আপনার জন্যে মেসিকে দ্বিতীয় হতে হয়েছে কতবার, আপনার জন্যে প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনাকে হারতে হয়েছে, যে রিয়াল মাদ্রিদের ব্যর্থতা আমি মনেপ্রাণে কামনা করি, সেই রিয়ালকে বারবার জয়োল্লাসে মেতে উঠতে দেখেছি আপনার কারণে! সাফল্য আর বার্সেলোনার মাঝে জাদুকরী পারফরম্যান্স নিয়ে কাঁটা হয়ে বিঁধে ছিলেন আপনি, তবুও আমি আপনাকে ঘৃণা করতে পারিনি ক্রিশ্চিয়ানো, আমি আপনাকে একটুও ঘৃণা করতে পারিনি।

আমি ঘোরতর মেসিভক্ত। ফুটবলের সৌন্দর্য্য বুঝতে শিখেছি রোনালদিনহোকে দেখে, আর ফুটবলকে ভালোবেসেছি লিওনেল মেসি নামের এক আর্জেন্টাইন জাদুকরের কারণে। সেই মেসির সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী, অথচ আমি আপনাকে ঘৃণা করাতে পারি না! আমি আপনাকে অপছন্দ করতে পারি না, আমার পছন্দের খেলোয়াড় মেসিকে দর্শক বানিয়ে আপনি সেরা খেলোয়াড়ের ট্রফি ছিনিয়ে নেন, তবুও আমি আপনাকে দুটো মন্দ কথা বলতে পারি না। উল্টো মাঠে আপনার পারফরম্যান্স দেখলে বিস্ময়ে আমার চোখ ছানাবড়া হয়ে যায়। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, বিজয়ী হবার জন্যেই আপনার জন্ম হয়েছিল। পায়ের তাণ্ডবে বিশ্ব ফুটবলকে শাসন করার জন্যে স্রষ্টা আপনাকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন! 

ক্রিশ্চিয়ানো, আপনার তো ফুটবলার হবার কথা ছিল না। মাদেইরাতে লোকেরা ভবিষ্যত নিয়ে ভাবে না, ওদের কাছে বর্তমানটাই সব। দুপুরে খাওয়া জুটলে রাতেরটা জোগাড় করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সবাই, এক সপ্তাহ পরে ভালোমন্দ কি খাওয়া যায় সেসব নিয়ে ভাবার ফুরসত নেই কারো। সন্ধ্যায় গলা পর্যন্ত মদ গিলে হেঁড়ে গলায় গান ধরে লোকজন, রাত্তিরে মাঝরাস্তায় ঘুমিয়ে থাকে গলির কুকুর আর বদ্ধ মাতাল কিছু মানুষ। সকাল হলে হাড়ভাঙা খাটুনী, দুপুরে লাঞ্চের আধঘন্টা ব্রেক, বিকেলে পাড়ার মাঠে ছেলেদের ফুটবল খেলা দেখা- এটাই তো আপনার জীবন হবার কথা ছিল, তাই না?

বাবার সাথে বাগানের ঘাস পরিস্কার করার সময় একবারও কি ভেবেছিলেন, ভাগ্য কি অদ্ভুত বিস্ময়ের ভাণ্ডার নিয়ে অপেক্ষা করছে আপনার জন্যে? বাবার কথা খুব মনে পড়ে আপনার, তাই না? সেই বাবা, যাকে আপনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, লিসবনে একটা বড় বাড়ী থাকবে আপনাদের! আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের ভক্ত ছিলেন আপনার বাবা, ওর নামের সঙ্গে মিলিয়েই রেখেছিলেন আপনার নাম। ঘরে টাকাপয়সার টানাটানি, দু'বেলা খাবার জোটাতে হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো দিনরাত, অথচ লোকটার ফুটবলপ্রেম কি তীব্র ছিল, নিজের ছেলেকে জোর করে নিয়ে গিয়েছিলেন সিএফ অ্যান্ডোরিনহো ক্লাবে। আপনাকে একটা গোল করতে দেখলে শিশুদের মতো খুশী হয়ে উঠতেন তিনি, বাড়ী ফিরে গর্ব করে আপনার মা আর বোনের সামনে বলতেন- "রোনালদো আজ একটা গোল করেছে", "রোনালদো আজ দুটো গোল দিয়েছে", "শুনছো, রোনালদো আজ হ্যাটট্রিক করেছে!" যেন গোলটা তিনি নিজের পায়ে করে এসেছেন খানিক আগে! 

বিশ্বের সেরা ফুটবলার হিসেবে আপনি যখন ফিফা প্লেয়ার অব দ্য ইয়ারের ট্রফিটা প্রথমবারের মতো উঁচিয়ে ধরলেন জুরিখে, সেই আলোকিত রাতে বাবার কথা খুব মনে পড়ছিল কি? এই প্রাপ্তি, এই স্বর্গীয় অর্জন, এই অনুভূতিটা তো ভাষায় প্রকাশের যোগ্য নয়, তবুও বাবার সেই অপূর্ণতাটা কুরে কুরে খাচ্ছিল আপনাকে। শচীন টেন্ডুলকারের নাম হয়তো শুনে থাকবেন আপনি, প্রতিটা সেঞ্চুরীর পরে এই ভদ্রলোক আকাশের দিকে তাকিয়ে মৃত বাবাকে খুঁজতেন। সেই রাতে, তার পরের আরও চারটে ব্যালন ডি-অর জয়ের রাতে বাবাকে খুঁজেছিলেন আপনি?

রিয়ালের রোনালদো

ম্যানচেস্টারের পাগলাটে বুড়োটা আপনাকে প্রচণ্ড ভালোবাসতেন। সেই ভালোবাসাটা আপনি টের পেয়েছিলেন নিশ্চয়ই। অ্যালেক্স ফার্গুসনের হাত ধরেই তো আপনি রোনালদো হয়ে উঠেছিলেন, ত্রাসের সঞ্চার করতে শুরু করেছিলেন, ফুল হয়ে সুবাস ছড়িয়েছেন, হুল ফুটিয়েছেন প্রতিপক্ষকে। ফুটবল বাণিজ্যের চক্করে আপনাকে ধরে রাখতে পারেননি ফার্গুসন, কিন্ত নিজের প্রিয় শিষ্যের প্রতি ভালোবাসার কমতি হয়নি কোনদিন। নিজের স্ত্রী, ফুটবল আর ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড- এই তিনের পরে বুড়োটা বোধহয় আপনাকেই সবচেয়ে বেশী ভালোবেসেছিলেন।

টানা চারটে বছর আপনি দর্শক হয়ে ছিলেন জুরিখে। আলো ঝলমলে রাতগুলো আপনার জন্যে নিঃসীম আঁধার নিয়ে এসেছিল। একটার পর একটা বছর যায়, দর্শক সারিতে বসে আপনাকে তাকিয়ে দেখতে হতো লিওনেল মেসির শ্রেষ্ঠত্ব। গোলের পর গোল করে চলেছেন আপনি, প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিচ্ছেন, আপনার ভয়ে বাকীরা তটস্থ; অথচ ব্যক্তিগত পুরস্কারের ভাণ্ডারটা তখনও অনেকটাই শূন্য আপনার! ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো নামের মানুষটা ভুল সময়ে জন্ম নিয়েছেন কিনা, এই নিয়েও কথা উঠে গিয়েছিল। ভুল সময়? রোনালদো, আপনি প্রমাণ করে দিয়েছেন, সময়ের কোন ভুল ঠিক নেই, আছে মানুষের। আছে তার কাজের। 

রোনালদো, আপনি দেখিয়ে দিয়েছেন, ফিরে আসা কাকে বলে! টানা চারবার সেরা খেলোয়াড়ের তকমা জেতার নিঃশ্বাস দূরত্ব থেকে ফিরেছেন আপনি, হতাশা আপনাকে গ্রাস করেছে প্রতিবার, আপনি সেটাকে ঝেড়ে ফেলে এগিয়ে গেছেন। ২০১৩-১৪ টানা দুইবার, এরপর ২০১৬-১৭ তে আবার দু'বার টানা; ব্যালন ডি-অরের সংখ্যাটা মেসি'র সমান করেই জবাব দিয়েছেন আপনি। আপনার জন্যেই আমি গর্বভরে বলতে পারি- 'আমি রবার্ট ব্রুসকে দেখিনি, আমি ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে দেখেছি।' 

ইউরোর ফাইনালে আহত হয়ে মাঠের বাইরে চলে গেলেন আপনি, হাঁটুতে ব্যান্ডেজ বেঁধে ফিরলেন খানিক পরেই। মাঠ ছাড়ার সময় আপনার চোখের জল আবেগাক্রান্ত করেনি, এমন ফুটবলপ্রেমী একটাও নেই বোধহয়। মাঠে দল খেলছে, আপনি নিজের খেলাটা দেখালেন মাঠের বাইরে বসেই। মিনিট পঞ্চাশেক ধরে বিশ্বফুটবল দেখলো অন্য এক রোনালদোকে। আপনি তখন কোচ, সতীর্থদের জন্যে মেন্টর, ওদের অনুপ্রেরণা দেয়াটাই তখন আপনার কাজ। ইউরো শিরোপাটায় আপনিই চুমু খাবেন, সেটা তো লেখা হয়ে গিয়েছিল তখনই। বাকীটা কেবল আনুষ্ঠানিকতাই ছিল বোধহয়! 

রিয়ালে থাকাকালীন দুটো ম্যাচে গোল না পেলেই আপনার ফুরিয়ে যাওয়ার রব উঠতো, পত্রিকার পাতায় বড়সড় করে লেখা আসতো- রোনালদো এন্ড? আপনি সেসবকে পায়ের তলায় মাড়িয়ে এগিয়ে যান, গোলের পর গোল করে চলেন গোলমেশিনের মতো। আপনি গোল করাটাকে এমন ডালভাত বানিয়ে ফেলেছেন, এমন রোজকার কাণ্ড বানিয়ে ফেলেছেন যে, একটা সপ্তাহ রোনালদোর পায়ে গোল না থাকাটা তাই ব্রেকিং নিউজ হয়ে যায়! আপনি রিয়াল ছাড়লেন, তখন খবরের শিরোনাম হলো রিয়ালের গোলখরা! রিয়ালের জন্যে আপনি যে কি ছিলেন, সেটা ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ ছাড়া বাকি সবাই বুঝে গেছে এতদিনে!

জুভেন্টাসের রোনালদো

বিশ্বকাপ ছাড়া সবকিছুই জিতেছেন আপনি, সর্বকালের সেরা ক্লাবে এসে সেটার সব রেকর্ড নিয়ে একরকম ছিনিমিনি খেলেছেন। কতশত জাদুকরেরা খেলে গেছে রিয়ালে, অথচ রেকর্ডবুকের পাতাগুলো ছিল শুধুই আপনার অপেক্ষায়, আপনার নামাঙ্কিত অক্ষরে নিজেদের শরীর অলঙ্কিত করার প্রতীক্ষায়। যখন স্পেনে এসেছিলেন, টিকিটাকার ছন্দে পুরো বিশ্ব মাতোয়ারা। সেই শক্ত বলয়টা ভাঙতে সময় লেগেছে, কিন্ত বার্সেলোনার একচেটিয়া আধিপত্যের শেষটা করেছেন আপনারাই। আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি, আপনি না থাকলে লা ডেসিমা জিততে মাদ্রিদের রয়্যাল ক্লাবটাকে আরও দুইযুগ অপেক্ষা করতে হতো!

সেই দশম চ্যাম্পিয়ন্স লীগ শিরোপাটা এখন পুরনো কাসুন্দি, চ্যাম্পিয়ন্স লীগে হ্যাটট্রিকের রেকর্ড গড়ে তেরোতম শিরোপাটাও ঘরে তুলেছিলেন আপনারা, গোলের পর গোল করে তাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন আপনি। রিয়াল ছেড়ে জুভেন্টাসে গেলেন, অথচ এই পঁয়ত্রিশ বছর বয়সেও আপনি শিকারী বাজের মতো ক্ষীপ্র, চিতার মতো গতিশীল, নেকড়ের মতো সুযোগসন্ধানী! আর কোন ব্যালন ডি-অর ট্রফি হয়তো জেতা হবে না আপনার, মেসিকে ছুঁতে পারবেন না আপনি- কিন্ত তবুও হাল ছাড়তে কী ভীষণ আপত্তি আপনার!  স্পোর্টিং- এর একাডেমীতে আপনার খেলা দেখে কোন এক সতীর্থ বলেছিলেন- এই ছেলে কি মানুষ! আমারও প্রশ্ন সেটাই, রোনালদো, আপনি কি মানুষ? ফুটবলে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো মানেই তো একটা সংগ্রামের নাম, শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্প; বারবার হোচট খেয়েও হার না মানার মহাকাব্য! আপনার কাছে ফুটবল কৃতজ্ঞ, ফুটবল ভক্তরা কৃতজ্ঞ, পরিসংখ্যানও কৃতজ্ঞ। আর কোন ব্যালন ডি-অর ট্রফি হয়তো জেতা হবে না আপনার, মেসিকে ছুঁতে পারবেন না আপনি- কিন্ত তবুও হাল ছাড়তে কী ভীষণ আপত্তি আপনার! 

তবে আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতাটা অন্যরকমের। আমি বিশ্বাস করি, আপনি না থাকলে ফুটবলটা আমাদের কাছে এতটা রোমাঞ্চকর কখনোই হতো না। আপনি না এলে লিওনেল মেসি কখনও ভীনগ্রহের ফুটবলার খেতাব পেতেন না, হয়তো মিডিওকার একজন হয়েই কাটিয়ে দিতেন ক্যারিয়ারটা। আপনি না এলে মেসির সেরাটা দেখা হতো না আমার, আপনি না এলে ধ্রুপদী এক প্রতিদ্বন্দ্বীতা থেকে বঞ্চিত হতো ফুটবল, বঞ্চিত হতো খেলাটাকে ভালোবাসা মানুষগুলো। আপনার জন্যে মেসিকে দ্বিতীয় হতে হয়েছে কতবার, আপনার জন্যে প্রিয় ক্লাব বার্সেলোনাকে হারতে হয়েছে, যে রিয়াল মাদ্রিদের ব্যর্থতা আমি মনেপ্রাণে কামনা করি, সেই রিয়ালকে বারবার জয়োল্লাসে মেতে উঠতে দেখেছি আপনার কারণে! সাফল্য আর বার্সেলোনার মাঝে জাদুকরী পারফরম্যান্স নিয়ে কাঁটা হয়ে বিঁধে ছিলেন আপনি, তবুও আমি আপনাকে ঘৃণা করতে পারিনি ক্রিশ্চিয়ানো, আমি আপনাকে একটুও ঘৃণা করতে পারিনি।


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা