক এন্ড স্পেস ফিজিক্সে‌।’ তবে দুবাইর ‘মোহাম্মদ বিন-রশিদ স্পেস সেন্টারেও’ উল্লেখযোগ্য কিছু কাজ হয়েছে।

আল আমাল নামের মহাকাশযানটি এখন মঙ্গলের পথে ছুটে চলেছে। হোপ মিশন মূলত মঙ্গলগ্রহের জলবায়ু এবং আবহাওয়া নিয়ে কাজ করবে। এই বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের একটা প্রধান লক্ষ্য হবে, একসময় পানিতে পরিপূর্ণ মঙ্গলগ্রহ কিভাবে একটি রুক্ষ ধূলিধুসর গ্রহে পরিণত হলো, সেটির রহস্যভেদ করা। এই স্যাটেলাইটটি যখন মঙ্গলগ্রহে গিয়ে পৌঁছাবে তখন এটির মাধ্যমে এই গ্রহটি সম্পর্কে নতুন অনেক কিছু জানা যাবে বলে আশা করছেন আমিরাতের বিজ্ঞানীরা।

সারাহ আল-আমিরি তাদের এই প্রোজেক্টটাকে আমিরাতের ইতিহাসের একটা বড় মাইলফলক হিসেবেই বিবেচনা করছেন। জাপান থেকে মহাকাশযান উৎক্ষেপনের পর তিনি স্বস্তি প্রকাশ করেই বলেছেন, “সফলভাবে এই মহাকাশযান উৎক্ষেপণটা অনেকটাই ৫১ বছর আগে আমেরিকার চাঁদে পা রাখার মতো একটা ব্যাপার। ২০ জুলাই সকালে ঘুম থেকে উঠেই আরব আমিরাতের শিশুরা আমাদের নিজস্ব অভিযানটি দেখতে পেয়েছে, এটি ভেবেই গর্বে আমার বুক ভরে যাচ্ছে।” 

সারাহ'র আশা, এই ধরনের কর্মকাণ্ডগুলো তরুণদেরকে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করবে মহাকাশ গবেষণায়। পাশাপাশি আরব আমিরাতকে নিয়ে যাবে শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর তালিকায়। তবে বিজ্ঞানকে অবশ্য কাঁটাতার বা সীমানার এত ছোট গণ্ডিতে বেঁধে রাখতে তিনি রাজি নন, জার্মান গণমাধ্যম ডয়েচে ভেলেকে তিনি বলেছেন, ‘‘আমার কাছে বিজ্ঞান হচ্ছে জোটবদ্ধ হওয়ার সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক উপায়৷ এটা সীমাহীন, সীমানাহীন বিষয়৷” 

একদিকে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সারাহ গিলবার্ট করোনার ভ্যাক্সিন আবিস্কার করছেন, আরেক সারাহ মধ্যপ্রাচ্যের এক আরব দেশের নারী হয়ে নেতৃত্ব দিচ্ছেন সেদেশের মঙ্গল অভিযানে। নিউজিল্যান্ড-জার্মানী বা ফিনল্যান্ডের মতো দেশগুলো নারী প্রধানমন্ত্রী বা প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে করোনাকে ঠেকিয়ে দিয়েছে সফলভাবে। বিশ্বজুড়ে নারীদের এগিয়ে চলার যে জয়যাত্রা চলছে, সারাহ আল-আমিরি তো সেই মালায় অনন্য সুন্দর একটি ফুলের নাম, নিজের কীর্তিতে যিনি সুবাস ছড়িয়ে চলেছেন প্রতিনিয়ত! 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা