পড়াশোনা শেষ করে পরিবারের ব্যবসা ধরার কথা ছিলো। তা না করে শুরু করলেন গান নিয়ে পাগলামি। জেলে গেলেন, মিউজিক অ্যালবাম নিয়ে সরকারের ব্যানের মুখে পড়লেন, মানুষের হাসাহাসির পাত্র হলেন। এরপরেই সাই এলেন গ্যাংনাম স্টাইল নিয়ে। একটা মাত্র গান দিয়ে সব অপমানের একে একে বদলা নেওয়া শুরু হলো তার...

২০১২ সালের সেই সময়টার কথা মনে আছে? হুট করে বাংলাদেশের অলিতে-গলিতে একটা গান ভাইরাল হওয়া শুরু হলো। কী শপিংমল, কী গলির চায়ের দোকান, বিয়ের প্রোগ্রাম থেকে কলেজের শিক্ষাসফর... সবখানেই একটাই গান। যে গানের আগামাথা কেউ জানে না। জানে শুধু একটাই লাইন- ওপ্পা গ্যাংনাম স্টাইল। যেন আচমকা এক মহাপতন! 'গ্যাংনাম স্টাইল'ই শুধু ভাইরাল হলোনা, সে সাথে ভাইরাল হয়ে গেলেন এ গানের শিল্পী পার্ক-জে-সাং অথবা সাই। কে-পপ কালচারকেই অন্যমাত্রায় নিয়ে গেলেন এই মানুষটি এবং তার গান!

পাগলামিই সাইয়ের প্রধান স্বকীয়তা! 

দক্ষিন কোরিয়ার সিউলের গ্যাংনাম জেলার এক ধনী পরিবারে জন্ম সাইয়ের। তার বিখ্যাত 'গ্যাংনাম স্টাইল' গানের নামও এসেছে তার এলাকার নাম থেকে। দক্ষিন কোরিয়া থেকেই স্কুল-কলেজের পাঠ চুকিয়ে পরবর্তীতে 'বিজনেস স্টাডিজ' নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্যে সে পাড়ি জমায় আমেরিকায়। পরিবারের ইচ্ছে ছিলো, পড়াশোনা শেষ করে ফিরে এসে সে পরিবারের ব্যবসার হাল ধরবে। কিন্তু আমেরিকায় গিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে সে শুরু করে গান নিয়ে পাগলামি। গান শেখার জন্যে 'বার্কলি কলেজ অব মিউজিক' এ ভর্তিও হয়েছিলেন সাই। কিন্তু সেখান থেকে ড্রপআউট হয়ে যান। এরপর মনের দুঃখে চলে আসেন দেশে। কোনোরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই শুরু করেন গানবাজনা। সেসময় একটা অঘটনও ঘটে। তাকে যেতে হয় জেলে। মারিজুয়ানা নিয়ে ধরা পড়েছিলেন তিনি৷ পঁচিশ দিন আটকে রেখে ছেড়ে দেয়া হয় তাকে। 

জেল থেকে বের হওয়ার অল্প কয়েকদিনের মধ্যে সাই একটি মিউজিক অ্যালবাম বের করেন।  অ্যালবামের নাম- 'সাই ফ্রম দ্য সাইকো ওয়ার্ল্ড।' এই অ্যালবাম প্রকাশের পরেই বেশ বিতর্ক শুরু হয় অ্যালবামটি নিয়ে। দক্ষিন কোরিয়ার সরকার সাইকে জরিমানাও করেন এই অ্যালবামের জন্যে এবং তাকে প্রতিজ্ঞাও করতে হয়- এরকম 'আপত্তিকর কন্টেন্ট' এর মিউজিক অ্যালবাম সে আর বের করবে না। সাই বরাবরই পাগলাটে ছিলেন। গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্টও করতেন দেদারসে। সুতরাং সরকারকে দেয়া প্রতিজ্ঞাবাক্যও খুব তাড়াতাড়ি ভুলে যান তিনি। তিনি আরো কিছু কন্টেন্ট বানান, মিউজিক অ্যালবাম বানান, যেগুলোও নানা বিতর্কের সৃষ্টি করেছিলো সময়ে-অসময়ে। এরকমই নানা বিতর্কের মধ্য দিয়ে এগোতে এগোতে ২০১২ সালের দিকে এসে সাই মুক্তি দেন তার ষষ্ঠ অ্যালবাম; PSY 6 (Six Rules). এই অ্যালবামের মধ্যেই ছিলো সেই গানটি- গ্যাংনাম স্টাইল। বাকিটা ইতিহাস। 

'গ্যাংনাম স্টাইল' নিয়ে কথা বলার শুরুতেই একটা ছোট্ট ট্রিভিয়া দেই। যে গান বিশ্বব্যাপী নানা রেকর্ডকে ভাংচুর করলো নিয়মিত ব্যবধানে, সে গানটির শুটিং করতে কত সময় লেগেছিলো জানেন? মাত্র ৪৮ ঘন্টা! চার মিনিট বারো সেকেন্ডের এই গানে নেই সেরকম কোনো স্পেশাল এফেক্ট, ক্যামেরার কাজ, বা, কোনো গল্প। পুরোটাই পাগলামি। গানের তালটাই এরকম যে, ভেতরশুদ্ধু নেচে ওঠে মানুষের। এ গান তাই এখানেই সফল। গানের উদ্দেশ্য ছিলো, সাই যেখান থেকে উঠে এসেছেন অর্থাৎ গ্যাংনাম, সেই এলাকার মানুষকে নিয়ে হাসিঠাট্টা করা। পুরো ভিডিওতে সেটাই করেছেন তিনি। লিফট, সুইমিংপুল, রাস্তা, পার্ক, আস্তাবল, ট্রেন স্টেশন...সবখানে শুধু একটাই মিল; পাগলামি।

ভিডিওটি মুক্তি পাওয়ার পরেই বিদ্যুৎগতিতে ভাইরাল হয়ে যায়। প্রথমদিনেই প্রায় পাঁচ লাখ ভিউ হয় গানটির।  সাই কে যখন পরে এ নিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, সে উত্তর দেয়-

জানিনা কী হয়ে গেলো। কিন্তু হয়ে গেলো।

এই ভিডিওটিই ইউটিউবের প্রথম ভিডিও যেটা দুই বিলিয়নেরও বেশিবার ভিউ হয়েছিলো। দুই বিলিয়ন ভিউ হওয়ার পর ইউটিউব এটিকে সেলিব্রেটও করেছিলো। তবে সাই যতই বলুক, কীভাবে কী হয়েছে সে জানেনা, তবে এই মিউজিক ভিডিও করতে কন্ঠকে যে পরিমান ব্যবহার করতে হয়েছে, যে পরিমান নাচতে হয়েছে, সেটা এককথায় অনবদ্য। তাছাড়া কোরিয়ার তিনজন সেলিব্রেটিকেও আনা হয়েছিলো গানের মধ্যে। তাদের উপস্থিতিও গানটিকে জনপ্রিয় করতে একটু হলেও ভূমিকা রেখেছে। তবে এই গানটিকে জনপ্রিয় করতে মূলত ভূমিকা রেখেছে গানটির মারাত্মক তাল। পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ এই গানের কথা বুঝতে পারেনি। শুধু সুর শুনে, শুধু রিদমের কারণেই তারা গানটিকে ভালোবেসেছিলো। গান মানে আসলে সুর, কথা যে এখানে গৌণ... সেটা আবার প্রমানিত হয়েছিলো 'গ্যাংনাম স্টাইল'এর হোলসেল জনপ্রিয়তার পরে। আস্তে আস্তে সারা পৃথিবীতেই মাত করেছিলো এই গানটি। কোরিয়ার কে-পপ ইন্ডাস্ট্রিকেও মানুষ নতুন করে চিনেছিলো এই গানের পর। মূলত কে-পপ ইন্ডাস্ট্রি'কে ইন্টারন্যাশনাল একটা ইমেজ দিয়েছিলো সাই ও তার গ্যাংনাম স্টাইল-ই।

কে-পপ ইন্ডাস্ট্রি'কে ইন্টারন্যাশনাল ইমেজ এনে দেয় 'গ্যাংনাম স্টাইল!' 

এই লেখাটি যখন লিখছি, গ্যাংনাম স্টাইলের ভিউ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৮ বিলিয়নে। এই গ্যাংনাম স্টাইলের পরে সাই করেছেন আরো কিছু কাজ। 'সাই সেভেন্থ এ্যালবাম' নামের এ্যালবাম বের করেছেন৷ তার আরেকটি গান 'জেন্টলম্যান'ও ভাইরাল হয়েছে সারাবিশ্বে। 'গ্যাংনাম স্টাইল' এর জন্যে দক্ষিন কোরিয়ার সম্মানজনক 'অগওয়ান অর্ডার অব কালচারাল মেরিট- ২০১২' এ ভূষিত হয়েছেন তিনি। ইউনিসেফের শুভেচ্ছাদূতও হয়েছেন । সাই খুলেছেন তার নতুন কোম্পানি- পি. ন্যাশন। তাছাড়া তিনি বরাবরই যেরকম করেন, এক্সপেরিমেন্ট করছেন বিভিন্ন গান নিয়ে। অ্যালবাম বের হচ্ছে নিয়মিতই। যুক্ত হচ্ছেন গান সংক্রান্ত নানা প্রজেক্টের সাথেও।

জাতিসংঘের প্রাক্তন মহাসচিব বান কি মুনের সাথে; গ্যাংনাম স্টাইল পোজে! 

সাই এর অদ্ভুত নাম 'PSY' এসেছে ইংরেজি শব্দ 'PSYCHO' থেকে। সে নিজেই তার এরকম উদ্ভট নাম দিয়েছে। কেন দিয়েছে জিজ্ঞেস করলে সে জানায়-

আমি স্টেজে উঠলে, মিউজিক ভিডিও'র শ্যুট করার সময়ে, বা, গান নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট এর সময়ে অনেক বেশি ছুটোছুটি ও পাগলামি করি, অনেকটা সাইকোদের মতন৷ তাই আমার এই নামটাই পুরোপুরি ঠিক আছে।

কুইন ব্যান্ডের ফ্রেডি মার্কারি ছিলেন সাই এর আইকন। মিউজিশিয়ান হবার ইচ্ছে ছিলো ছোটবেলা থেকেই। স্কুলে উদ্ভট সব  গানবাজনা আর নাচানাচিও করতেন। এ কারনে স্কুলের সবাই ডাকতো তাকে 'স্কুল ক্লাউন।'  হাসাহাসি করতো। বড় হয়ে মিউজিক ভিডিও করার সময়েও সবাই তাকে তার গানের স্টাইল ও নাচের ভঙ্গি নিয়ে হাসাহাসি করেছে বিস্তর। বডিশেমিং এর শিকারও হয়েছেন নিয়মিত। 'আপত্তিকর কন্টেন্ট' অভিযোগ তুলে তার গান ব্যান করেছিলো দক্ষিন কোরিয়া সরকার। সেখান থেকে সাই আজ গোটা পৃথিবীর এক নামে চেনা মুখ। দক্ষিন কোরিয়া সরকার তাকে মনে করে দেশের রত্ন। দেশের সম্পদ। সাই এভাবেই তার পাগলামি বজায় রেখে করে যাচ্ছেন সব। জীবনে ধাক্কা, ব্যর্থতা, সমালোচনা এসেছে। এগুলোকে থোড়াই কেয়ার করে তিনি তার উদ্ভট কাজকর্ম নিয়েই এগিয়ে গিয়েছেন। সাফল্য পেতে গেলে নিজেকে পাল্টাতে হয়... এই ধারনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি বরাবরের মতই পাগলাটে। নিজের গান দিয়ে সারা পৃথিবীকে আপাদমস্তক নাচিয়েছেন তিনি। এখনো নাচাচ্ছেন। এখানেই তিনি সফল।

সাই তার এই সারল্য, স্বকীয়তা ও সততার কারণেই আমাদের কাছে এত প্রিয়। এখানেই তার চমৎকারিত্ব।

*

প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন
 


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা