বাংলাদেশি বংশোদ্ভুত এক বক্সার মেয়ের জীবনের গল্প শুনতে চান? বক্সিং শুনেই নাক সিঁটকে নিলেন? বক্সিং এর রিং এর বাইরেও যে জীবন থাকে একটা বক্সারের, সে গল্প যে মাঝেমধ্যে ছাড়িয়ে যেতে পারে রিং এর ভেতরের রোমাঞ্চকেও, সেটা কখনো ভেবেছেন? যদি না ভেবে থাকেন, তাহলে গুছিয়ে বসুন। আজকে এমন একজনের গল্প বলবো। যার জীবনের গল্প বলিউডের চটকদার ও মেলোড্রামাটিক স্ক্রিপ্টকেও হার মানায়।

মেয়েটির নাম পরিচয় ঠিকুজিকোষ্ঠী পরে দেয়া যাক। আগে গল্পটাই বলি। মেয়েটির জন্ম, শৈশব, বেড়ে ওঠা...সবকিছুই লন্ডনে৷ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীনই চুপিচুপি চলে গেলেন একদিন বক্সিং প্রাকটিস করার জন্যে। পরিবার ছিলো একটু রক্ষনশীল। মেয়ের বাইরে যাওয়াটাই ওভাবে পছন্দ করতেন না তারা। সেখানে তারা যদি জানতে পারে, মেয়ে বক্সিং শিখছে, তাহলে তাদের কী অবস্থা হবে, সেটা যেমন আমরা বুঝতে পারছি৷ মেয়েটিও পারতো। তাই সে বক্সিং শিখতো লুকিয়ে। কাউকে কিছু না বলেই। 

কিন্তু বক্সিং তো লুডু খেলা না যে অক্ষত অবস্থায় খেলা যাবে। ক্ষত তো হয়ই। মাঝেমধ্যেই প্রতিপক্ষের আঘাতে হাতে, পায়ে, মুখে দাগ পড়তো, কালশিটে পড়তো। হাত, পায়ের দাগ হয়তো কোনোভাবে ঢাকা যেতো। কিন্তু মুখের ক্ষতচিহ্ন কিভাবে ঢাকা যায়? পরিবার থেকে হিজাব পরতে বলা হতো মেয়েটিকে। হিজাব দিয়েই সে ক্ষতচিহ্ন ঢাকতো। 

রুকসানা বক্সিংকেই বানিয়েছেন জীবন

এভাবে লুকিয়েচুরিয়ে চলছিলো বক্সিং শেখা। কিন্তু এরমধ্যেই ছন্দপতন। বিয়ে ঠিক হয়ে গেলো মেয়েটির৷ ছেলে লন্ডনের ব্যাংকার। একরকমে জোর করেই হয়ে গেলো বিয়ে। মেয়েটির মতামতের তোয়াক্কা না করে এক আগন্তুকের হাতে তুলে দেয়া হলো মেয়েটিকে। 

বিয়ের পরে মেয়েটির উপর শুরু হলো শারিরীক, মানসিক নির্যাতন। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মেয়েটি চলে এলো নিজের বাড়িতে। কিন্তু নিজের বাড়িতেও তখন সে ব্রাত্য। মা-বাবা, পরিবারের সবাই মিলে তাকে বারবার পাঠাতে চাইলো শ্বশুরবাড়িতে। এদিকে মেয়েটি মানসিক ভারসাম্যও হারিয়ে ফেলেছে অনেকটাই। নিয়মিত থেরাপি নিতে হচ্ছে। এরমধ্যেই এক সকালে মেয়েটির কাছে চলে এলো চিঠি। স্বামীর দেয়া ডিভোর্স লেটার। হুট করেই সব নির্যাতন থেকে যেন অবসর। 

মেয়েটি আবার ফিরলো বক্সিং এর প্রাকটিসের জন্যে। কিন্তু বিধিবাম! কথা আছেনা, অভাগা যেদিকে যায়, সাগর শুকিয়ে যায়? এও অনেকটা সেরকমই। ট্রেনিং জিমে অন্যান্য মহিলা বক্সাররা নিয়মিত অপমান, গালিগালাজ করা শুরু করলো মেয়েটিকে। একজন ট্রেইনার ছিলেন, যিনি অবশ্য মেয়েটিকে সাপোর্ট দিতেন। কিন্তু একদিন তিনিও বললেন- তুমি আর এখানে এসোনা। 

মেয়েটি আবার শুরু করলো একা একা হাঁটা। এরপরে চ্যাম্পিয়নশিপ কম্পিটিশনে যাওয়া শুরু। আস্তে আস্তে পদক জেতা শুরু হলো। ২০১৬ সালে জিতলেন বিশ্ব কিক বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা। 

গল্পটা সিনেমার কাহিনীকে হার মানালো কী না, বলুন?

এই গল্পটি যে মেয়ের, সেই মেয়েটির নাম রুকসানা৷ রুকসানা বেগম। কিক বক্সার রুখসানা। আগেই বললাম, ২০১৬ তে জিতেছেন বিশ্ব কিক বক্সিং চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা। ২০১১ সালে জেতেন ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপ। প্রায় চার বছর ধরে ব্রিটিশ জাতীয় মুয়ে থাই (কিক বক্সিংয়ের বিশেষ একটি খেলা) দলের অধিনায়ক সে। ২০১৩ ও ২০১৫ সালে খেলেছেন বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপেও। এছাড়াও রয়েছে আরো অজস্র অর্জন।

সম্প্রতি লিখেছেন "Born Fighter" নামের একটি আত্মজীবনী, যেটা প্রকাশিত হওয়ার পরেই গোটা যুক্তরাজ্যজুড়ে তাকে নিয়ে মাতামাতি শুরু হয়েছে। এবং সেই বইতেই উঠে এসেছে তার পরিবারের রক্ষনশীলতা, জোর করে চাপিয়ে দেয়া বিয়ে ও বিচ্ছেদ, মানসিক অবসাদগ্রস্থতা, বক্সিং নেটে বুলি এর অভিজ্ঞতা এবং দারুণ একটা কিকে আবার ফিরে আসার গল্প। এবং নিজের জীবন নিয়ে যিনি সোজাসাপ্টা ভাষায় বলেন- 

My story is bigger than boxing 

'বর্ন ফাইটার' বইয়ের প্রচ্ছদ 

এই মানুষটি হতে পারেন আমাদের অনেকের অনুপ্রেরণা। কোনো একটি সিনেমার একটা লাইন মনে গেঁথে ছিলো। লাইনটা এরকম-

রাস্তা যেখানে শেষ হয়, সেখান থেকেই মূলত আসল রাস্তা শুরু হয়। 

রুকসানার পুরো জীবন যেন সিনেমার এই লাইনটিরই সারাংশ। যখন রাস্তা ফুরিয়ে গিয়েছে, তখনই শুরু হয়েছে তার আসল রাস্তা। বক্সিং এর নীল রিং এর মধ্যিখানে পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির এই মানুষটি যেন দ্রোহেরই আরেক নাম। সব নির্যাতন, যন্ত্রণা, ক্ষোভকে পুঞ্জীভূত করেই যার বক্সিং ক্যারিয়ার এগোচ্ছে। তিনিই তো আদতে সত্যিকারের বর্ন ফাইটার। সে সেটা রিং এর এপারেই হোক, বা, ওপারে।

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা