নীতি নির্ধারকদের বলছি। প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে আমাদের মৃত্যর সংখ্যা গোনা ছাড়া উপায় থাকবে না। এর চেয়ে ভালো সংক্রমণ থামানো। আর সেক্ষেত্রে বাসায় আবদ্ধ থাকার চেয়ে আর কোন সহজ উপায় নেই। নাগরিকরা সচেতন হোক।

আচ্ছা দেশে যদি কাল পাঁচ হাজার লোক করোনার উপসর্গ নিয়ে আসে তাদের পরীক্ষা হবে কীভাবে? কোন কীট দিয়ে? শুনলাম, মাত্র দুই হাজার কিট এনেছে বাংলাদেশ। আর আছে মাত্র ১৭৩২ টি। নতুন করে কবে কিট আসবে কারও নাকি জানা নেই। দুই হাজারের বেশি রোগী হলে কী হবে তাহলে? এই বুঝি করোনার প্রস্তুতি?

আচ্ছা কাল যদি ভোলা জেলার কোন লোক মনে করেন তার করোনা, তাহলে তার পরীক্ষা কোথায় হবে? তাকে লঞ্চে করে ঢাকায় আসতে হবে? একইভাবে যদি দেশের নানা প্রান্তে রোগী পাওয়া যায় তাহলে পরীক্ষা হবে কোথায়? ঢাকায় আসার পথে কতোজনকে তারা আক্রান্ত করবেন? আচ্ছা ভারতে ৬২টি কেন্দ্রে পরীক্ষা হচ্ছে। বাংলাদেশে কেন শুধু আইইডিসিআরে?

আচ্ছা কাল যদি ৫ হাজার লোক করোনায় আক্রান্ত হয় তাহলে আইসোলেশনের জন্য তাদের কোথায় রাখা হবে? আছে কোন হাসপাতাল? আছে কোন ব্যবস্থা? আর যদি পাঁচ হাজার করোনা রোগীর আইসিইউ লাগে কী হবে?

শুনলাম, মাত্র দেড়শো আইসিইউ আছে। তাহলে দেড়শো বেশি রোগী হলে কী হবে? চোখের সামনে মরতে হবে সবাইকে? আচ্ছা যারা স্বাস্থ্যসেবা দেবেন তাদেরই জীবনের নিরাপত্তার কী ব্যবস্থা করা হয়েছে? ডাক্তার, নার্স, হাসপাতাল কর্মীরা যদি অসুস্থ হয়ে যান তখন কী হবে? আচ্ছা সর্দি নিউমোনিয়া নিয়ে হাসপাতালে গেলে তাদের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না কেন? দেশের সরকারি বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কী কোন নির্দেশনা দেওয়া হয়নি?

মাননীয় নীতিনির্ধারকরা! আমার প্রশ্নগুলোর উত্তর দিন।চীনের উহান শহরে করোনাভাইরাসের সংক্রমণ দেখা দেয় ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর। এরপর আস্তে আস্তে শতাধিক দেশে ছড়ায়। সময়ের হিসেবে বাংলাদেশ করোনা মোকাবেলার প্রস্তুতি নিতে আড়াই মাস সময় পেয়েছে। নীতি নির্ধারকদের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন, গত আড়াই মাস ধরে কী কী প্রস্তুতি নিলেন আপনারা?

আমি জানি না আমাদের নীতিনির্ধারকরা কীভাবে এতো নির্বিকার? মাননীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী‌! আপনি কিছুদিন আগে বলেছেন, করোনাভাইরাস প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণে সরকারের সব প্রস্তুতি রয়েছে। প্রতিটি সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে আলাদা আইসোলেটেড ইউনিট প্রস্তুত রাখা হয়েছে। চিকিৎসক, নার্সদের প্রশিক্ষিত করা হয়েছে। করোনা শনাক্তকরণের জন্য পর্যাপ্ত কিটস রাখা আছে। এই বুঝি সব প্রস্তুতি? আচ্ছা ডেঙ্গুর সময় তো বিদেশ ছিলেন, এখন কোথায় যাবেন?

একবার ভাবুন। করোনাভাইরাসের আতঙ্কে সারা দুনিয়া নিজেদের বিচ্ছিন্ন করেছে। আর আমরা তামাশা করছি। আচ্ছা আচ্ছা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাচন না হলে পৃথিবী থমকে যাবে? অথচ দেখুন, করোনাভাইরাস যাতে না ছড়ায় সেজন্য সার্বিয়া ২৬ এপ্রিলের পার্লামেন্ট নির্বাচন স্থগিত করেছে। আর সিইসি কেএম নূরুল হুদা বলেছেন, নির্বাচন স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নিতে পারবো না। আল্লাহর রহমতে করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব দূর হয়ে যাবে। অথচ, চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন জানিয়েছেন করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে ঝুঁকিতে আছে চট্টগ্রাম।

আমাদের বিদেশ ফেরত বা সাধারণ লোকজনই যে শুধু যে অসচেতন তাই নয়, রাষ্ট্রীয়ভাবেও দায়িত্ত্বশীলতার পরিচয় মিলছেনা। পাশের শহর দিল্লিতে যেখানে ৫০ জন একসাথে জমায়েত নিষিদ্ধ করেছে সেখানে আশাদের দেশে রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে শত শত লোক থাকে একসাথে। উত্তরের মেয়র তো হাজার লোক দিয়ে হাত ধুচ্ছেন। আর আতশবাজি পোড়ানো দেখতে হাতিঝিলে বা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে তো মহাসমাবেশ হয়ে গেল। বিয়ে, ওয়াজ, সবই তো চলছে এখানে!

এমন পরিস্থিতিতে লোকজনকে সচেতন করবেন কোথায় তা না, উল্টো আমাদের আরেক মন্ত্রী বলেছেন, বিশ্বের উন্নত অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশে করোনাভাইরাস প্রতিরোধের প্রস্তুতি অনেক ভালো। এই বুঝি ভালোর নমুনা? কেন এসব মিথ্যা বলেছেন আপনারা? আচ্ছা ১৭ কোটি মানুষের দেশে ১টি রোগ নির্ণয় কেন্দ্র,১৭৩২ কিট আর আশকোনার হজ্ব ক্যাম্প নিয়ে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন বলতে লজ্জা লাগে না আপনাদের? 

অথচ আজ বিবিসিতে সাক্ষাৎকারে দেখলাম, আইইডিসিআর-এর সাবেক পরিচালক এবং সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ বিষয়ের বিশেষজ্ঞ মাহমুদুর রহমান বলেছেন, সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশের সমন্বিত কোন পরিকল্পনা ছিল না।

মাহমুদুর রহমান বলেছেন, করোনাভাইরাসের মতো জীবানু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য যেসব উপাদান দরকার, বাংলাদশে সেগুলো পর্যাপ্ত নেই। রোগী হাসপাতালে আসলে কোথায় রাখবো, কিভাবে রাখবো, হাসপাতালে রোগীরা কিভাবে ঢুকবে- এখনো সে প্রস্তুতিটা ভালোভাবে করতে পারি নাই। তাছাড়া যেসব চিকিৎসক করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সেবা দিবে, তাদের সুরক্ষার জন্য কোন ধরণের সরঞ্জাম প্রয়োজন হবে সেটিও ঠিকমতো নিশ্চিত করা হয়নি।

আমি জানি না আমাদের ভবিষ্যত কী। নীতি নির্ধারককদের বলবো, প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন। ভাইরাসে আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা চক্রবৃদ্ধি হারে বেড়ে চলেছে৷ চীন বা ইতালির মতো পরিস্থিতি হলে সামাল দেয়ার মত কোন সামর্থ্যই আমাদের নেই। কত মানুষ মরবে তা গুনেও শেষ করা যাবে না৷

করোনাভাইরাসের টাইমলাইন। ছবি কৃতজ্ঞতা- আলজাজিরা

সময় খুব অল্প। দ্রুত সব ব্যবস্থা নিন। প্লিজ, ১০-১৫ জন রোগী আসবে করোনায় সেইরকম চিন্তা বাদ দিয়ে ১০-১৫ হাজার রোগীর চিন্তা করে ব্যবস্থা নিন। ভাবুন একবার ১৭ কোটি মানুষের দেশ বাংলাদেশ।

আমি বলবো, আগামী দুই সপ্তাহর জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হোক। সব নাগরিককে বাধ্যতামূলকভাবে বাসায় থাকতে নির্দেশ দেয়া হোক। বিনা কারণে বাসার বাইরে গেলেই জরিমানা নেয়া হোক। এক্ষেত্রে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণটা আপনাদের মনে করিয়ে দেই।

করোনা সংকট সমাধানে জাস্টিন ট্রুডোর কানাডাবাসীকে বলেছেন, “আপনাদের কাছে অনুরোধ আপনারা এক মাস নিজ বাসায় অবস্থান করুন। শুধু মাত্র ঔষুধ, প্রয়োজনীয় খাবার ও পানীয় দোকানগুলো খোলা থাকবে৷ আপনাদের যখন যা লাগে আমাদের দেয়া নাম্বারে যোগাযোগ করবেন, আপনাদের বাসায় সব কিছু পৌছে দেয়া হবে। তবুও বের হবেন না।‌ ভয় নেই কাউকে অনাহারে মরতে হবে না। আপাতত আমাদের দেশ লক ডাউন করে দিচ্ছি। পরিস্থিতি ঠিক হলে আবার খুলে দিব। আমার উপর আপনারা আস্থা রাখুন।"

জাস্টিন ট্রুডো আরও বলেছেন, “আপনারা যারা অফিস আদালত কিংবা অন্য প্রতিষ্ঠানে কাজে নিয়োজিত ছিলেন, আপনাদের কারো কাজে যেতে হবে না। সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অফিস কারখানা বন্ধ ঘোষণা করলাম। ভয় নেই, আপনাদের সবার একাউন্টে আপনাদের মাসিক বেতনের টাকা পৌছে যাবে। আপনার কেউ ঘর থেকে বের হবেন না। বাসায় থাকুন এবং সচেতনার সাথে থাকুন। আশা করি শীঘ্রই আমরা এই সংকট কাটিয়ে উঠবো। প্লিজ আপনারা আমাকে সহযোগিতা করুন।"

নীতি নির্ধারকদের বলছি। প্লিজ বোঝার চেষ্টা করুন। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়লে আমাদের মৃত্যর সংখ্যা গোনা ছাড়া উপায় থাকবে না। এর চেয়ে ভালো সংক্রমণ থামানো। আর সেক্ষেত্রে বাসায় আবদ্ধ থাকার চেয়ে আর কোন সহজ উপায় নেই। নাগরিকরা সচেতন হোক। পাশাপাশি অন্তত আগামী দুই সপ্তাহর জন্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হোক। সবাইকে বাধ্যতামূলকভাবে বাসায় থাকতে নির্দেশ দেয়া হোক। প্লিজ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিন‌‌। আল্লাহ সবাইকে ভালো রাখুন। 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা