আমি এমন একটা সময় বড় হয়েছি যখন 'মোটিভেশনাল স্পিকিং' খুব ট্রেন্ডি একটা ব্যাপার। সবাই স্ক্রিনের সামনে আসছে আর বলছে, 'তুমিই পারবে। কারণ তুমি আলাদা।' কিন্তু...

একদা একসময় আমি পুরোদস্তুর তথাকথিত পজিটিভ থিংকার ছিলাম। কিন্তু এক ঘটনা আমার এই ধারণা পুরোপুরিভাবে পরিবর্তন করে ফেলে। খুব বেশিদিন আগের কথা না। দুবছর আগে গেলেই হয়। তখন আমি বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করছি। হয়তো দেখা গেল এক পরীক্ষায় আমি একশোতে বিশ পেলাম। আমার মাথার ভেতর ওরাকলের মতোন কোনো কণ্ঠ বলে উঠতো 'এই টপিক তুমি ভাল করে পারতে না, এর পরের টপিক তুমি ফাটিয়ে দিবে'। এভাবে চলতে চলতে একসময় ভর্তি পরীক্ষা চলে আসে। আমার মাথার ভেতরের কণ্ঠকে অথর্ব প্রমাণ করে আমি কোথাও ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করতে পারলাম না। ওই প্রথমবার আমার মনে হলো আমি কোন একটা ভুল করেছি। 

আমি এমন একটা সময় বড় হয়েছি যখন 'মোটিভেশনাল স্পিকিং' খুব ট্রেন্ডি একটা ব্যাপার। পজিটিভ থিংকিং যেন নতুন এক ইশ্বর। সবাই স্ক্রিনের সামনে আসছে আর বলছে, 'তুমিই পারবে। কারণ তুমি আলাদা।' আর স্ক্রিনের এপাশে বসে আমার নিজের সম্পর্কে ধারণা সপ্তমে উঠছে। অভদ্র ভাষায় বলতে গেলে- আই ওয়াজ বিজি কিসিং মাই অউন এস। 

কিন্তু একটা ব্যাপার আমি বরাবরই মিস করেছি, আর সেটা হল স্ক্রিনের এপাশে শুধু আমিই থাকতাম না। লাখ লাখ মানুষ আমারই মতোন বিশ্বাস করা শুরু করেছিল যে তারা 'স্পেশাল'। হয়তো এ পর্যায়ে অনেকেই ভ্রু কুঁচকে ফেলেছেন অথবা ভাবছেন নিজেকে আলাদা বা স্পেশাল ভাবলে ক্ষতি কী? এতে মন সুস্থ থাকে,কর্ম স্পৃহা পাওয়া যায়। কে নিজে থেকে সিনিকাল হতে চায়? আমি খুবই দুঃখিত, বাট আই হ্যাভ টু বার্স্ট দ্য বাবল। 

প্রথমত নিজেকে আলাদা ভেবে যে ভাল লাগাটা আমরা অনুভব করি সেটা আসলে ক্ষণস্থায়ী।  এই ক্ষণস্থায়ী ভাল লাগা আমাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নষ্ট করে দেয়। অনেকটা ড্রাগস গ্রহণ করার মতোন, যা বাইরের ঝামেলাপূর্ণ দুনিয়াকে ভুলিয়ে দিয়ে ক্ষণস্থায়ী একটা স্বর্গের সন্ধান দেয় আমাদের। 

অদ্ভুৎ একটা সময়ে বাস করছি আমরা। যেখানে তরুণদের অনেকেই হয়তো ড্রাগস কিংবা মোটিভেশনাল স্পিকিংয়ে আসক্ত। আমার মনে হয় সবার জীবনেই এমন একবার ঘটেছেই যে আমরা আমাদের এক বন্ধুকে মনে করেছি, ঠিক সেই সময়েই সেই বন্ধু কল দিল। ব্যাপারটাকে প্রায় সবাই টেলিপ্যাথির কাতারে ফেলে দেবে। অথচ আমরা হিসাব করতে ভুলে যাই এমন আরও অগণিত মুহুর্তের কথা, যখন আমরা বন্ধুটিকে মনে করেছি কিন্তু আসলে কোনো কল আসেনি। 

সোশাল সাইকোলজিতে 'সেল্ফসার্ভিং বায়াস' নামে একটা কথা আছে। কথাটার অর্থ হল আমাদের মস্তিস্ক যখন নিজের সম্পর্কে কোনো তথ্য সংগ্রহ করে তখন নিজে থেকে এক ধরনের পক্ষপাতীত্ব এসে যায়। আমরা আমাদের ব্যর্থতার জন্য অজুহাত খুঁজি, সফলতার জন্য প্রচন্ড আত্মশ্লাঘা অনুভব করি এবং অনেক দিক থেকে নিজেকে সাধারণের তুলনায় ভাল মনে করি। 

এবং এই তথাকথিত পুরোদস্তুর 'পজিটিভ থিংকিং' আমাদের সেল্ফ বায়াসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যেমন; প্রথমবার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে না পেরে আমি ভাগ্যকে দোষারোপ করেছিলাম। এরকম ব্যর্থতা কাঁধে নিয়ে আমি স্বাভাবিক থাকি প্রায় ছ মাস। তখনই নগ্ন চোখে আমার ভুলগুলোকে আমি দেখা শুরু করি। এবং সিদ্ধান্ত নেই আমার সাথে যা ঘটেছে তার দায় অবশ্যই এবং সম্পূর্ণই আমার। এবং এই একটা বিশ্বাস পরের বছর আমার কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে এবং কাঙ্ক্ষিত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যোগ্যতা এনে দেয়। এবং সেটা সম্ভব হয়েছিল তথাকথিত কিছু নেগেটিভ থিংকিং এর জন্য। 

দেশে প্রতিনিয়তই বাড়ছে হতাশাগ্রস্ত মানুষের সংখ্যা

সত্য কথা বলতে বেশিরভাগ মানুষের আত্মবিশ্বাস তলানিতে থাকে। এমনকি যারা নিজেদের আত্মবিশ্বাসী বলে পরিচয় দেন তাদের অনেকেও আসলে ভেতরে ভেতরে ইনসিকিউরড। সোশাল সাইকোলজিস্ট কার্ল লজার্স বলেছিলেন- তার পরিচিতদের বেশিরভাগই নিজেদের ঘেন্না করেন, নিজেদের অথর্ব মনে করেন এবং মনে করেন কেউ তাদেরকে ভালবাসে না। জন কোয়েন বলেছেন সবারই ইনফিরিউরি কমপ্লেক্স আছে, যারা তা দেখায় না তারা কেবল ভান করছে। 

তো আমি বলতে চাচ্ছি- মানুষ মাত্রই নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করে। কিন্তু তথাকথিত পজিটিভ থিংকারদের জন্য এটা কোনো অপশনই না। নিজেকে ভালবাসার ব্যাপারটাকে তারা বারবারই তুলে ধরে। ব্যাপারটা যে কতোখানি ফাঁপা তা তারা নিজেরাই বুঝতে পারে না। নিজেদের কাছে নিজেদের ভাল লাগাতে গিয়ে আমরা মিথ্যের আশ্রয় নিই। যেমন আমিই নিয়েছিলাম। আমি এটা মেনে নিতেই পারছিলাম না যে আমি পড়াশোনা যথাযথ মনোযোগ দিতে পারছি না, বরং আমি নিজেকে মিথ্যা এই বুঝিয়েছি যে, যা করছি তাই যথেষ্ট। অথচ সত্যিটা স্বীকার করতে পারলে হয়তো প্রথম বছরেই আমি সফল হতাম। 

ইনফিরিউরি কম্পেক্স বা হীনমন্যতায় ভোগা খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপার। বরং নিজেকে ক্রিটিসাইজ করতে পারলেই আমরা নিজেকে আরও ভাল একটি জায়গায় নিয়ে যেতে পারব। কিন্তু কিছু অর্জন করতে হলে প্রথমে নিজেকে পরিমাপ করতে হয়। নিজেকে ভালবাসার জন্য নিজেকে কাল্পনিক একটা কিছু পেটেন্ট করার থেকে নিজের সত্যিটা জেনে নিজেকে ক্ষুদ্র ভাবাটা অনেকাংশেই ভাল। 

এইরকমের তথাকথিত পজিটিভ থিংকিং আমাদের মাঝে যে বিষ ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তার মাঝে আরেকটা হলো ব্যর্থতার দায় স্বীকার না করা। কোনো ফুটবল ম্যাচে নিজের সমর্থিত দলের হারকে আমরা সারাজীবন রেফারির উপর চাপানোর একটা চেষ্টায় থাকি, অন্যদিকে পরীক্ষায় ভাল করলে সেটা অবশ্যই আমাদের নিজস্ব অর্জন বলে পরিগণিত করি। আবার খারাপ করলে সেটাই হয়ে যায় শিক্ষকের খাতা দেখার দোষ। 

আমি একটা মেয়েকে চিনি, যে কখনোই কোনোভাবে তার ব্যর্থতা স্বীকার করে না। আমি তাকে বিগত একবছরে একদিনের জন্যও তার কোনো ব্যর্থতার জন্য দায় স্বীকার করতে দেখিনি। এবং একই সাথে সে সর্বদা নিজের গুণের ব্যাপারে পঞ্চমুখ থাকে এবং এক বছর শেষে আমি তাকে দেখেছি সে ওই আগের জায়গাতেই পড়ে আছে। এক বছর আগে সে যেসব সমস্যায় ছিল তা একবছরে আরও তীব্রতর হয়েছে। নো ইমপ্রুভমেন্ট সিন। কেন? কেননা 'পজিটিভ থিংকিং' তাকে সাময়িক স্বর্গ সুখ সাপ্লাই করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। 

নিজের ব্যর্থতাকে দেখতে পাওয়া খুব কঠিন ও গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ। নিজেকে ছাপিয়ে যেতে প্রথম ধাপ এটাই। কদিন আগ অব্দি আমিও এটা পারতাম না। আমিও ভান করতাম নিজের সাথে ও অন্য সবার সাথে। কিন্তু আমি সাহস করে বলতে পারি জীবনের অনেক ক্ষেত্রেই আমি প্রচন্ড পরিমাণে ব্যর্থ হয়েছি। এটাই স্বাভাবিক। 

এবং সবশেষে, আমরা কেউই অসাধারণ না। বরং প্রচন্ড সাধারণ। সাধারণ বলেই সেলফ সার্ভিং বায়াসের পাল্লায় পড়ে নিজেদের জীবন একেবারে এলোমেলো করে ফেলছি। আমরা বেশির ভাগই এই সত্যটা মেনে নিতে চাই না, কারণ আমরা মনে করি এটা মেনে নিলে আমরা সারাজীবন ওই সাধারণের কাতারেই রয়ে যাব। মনে মনে সবাই চায় একটু বেশিকিছু অর্জন করতে, কিন্তু নিজেকে প্রথম থেকেই অসাধারণ মনে করলে আসলে কিছুই অর্জন করা যায় না। 

সাকিব-আল-হাসান একদিনে অসাধারণ ক্রিকেটার হয়নি। এই একটা জায়গায় তাকে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে হয়েছে। নিজেকে অসাধারণ ভাবলে মুশকিল আসান হয় না। এর পেছনে লাগে অক্লান্ত পরিশ্রম। 

বেড়ে উঠাই আসল কথা। যারা আসলেই অসাধারণ, তারা পরিশ্রমের জোরেই ওই পর্যায়ে পৌছাতে পেরেছেন। এবং তাদের কাছে কোনো সফলতাই যথেষ্ট না। এই একটা দৃষ্টিভঙ্গিই তাদেরকে আরও উপরে নিয়ে যায়। তথাকথিত পজিটিভ থিংকিংয়ের সমস্যা হচ্ছে এটা আমাদের বেড়ে উঠার মুখে একটা বড় প্রতিবন্ধকতা।  সাময়িকভাবে নিজেকে বুস্ট করার জন্য ভাল হলেও লং রানে এটা কিছুই না। এটা জীবনে সুখি বানানোর চেয়ে ডিলিউসনাল বানিয়ে দেয়। 

আদতে আমাদের উচিত নেগেটিভ থিংকার হওয়া। হ্যাঁ, ব্যাপারটা হয়তো ডিপ্রেসিভ, কিন্তু বেশি বাস্তব। ব্যাপারটা খুব এক্সাইটিং না হলেও আমাদের জীবনে যে কোনো ধাক্কার জন্য এটা আমাদের প্রস্তুত রাখে। সময়কে উল্টো ঘোরানোর দিন এসে গেছে। এখন হতে আমাদের নিজেদের সাধারণ ভাবা উচিত, নিজেকে ক্ষুদ্র মনে করা উচিত এবং নিজের জ্ঞানের পরিসরটাকে খুব সীমিত ভাবা উচিত। অন্যথায় আমরা ধীরে ধীরে একটা প্রেটেনশিয়াস ডিলিউশনাল জাতিতে পরিণত হব।

আমার এতোকথার সারমর্ম যদি বলতে বলা হয়, তবে এই বলব যে, আসলে আমাদের সামনে যে চিন্তাধারাকে পজেটিভ বলে উপস্থাপন করা হচ্ছে কিংবা যেটাকে নেগেটিভ বলে এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে তা কি আসলেই পজেটিভ অথবা নেগেটিভ থিংকিং কিনা। 

নিজেকে ক্রমান্বয়ে প্রস্ফুটিত করা, নিজের মাঝে জ্ঞানের পিপাসাকে জাগিয়ে রাখার চরম ইচ্ছা, বড় হবার অদম্য আকাঙ্ক্ষা এই ব্যাপারগুলো তখনই মরে যেতে শুরু করবে, ঠিক যখন আপনি আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগবেন, নিজেকে অনেক বড় কিছু মনে করবেন এবং নিজের ব্যর্থতাগুলোর একটা ভুল ব্যাখ্যা সাজিয়ে অন্যের উপর দায় আরোপ করতে চাইবেন। জীবনে সফলতা তখনই স্থায়ী ও পাকাপোক্ত হয় যখন 'আমি পারবো' এই ভাবনা থেকে একজন মানুষ সরে এসে 'আমি কেন পারছি না' এই চিন্তা করা শুরু করে। 

তাই পজিটিভ থিংকিং হয়তো তাৎক্ষণাত একটা পজিটিভ ভাইব আমাদের জীবনে নিয়ে আসতে পারে, কিন্তু পার্মানেন্ট পজিটিভিটির জন্য নেগেটিভ থিংকিং এর উপস্থিতিটা জীবনে আবশ্যক।

-

* প্রিয় পাঠক, চাইলে এগিয়ে চলোতে লিখতে পারেন আপনিও! লেখা পাঠান এই লিংকে ক্লিক করে- আপনিও লিখুন

* সমাজের নানান অসঙ্গতি নিয়ে আওয়াজ তুলুন। অংশ নিন আমাদের মিছিলে। যোগ দিন 'এগিয়ে চলো বাংলাদেশ' ফেসবুক গ্রুপে


শেয়ারঃ


এই বিভাগের আরও লেখা