তবে এতদিন যা জেনে এসেছি আমরা, তা কি মিথ্যে?

রোম যখন পুড়ছিল, নিরো তখন বাঁশি বাজাচ্ছিল– একটি বিখ্যাত প্রবাদ বাক্য। প্রবাদবাক্যটি শুনতে শুনতে একসময় কৌতূহল জাগলো। কে এই নিরো? রোমের অগ্নিকান্ড কীভাবে হলো, আর তিনি তখন বেহালা/বাঁশি কেন বাজাচ্ছিলেন? 

নিরো ছিলেন একজন রোমান সম্রাট। উইকিপিডিয়া জানাচ্ছে, রোমান সাম্রাজ্যের পঞ্চম সম্রাট ছিলেন তিনি। জুলিও-ক্লডিয়ান রাজতন্ত্রের সর্বশেষ রোমান সম্রাট এই নিরো। তবে নিরো সম্ভ বত রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অজনপ্রিয় সম্রাট ছিলেন। ক্ষমতার অপব্যবহার তার চেয়ে বেশি আর কেউ করেনি। হত্যা, রক্তপাত তার প্রিয় বিষয়বস্তু। অসংখ্য হত্যাকান্ডের মূল হোতা সম্রাট নিরো। এমনকি নিজের মা’কেও হত্যা করেন তিনি। বিষ খাইয়ে মেরেছেন সৎ ভাই ব্রিটানিকাসকেও। প্রচলিত আছে, নিরো নাকি তার প্রথম স্ত্রী অকটাভিয়াকেও হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। 

রোমের যে অগ্নিকান্ডের কথা বলা হয় সেটি ঘটেছিল ১৯ জুলাই, ৬৪ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে। এটি ছিলো রোমের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অগ্নিকাণ্ড। ছয়দিন ধরে আগুনের শিখা জ্বলতে থাকে। রোমের ১৪টি জেলার ১০টিই আগুনে পুড়ে যায়। রোমবাসীর ধারণা এই অগ্নিকান্ড সম্রাট নিরো নিজেই ঘটিয়েছিলেন। কারণ, ধ্বংসস্তূপের জায়গায় তিনি তার অবিস্মরণীয় স্থাপত্যকর্ম “ডোমাস অরিয়া” বা স্বর্ণগৃহ নির্মান করতে চেয়েছিলেন। এই ধারণা আরো সত্য প্রতীয়মান হয় যখন দেখা যায় যে অগ্নিকান্ডের পর ধ্বংসস্তূপে নিরো তার স্থাপত্যকর্ম তৈরির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এর জন্য তার প্রচুর অর্থের দরকার হয়ে পড়েছিল। ফলে তিনি কর বাড়ান। মন্দিরগুলো থেকে অর্থ তুলতে শুরু করেন। অনেকের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে শুরু করেন। তাছাড়া ইতিহাসে উল্লেখ আছে, রোম যখন আগুনে পুড়ছিল, নিরো তখন তার প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। 

কিন্তু নিরো নিজে এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে খৃষ্টানদের দায়ী করেন। কারণ তার শাসনামলের প্রথম দিকে তিনি খৃষ্টানদের অত্যাচার করতেন খুব। নিরোর ধারণা তারা প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে পারে। কিন্তু প্রচলিত এসব গল্পের কিছু সমস্যা আছে। যেমন, প্রাচীন রোমে বেহালার অস্তিত্ব ছিল না। সংগীতের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের দাবি ১১ শতাব্দীর আগে বেহালা আবিষ্কার হয়নি। যদি নিরো কিছু বাজিয়ে থাকেন সেটা হয়তো কিথারা হতে পারে যা চার থেকে সাত স্ট্রিং এর ভারী কাঠের তৈরি সুরযন্ত্র। 

নিরো ও জ্বলন্ত রোম নগরী- চিত্রকর্ম

তবে এতে প্রমাণ হয় না যে নিরো আসলেই অগ্নিকাণ্ডের সময় কোনো যন্ত্র বাজাচ্ছিলেন। কারণ, প্রাচীন রোমের ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস জানাচ্ছেন, অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরো রোম থেকে ৩৫ মাইল দূরে এন্টিয়াম শহরে ছিলেন। আগুনের খবর শুনে তিনি দ্রুত রোমে ফিরে যান। ত্রাণকার্যক্রম শুরু উদ্যোগ নেন। নিজস্ব তহবিল থেকে এর যাবতীয় ব্যয়ভারও তিনি গ্রহণ করেন। এমনকি যে প্রাসাদে দাঁড়িয়ে তিনি বেহালা বাজাচ্ছিলেন বলে গুজব প্রচলিত, সেখানে তিনি বরং গৃহহীনদের আশ্রয় দেন। তাদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেন এমনটাই বলেন ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে ট্যাসিটাস নিজে কিন্তু একদমই নিরো সমর্থক ছিলেন না। তিনি বরং ব্যাক্তিগতভাবে নিরোর অন্যান্য অপকর্মের জন্যে ঘৃণা আর ধিক্কার পোষণ করতেন। তাহলে নিরো সম্পর্কে কেনো এই গুজব ছড়ানো হয়েছিল? যা আবার এমনই এক গুজব যেটি পাঠ্যপুস্তকে পর্যন্ত প্রবাদ বাক্য হিশেবে বহুল প্রচলিত হয়ে গিয়েছে?

বস্তুত, সম্রাট নিরো রোম পুড়ে যাওয়ার সময় বেহালা বাজাচ্ছিলেন এই কথাটি ছড়ানো শুরু হয় ওই অগ্নিকান্ডের দেড়শ বছর পর থেকে! আর এই কাহিনীটি রচনা করেছিলেন ক্যাসিও ডিও। আর এই গুজবটি মানুষকে বিশ্বাস করতে শুরু করে নিরোর কারণেই। তিনি অগ্নিকাণ্ডের পর সেখানে তার স্বপ্নের ডোমাস অরিয়া (DomusAurea) বা স্বর্ণগৃহ নির্মাণ শুরু করেন। আর এই ডোমাস অরিয়া স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই অনন্য নিদর্শনের কারণে মানুষ তাকে মনে রাখবে না। কারণ,অগ্নিকাণ্ডের দায়ভার খৃষ্টানদের উপর চাপিয়ে তাদের হত্যা করা এবং ধ্বংসস্তূপের উপরই এই প্রাসাদ নির্মাণ শুরু করার মাধ্যমে নিরো নিজেই নিজেকে ভিলেন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগটি দিয়ে গিয়েছেন। এটিই হয়তো পোয়েটিক জাস্টিস! 

হিস্টোরিডটকম অবলম্বনে  

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা